পররাষ্ট্রনীতিতে বিএনপির কৌশলগত বার্তা
ইশতেহার ঘোষণা করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান/ফাইল ছবি
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য রক্ষা ও বহুমাত্রিক বিশ্ব বাস্তবতায় কৌশলগত কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছে— এমনটা মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকারের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দেন তিনি।
বিএনপির বিগত শাসনামলে অর্থাৎ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের (২০০১–২০০৬) সময়ে যে কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল, তার মধ্যে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামে উদ্ধার হওয়া বিপুল অস্ত্রের চালান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) জেটিতে, যেখানে সমুদ্রপথে দুটি বড় ট্রলারে করে অস্ত্র আনা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই ঘটনা ভারতের সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের সূচনা করেছিল। সে সময় ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি ছিল, ভারতের চাপের কারণেই অস্ত্রের চালান আটক করা হয়। অন্যথায় সেগুলো ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছাতে পারতো।
তবে বিএনপি বরাবরই বলে এসেছে, সরকারের নিজস্ব উদ্যোগেই ওই অস্ত্র জব্দ করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলেই বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।
সেসব ঘটনা স্মরণ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপির আগের শাসনামলে ভারত শুধু নয়, ভারতের বাইরেও আন্তর্জাতিক মহলে যে সেন্সেটিভিটি (স্পর্শকাতরতা) আছে, সেটা দূরীভূত করার জন্য এই অনুচ্ছেদটি দিয়েছে। আশা করি এটা শুধু কথার কথা না, এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।’
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক প্রায় তলানিতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভালো কর্মসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটা অনেকটাই থমকে আছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
দিল্লি নতুন সরকারকে কীভাবে দেখবে এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গঠনে কতটা আগ্রহ দেখাবে—তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিসা জটিলতা বা একতরফা সম্পর্কের অভিযোগের মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে পারস্পরিক আস্থা বাড়তে পারে।- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে সমাপনী ব্রিফিংয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার এলে দুদেশের সম্পর্ক আবারও ‘মসৃণ হবে’।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের পরে যে সরকারই আসুক না কেন তাদের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সহজীকরণ করা একটি চ্যালেঞ্জ বলে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিল্লি নতুন সরকারকে কীভাবে দেখবে এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গঠনে কতটা আগ্রহ দেখাবে—তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিসা জটিলতা বা একতরফা সম্পর্কের অভিযোগের মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে পারস্পরিক আস্থা বাড়তে পারে।’
আরও পড়ুন
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার কেমন হলো?
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডসহ ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতি
স্লোগান নয়, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে বিএনপির ইশতেহার
বিএনপি ইশতেহারে ৫ অধ্যায়ে ৫১ দফা
তিনি মনে করেন, ‘পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনা কমবে।’
এ বিষয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দেশের ভেতরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—মানুষ এখন আরও বলিষ্ঠ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক দেখতে চায়। গত ১৫ বছরে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের নিজস্ব প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণ করাও সহজ হবে না।’
ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘বিএনপির ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। এমন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে বাংলাদেশে যে জনসমালোচনা রয়েছে, তা অনেকটাই কমে আসতে পারে।’
বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
বিএনপি ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার, নতুন বাজার ও বিনিয়োগ আকর্ষণ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, মুসলিম বিশ্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে সক্রিয় ভূমিকার কথা বলেছে। পাশাপাশি সফট পাওয়ার ও সাংস্কৃতিক কূটনীতি বাড়ানো এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা উন্নয়নের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইশতেহারে নীতিগত দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত ভারসাম্যের কথা থাকলেও মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন।
এবারের নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি পররাষ্ট্র বিষয়ের ওপর বেশ ডিটেইলসে কাজ করেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—এসব বিষয় ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।’
তবে তার মতে, ‘বড় প্রশ্ন হলো নীতিগত সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে। বর্তমান বাস্তবতায় শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও নীতিগত বোঝাপড়া ও সমন্বয় জরুরি। এসব বিষয়ে ইশতেহারে তুলনামূলকভাবে কম বিস্তারিত রয়েছে।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দেশের ভেতরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—মানুষ এখন আরও বলিষ্ঠ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক দেখতে চায়। গত ১৫ বছরে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের নিজস্ব প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।- বিইআই প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির
‘অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সমন্বয়ে নীতিনির্ধারণী, বাস্তবায়ন ও জনগণ পর্যায়—এই তিন স্তরের মধ্যে বাস্তবসম্মত উপলব্ধি, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নির্দেশনার সমন্বয় অপরিহার্য,’ বলে মত দেন হুমায়ুন কবির।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি সবশেষ ক্ষমতায় ছিল প্রায় দুই দশক আগে। এ সময়ের মধ্যে বিশ্বরাজনীতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে, আর বিএনপি ইশতেহারে সেই বাস্তবতা বিবেচনায় পররাষ্ট্রনীতি সাজানোর চেষ্টা করেছে।’
তার মতে, পরিবর্তনশীল বিশ্বে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাদারত্ব ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। এখন আর গতানুগতিক কূটনীতির সময় নেই। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে সম্পর্কের মাত্রা নির্ধারণ করতে উচ্চমাত্রার দক্ষতা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকেরা বলেন, যে কোনো ইশতেহারের মধ্যে সাধারণ বিষয়গুলো থাকে। যখন আসল কাজে যখন নামবে তখন হয়তো আরও বোঝা যাবে।
তবে বিএনপির ইশতেহারে যে বিষয়টা একেবারে স্পষ্ট সেটা হলো সম্পর্কে যেন মিউচুয়াল রেসপেক্ট, ডিগনিটি, সার্বভৌমত্ব বজায় থাকে। বাংলাদেশের জনগণের যে সমালোচনা ছিল সেটা কমে যাবে যদি সে ধরনের সম্পর্ক করা যায়।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২টি সংসদ নির্বাচন হলেও সবগুলোতে বিএনপি অংশ নেয়নি। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের নেতৃত্ব নেন খালেদা জিয়া এবং পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তিনি নিজেই ইশতেহার ঘোষণা করেন। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় সে সময় কোনো ইশতেহার দেওয়া হয়নি।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নিলেও খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় ইশতেহার ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনও বয়কট করেছিল দলটি।
জেপিআই/এএসএ/এমএস