সুন্দরবন বাংলাদেশের পর্যটনের আশীর্বাদ

খায়রুল বাশার আশিক
খায়রুল বাশার আশিক খায়রুল বাশার আশিক
প্রকাশিত: ০৩:১৮ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস’। প্রকৃতির অনন্য দান, বিশ্বের বৃহত্তম অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রতি ভালোবাসা ও জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর দিনটি পালিত হয়। বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই বন কেবল আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ নয় বরং এটি দেশের পর্যটন মানচিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র।

সুন্দরবনের ভ্রমণ মানেই নদী, খাল, নোনা জল এবং ঘন সবুজের অনন্য মিলনস্থল। বনাঞ্চলটির প্রধান আকর্ষণ বাঘের অস্তিত্ব, যেখানে ভয়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত ভালো লাগাও অনুভূত হয়। পাশাপাশি সুন্দরবনের ভরা নদীমাতৃক প্রাকৃতিক দৃশ্য, ম্যানগ্রোভ গাছের অনন্য সৌন্দর্য, বক, হরিণ, রাজহংস, চিতল মাছের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং খোলা আকাশের ছায়ায় ভ্রমণ যেন প্রকৃতির এক নতুন রূপের সাক্ষী। ফলে বনটিও ভ্রমণকারীদের জন্য এক অনন্য রোমাঞ্চের জায়গা।

বাংলাদেশের জাতীয় পর্যটনেও সুন্দরবনের অবদান অসীম। এককথায় বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মেরুদণ্ড বলা হয় সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে (বাংলাদেশ অংশ) ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। এসব পর্যটন স্পটের মধ্যে অন্যতম হিরণ পয়েন্ট, নীলকমল, কটকা অভয়ারণ্য, কলাগাছিয়া, ককসাবার, হংসবন, সীমান্ত পয়েন্ট কল্পনা, মান্দারবাড়িয়া সৈকত, আন্ধারমানিক, করমজল এবং বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থল খালের ভিউ পয়েন্ট।

এর মধ্যে হিরণ পয়েন্ট বাঘের রাজত্বের জায়গা। একে বলা হয় ‘বাঘের স্বদেশ’। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে এখান থেকে বাঘের পদচিহ্ন এমনকি বাঘ দেখা যায়। এ ছাড়া কটকা অভয়ারণ্য ওয়াচ টাওয়ার থেকে বনের বিশালতা এবং চিত্রা হরিণের বিচরণ দেখা যায়। মান্দারবাড়িয়া সৈকতটি সূর্যাস্ত দেখার জন্য অসাধারণ। কলাগাছিয়া সুন্দরবনের সমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ বৈচিত্র্য দেখার জন্য সেরা জায়গা। এখানে কাঠের ট্রেইল দিয়ে বনের ভেতর হাঁটার অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর।

ককসাবার বনে দেখা যায় নদী ও ম্যানগ্রোভের মনোরম মিলনস্থল। হংসবন নামক জায়গাটি জলপাখির জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। তাছাড়া আন্ধারমানিক ও করমজল পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্পট। প্রতিটি স্পটই দর্শনার্থীর জন্য ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। কিছু স্পটে নদীপথের নৌকাভ্রমণ করতে হয়। অন্যত্র বনভূমিতে হাঁটাহাঁটি বা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা যায়।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে খ্যাত সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে মোংলা, খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান গড়ে নিয়েছেন। এ বনভূমিকে ঘিরেই হোমস্টে ও গাইড সার্ভিসের মতো কাজের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক জীবনেও সমৃদ্ধি এসেছে। মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের পাশাপাশি কয়েক হাজার শিক্ষিত যুবক এখন ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে স্বাবলম্বী।

বিগত এক দশকে সুন্দরবনের পর্যটন সেবায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আধুনিক পর্যটন সেবা এখন আরও উন্নত ও সুশৃঙ্খল। এখন আর গাদাগাদি করে লঞ্চে থাকতে হচ্ছে না। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত প্রিমিয়াম ক্রুজশিপগুলোয় আছে এসি রুম, অ্যাটাচড বাথ এবং অভিজ্ঞ শেফদের তৈরি বাহারি খাবার। পাশাপাশি সাতক্ষীরা ও মোংলা সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব ইকো-কটেজ। এখানে পর্যটকরা স্থানীয় মানুষের জীবনধারা সরাসরি উপভোগ করতে পারেন। আগের থেকে বহুগুণে বেড়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বন বিভাগ এখন ড্রোন এবং আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের গতিবিধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।

ইউনেস্কো ঘোষিত এ ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ দেশের অর্থনীতির এক বিশাল চালিকাশক্তি। সুন্দরবন থেকে প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়। এটি বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ‘ল্যান্ড অব দ্য রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের যে পরিচয়, তার মূল উৎস এই সুন্দরবন।

deer

সুন্দরবনের পর্যটনে এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে পর্যটকদের মানসিকতায়। বর্তমানে পর্যটকরা অনেক বেশি ‘রেসপন্সিবল ট্যুরিস্ট’ বা দায়িত্বশীল পর্যটকের পরিচয় দিচ্ছেন। তারা এখন প্রকৃতির ক্ষতি রোধের দিকেও বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। বনভোজনের নামে উচ্চশব্দে মাইক বাজানো থেকে বিরত থাকছেন। প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিক স্থানে ফেলার ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও সচেতনতা এসেছে। বন্যপ্রাণীদের খাবার দেওয়া বা বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকছেন। ফটোগ্রাফি নীতিও মেনে চলছেন। ড্রোন ও ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে নিচ্ছেন, যা বনের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় সহায়ক। তাছাড়া, নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ এবং স্থানীয় পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে চলছেন।

এত ইতিবাচক পরিবর্তনের পরেও টেকসই পর্যটনের চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের পর্যটনকে আরও উচ্চতায় নিতে হলে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বনের ভেতরের খালের নাব্যতা বজায় রাখা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি রোধ এবং বন্যপ্রাণীদের বিচরণক্ষেত্রে পর্যটকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। টেকসই পর্যটনের জন্য দরকার আরও সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সুন্দরবন দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা সুন্দরবন ভ্রমণ করবো কিন্তু তার কোনো ক্ষতি করবো না। সুন্দরবন কেবল দেখার বিষয় নয়, এটি অনুভব করার বিষয়। প্রকৃতির এই বিশাল পাঠশালা রক্ষা পেলে রক্ষা পাবে বাংলাদেশ। আসুন এই সবুজ অক্সিজেন কারখানাটিকে আগলে রাখি আগামী প্রজন্মের জন্য।

পর্যটক ও উপকূল বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু মনে করেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি বাংলাদেশের অহংকার, প্রকৃতির অমূল্য ধন এবং পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা। প্রতিটি ভ্রমণকারী যেন বনভূমির সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ এবং আমাদের দায়িত্ববোধকে মনে রাখে। আজকের দিবসটি শুধু উদযাপন নয়, এটি আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল পর্যটক হিসেবে বেড়ে ওঠার আহ্বান।

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।