ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ভ্রমণ

ভদ্রাবতীর পাড়ে কুমারপল্লি

ফিচার ডেস্ক | প্রকাশিত: ০২:০৮ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

শীতের শেষ প্রহর। ক’দিন বাদেই মৌসুমের খতিয়ান টানবে ঋতুটি। ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে মৌসুমের হাওয়া। সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই রোদের দেখা মিলছে। কুয়াশা আজও কিছুটা কম। সূর্যের দেখা পেলেই গরমে গা চিটচিট করবে। এজন্য কাকডাকা ভোরেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। শরীরে হালকা গরম কাপড়, গলায় মাফলার ঝুলিয়ে গন্তব্যে ছুটলাম।

বগুড়ার দক্ষিণের উপজেলা শাজাহানপুর। এই জনপদের আড়িয়া পালপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের বসবাস। বাঙালি হিন্দুদের অধিকাংশ পরিবারই মাটির তৈজসপত্র তৈরির সাথে জড়িত। এই পেশার আয়েই চলে তাদের সংসার। বর্ষা কিংবা শীতে কুমারদের কাজের গতিতে শ্লথ নেমে আসে। এই সময়গুলো তাদের অবসরেই কেটে যায়। শীতের শেষ মুহূর্ত হওয়ায় তাদের শিল্পে গতি এসেছে।

কুমারপল্লিতে যেতে পায়ে হেঁটেই রওয়ানা হয়েছি। হাঁটা পথে পায়ে ধুলো উঠেছে এক পুরল। আঁকাবাঁকা মাটির রাস্তার একপাশে ধানক্ষেত, অন্যপাশে হালকা জলরাশি, কিছুটা ফাঁকে ফাঁকে গ্রামের ঘরবাড়ি—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে এক নির্জন-নীরবতায় প্রবেশ করছি।

কুমার শিল্পীদের উঠানে পৌঁছতেই চোখে ধরা দিলো বিশাল এক ব্যস্ততা। বিদ্যুতের সাহায্যে ছোট চাকার ঘূর্ণন, কাদা মাটির গন্ধ আর চুল্লির আগুন-দেখেই বোঝা গেল এখানে চলছে মৃৎশিল্পীদের কর্মযজ্ঞ। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ থেকে শিশু সবাই মাটির পাত্র তৈরিতে নিযুক্ত।

mati

কুমারপল্লির প্রথম বাড়িতেই ভোর থেকে শুরু হয়েছে মহা ব্যস্ততা। উঠান-থেকে আঙিনা পর্যন্ত কোথাও পা রাখার উপায় নেই। সবখানেই ছড়িয়ে রাখা হয়েছে বড় মাটির পাতিল, দইয়ের বাটি, মাটির খেলনা। বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখা গেল মা-ছেলের কাজের মহাব্যস্ততা। আমাকে দেখেই কাদা মাখানো হাতে নিমন্ত্রণ জানালেন মাঝবয়সী নারী। হাতে শাখা, কপালে সিঁদুর বাঙালি সংস্কৃতি ভুলে না গিয়ে মাথায় আধো ঘোমটা দিলেন।
‘কুটি থেকে আচ্চেন?’
‘হামি বগুড়া শহরত থেকে আচ্চি। আপনেকেরে কাম দেখপার আচ্চি। ক্যাংকরে কাজ করিচ্চেন তা কি দেকা যাবি?’
‘(হেসে) তা যাবি না ক্যা? বসেন, দেকেন, হামরা ক্যামনে কাম করি?’
বলেই বসার জন্য আমার দিকে ছোট্ট কাঠের পিঁড়ি এগিয়ে দিলেন কুমার পরিবারের বধূ। তাতে বসে পড়লাম। হাতে থাকা ভিডিও রেকর্ডার দিয়ে সবকিছু স্মৃতির বাক্সে বন্দি করছিলাম। আমার দিক থেকে নজর সরিয়ে আবারও মা-সন্তানের কাজের ব্যস্ততা শুরু হলো।

যে কুমার বাড়িতে বসেছি, সে বাড়ি বড় ছেলে বিজয়। বয়স ১৭। সবে কলেজে পা রেখেছে। বয়সের সংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও মৃৎশিল্পের কাজে বেশ পটু। মায়ের এগিয়ে দেওয়া মণ্ডে চাকায় বসে একের পর এক বাসন তৈরি করছে। বানানো পণ্যগুলো একটা চেরা কাঠের ওপর রাখছে সে। পরে ঝুপড়ির অন্দরে সেগুলো সারিবদ্ধভাবে ঝুলন্ত মাচাংয়ে রেখে দিচ্ছে। বৃষ্টি এলে যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আর রোদ এলেই সেগুলো আঁচে রাখা হয়। সবশেষ প্রক্রিয়ায় সেগুলো সূর্যের আলোয় শুকিয়ে দেওয়া হবে জ্বলন্ত আগুনের চুল্লির তাপে।

কুমারদের কাজের মূল উপাদান মাটি। তবে চাইলেই সরাসরি এসব মাটি দিয়ে তৈজসপত্র বানানো যায় না। এর জন্য কয়েকটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় কুমার শিল্পীদের। শুরুতে একভাগ বেলে মাটির সাথে দুইভাগ কালো এঁটেল মাটির মিশ্রণ বানাতে হয়। সর্বশেষ নরম কাদামাটির স্তূপ বানিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে কেক আকৃতিতে মাটি কেটে মণ্ড বানান শিল্পীরা। সেই মণ্ডগুলোই চাকায় বসিয়ে তৈরি করা হয় মাটির জিনিস।

বিজয়ের হাতের সুনিপুণ কারিগরিতে দুচোখ ভরে এলো। মনের ইচ্ছা আর গোপন রাখতে পারলাম না।
‘হামিও এনা চাকার সামনে বসপার চাই।’
‘পারবেন তাই! হাতত কাদো ভরবি। কাপড় নোংরা হবি?’
‘তে কি হছে? হামিও তো মাটিরই মানুষ। খালি কন-মণ্ড নষ্ট হলে আপনার কোনো ক্ষতি হবি নাকি?’
‘আপনি চ্যালে হামার কি? আসেন...’

কথা শেষ করেই বিজয় আমাকে তার আসনে বসিয়ে দিলো। এরপর প্রক্রিয়া দেখিয়ে দিলো। শুরুতে মনে হলো কাজটা খুবই সহজ। কিন্তু আমি যে ভুল ছিলাম, তা মুহূর্তেই টের পেলাম। ১৫ মিনিট নষ্ট করেও একটা চা কাপ পর্যন্ত বানাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত বিজয়ের সাহায্যে কাপের মতো একটা কিছু বানিয়েছি।

mati

এরপর টিউবওয়েলের পানিতে হাত ধুয়ে আবার এলাকায় প্রবেশ করলাম। বিজয়দের বাড়ি ছাড়ার আগে ছোট্ট নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। তবে সময় স্বল্পতায় সেই জলযোগের ব্যবস্থা পরিহার করতে হয়েছে।

পাকিস্তান আমলে ভদ্রাবতীর বুক চিড়ে এই জনপদে নোঙর করতো বাণিজ্যিক নৌকা। সারি সারি বনিক প্রবেশ করতেন এই পল্লিতে। নদীপথে কুমারপল্লির মাটির পাত্র দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হতো। জামালপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোয় এই পণ্য বিক্রি হতো। তখন এই মাটির পণ্যের খ্যাতি ছিল।

খরস্রোতা ভদ্রাবতী মরতে বসেছে আজ। অযত্ন আর অবহেলায় নদী আজ নীরবে কাঁদে। কিন্তু সেই ইতিহাসের ছাপ এখনো বেঁচে আছে। মনে হয়, কুমার শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি পাত্রে লুকিয়ে আছে নৌকায় ভেসে যাওয়া গল্প।

মাটি, জ্বালানি, শ্রম—সবই ব্যয়বহুল। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ; কিন্তু লাভ সীমিত। কুমার শিল্পীদের অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। তবু দইয়ের পাত্র, হাঁড়ি, পাতিল—এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে কুমার পরিবারগুলো।

বিজয়দের বাড়ি ছেড়ে গ্রামের মেঠোপথে হাঁটছি। মাস দুয়েক পর পূজা। সেই প্রস্তুতি ধীরগতিতে চলছে। ছোট আকৃতির প্রতিমাগুলো তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেসবে এখনো রং লাগেনি। এই দেখতে দেখতে আরেক বাড়িতে ঢু মারলাম।

বাড়ির প্রবেশপথেই ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ পাতিলে রং দিচ্ছেন। তার থেকে একটু দূরেই মেশিনের শব্দ। সেদিকে চোখ যেতেই বুঝলাম, বিদ্যুতের সাহায্য চাকা ঘুরছে। সেই চাকাই মণ্ড বসিয়ে কাপ দইয়ের পাত্র বানাচ্ছে এক তরুণ। দেখতে বেশ স্মার্ট। কথায় কথায় জানতে পারলাম, বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। পড়ালেখার বাইরে সুযোগ এলেই বৃদ্ধ বাবা-মাকে সাহায্য করেন সুজীত।

mati

একপর্যায়ে তো বলেই ফেললেন, টিউশনি করে যে আয় আর জবাবদিহিতা তার চেয়ে বরং এই-ই ভালো। আমি নিশ্চুপ ছিলাম। কারণ এ কথা আমি ঢের ভালোই বুঝি।

সুজীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার ঘোর নিয়েই বাড়ির উঠান পেরোলাম। জীবনের মানে খুঁজতে খুঁজতে বিশাল এক মাঠের সামনে এসে থেমেছি। বেলা বেড়েছে তখন। রোদও প্রখর হচ্ছে। এই পথের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা ছনের ঘর। সেখানে বসেই দুই প্রজন্মের বধূ আপনমনে দইয়ের সরা বানাচ্ছেন। এক হাতে ভেজা কাপড়ের পেচানো গোলাকৃতির বল। আরেক হাত মাটির মণ্ড। সনাতনি প্রক্রিয়ায় মণ্ড পিটিয়ে পিটিয়ে শোয়ানো দইয়ের সরা বানাচ্ছেন শাশুড়ি আর পুত্রবধূ।

অন্যদিকে তাকাতেই দেখি, দুই হাতে একগাদা পাত্র নিয়ে মাঠের দিকে ছুটছেন এক যুবক। পরনে লুঙ্গি, শরীরে কোনো কাপড় নেই। মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই। দুই হাতভর্তি মাটির কাঁচা পাত্র নিয়ে মাঠে প্রবেশ করলো সে। এরপর সেগুলো মাটিতে নামিয়ে রোদের তাপে রেখে আবারও ঘরে প্রবেশ করলেন সুঠাম দেহের ওই তরুণ।

যদি কখনো বগুড়ায় যান, কুমারপল্লির পথে হাঁটবেন। দেখবেন শিল্পীর হাতের নিপুণতা, চাকার ঘূর্ণন, চুল্লির আগুন, গড়ানো মাটির সৌন্দর্য। প্রতিটি দইয়ের পাত্র, হাঁড়ি, পাতিল—সবই ইতিহাসের সাক্ষী, নদীপথের বাণিজ্যের স্মৃতি এবং শত বছরের কুমার শিল্পের ধারাবাহিকতা।

বগুড়ার মৃৎশিল্প শুধু পাত্র তৈরি নয়। এটি সময়ের গল্প, ইতিহাসের সাক্ষী, লোকজ সংস্কৃতির অংশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ক্ষয় ঘটলেও কুমারপল্লির মানুষরা এখনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। মাটির প্রতি কুমার শিল্পীদের ভালোবাসা চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কুমারপল্লির কর্মযজ্ঞ চলে। তা দেখতে দেখতেই দিন কেটে গেল। সন্ধ্যা নামতে মায়ের কোলে ফিরলাম।

এসইউ

আরও পড়ুন