বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার কেমন হলো?
বিএনপির ইশতেহারে মোট ৫১ দফা ও নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে/ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। একে দলটির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শনের একটি পরীক্ষামূলক নকশা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত এ ইশতেহারে মোট ৫১ দফা ও নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।
মূল প্রতিশ্রুতিগুলো
প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ। ভবিষ্যতে এই সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ। এ সুবিধা পাবেন মৎস্যচাষি, খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও।
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ।
কর্মমুখী ও আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার, প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু।
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ।
ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ।
পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ কর্মসূচি।
ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব গঠন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি।
আরও পড়ুন
জুলাই সনদ জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: তারেক রহমান
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বিএনপি
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণা বিএনপির
বিএনপির দাবি, এ ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।
ইশতেহারে বলা হয়, ‘প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে বিএনপি। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।’
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন জাগো নিউজকে বলেন, বিএনপির ঘোষিত ইশতেহার সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। তবে এটি যেন কেবল কথার ফুলঝুড়িতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তবায়নের দিকটি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, ইশতেহার বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে চাল সরবরাহের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে অর্থের উৎস কী হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এক্ষেত্রে কর বাড়ানো হবে কি না, অথবা নতুন কোনো আয়-উৎস তৈরি করা হবে কি না, সে বিষয়েও পরিষ্কার ধারণা দেওয়া দরকার। কারণ এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য টেকসই আয় সৃষ্টি অপরিহার্য।
মহিউদ্দিন খান মোহন আরও বলেন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে সামগ্রিক সবুজায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে নীতিগতভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলে তা আরও বাস্তবসম্মত হতো।
পাশাপাশি তারেক রহমান প্রস্তাবিত উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বর্তমান সংবিধান কাঠামোতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক হওয়ায়, সেখানে উপ-রাষ্ট্রপতি পদ বাস্তবসম্মত নয়। এক্ষেত্রে উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে আলোচনা হলে তা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল জাগো নিউজকে বলেন, বিএনপিঘোষিত ইশতেহারে তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহার প্রণয়নে দেশের বিভিন্ন প্রজন্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশার পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে।
তিনি বলেন, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রপ্তানিমুখী শিল্প এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও ইশতেহারে রয়েছে। সংস্কার, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা, সুশাসন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, নিরাপদ খাদ্য এবং উন্নত বাসস্থানের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা ইশতেহারে লক্ষ্য করা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে সন্ত্রাস দমন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের প্রতিশ্রুতিও এতে স্পষ্ট।
মোবাশ্বের হোসেন টুটুল আরও বলেন, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার অঙ্গীকার এবং দারিদ্র্য বিমোচন, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষাসহ এসডিজি বাস্তবায়নের একটি রোডম্যাপ ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে যুক্ত হলে ইশতেহারটি অধিক পূর্ণতা পেত। পাশাপাশি নিরাপত্তা খাত সংস্কারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকলে জাতিসংঘের প্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগোতে পারতো।
তিনি বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধির ইঙ্গিত থাকলেও ব্যয় সংকোচনের ক্ষেত্রে ইশতেহারে মূলত প্রকল্প ব্যয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ স্পষ্ট না হলে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণের প্রভাব বেসরকারি খাত কীভাবে সামাল দেবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না।
জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দেশের নিজস্ব কয়লার উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। এতে পশ্চিমা পরিবেশবাদীদের সন্তুষ্ট করা গেলেও দেশের জন্য সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প সীমিত হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত অনুপস্থিত।
কেএইচ/একিউএফ