ত্রিশ কিলোমিটারের রোমাঞ্চকর পদযাত্রা
রোমাঞ্চকর পদযাত্রা
সাদিয়া সুলতানা
‘৩০ কিলোমিটার? মা, তুমি তো বললে ১০ কিলোমিটার হাঁটতে হবে!’
সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডের পাশের এক রেস্টুরেন্টে বসে কথাগুলো বলছিল কিশোরী লারিসা। ওর মা খাদিজা আপু একবার মেয়ের দিকে তাকাচ্ছেন, আরেকবার আমাদের দিকে। চোখেমুখে হালকা শঙ্কার ছাপ নিয়ে বললেন, ‘আমি কি তবে ভুল শুনলাম?’ আমি আর শাহনাজ হেসে অভয় দিলাম। বললাম, ‘আরে কোনো চিন্তা নেই, গল্প করতে করতে দেখবে কখন পথ শেষ হয়ে গেছে!’
মূলত ইকরামুল হাসান শাকিল আর মাসফিকুল হাসান টনির কাছ থেকেই শোনা ছিল মিরসরাইয়ের এই দারুণ পথের কথা। সেই থেকেই আমাদের মনে পরিকল্পনাটা দানা বেঁধেছিল। রাত ১২টায় বাস ছাড়লো মিরসরাইয়ের উদ্দেশ্যে। দলের ৮ জন সদস্য নিয়ে যখন ভোরে গন্তব্যে পৌঁছলাম, চারপাশ তখনো কুয়াশা আর অন্ধকারে ঢাকা। বাস কাউন্টারে ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমরা সিএনজি নিয়ে রওয়ানা হলাম মিরসরাই ইকোনমিক জোনের সিপি মোড়ের দিকে। দলের অন্য সদস্য হলেন—খাদিজা বাপ্পি, লারিসা, টনি, শাহনাজ, আরবিন, শামীম এবং শাকিল।

ভোরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে যখন সিপি মোড়ে পৌঁছলাম; সূর্য তখন কেবল উঁকি দিচ্ছে। কনস্ট্রাকশনের কাজ চলা পথের দুই ধারে সারিবদ্ধ খেজুর আর বরই গাছ। গাছে গাছে প্লাস্টিকের বোতলে খেজুরের রস জমছে, আর সেই রসের লোভে পাখিদের কিচিরমিচির চারপাশকে জীবন্ত করে তুলেছে। একদিকে গরু-মহিষের পালের প্রাতঃরাশ চলছে, অন্যদিকে আমরা হাঁটতে হাঁটতে গাছ থেকে পেড়ে নিচ্ছি টক-মিষ্টি বরই।
- আরও পড়ুন
ভদ্রাবতীর পাড়ে কুমারপল্লি
প্রায় ৮ কিলোমিটার হাঁটার পর লারিসার জুতার তলা খুলে একাকার! জনমানবহীন এই পথে মুচি পাওয়া অসম্ভব। অগত্যা সেই অবস্থাতেই অদম্য মনে এগিয়ে চলল ও। পথে এক দোকানে কেক-বিস্কুট দিয়ে নাস্তা করার সময় শাকিল শোনালো এক বিপন্ন ঘুঘু পাখিকে জালের ফাঁদ থেকে বাঁচানোর গল্প। দিনের শুরুতেই এমন একটা মানবিক কাজের কথা শুনে সবার মনটা ভালো হয়ে গেল।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের তেজ বাড়লেও পথের দুই ধারের ছায়া আমাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। মাঝপথে এক বিশাল বটগাছের তলায় পাতা বেঞ্চে আমরা জিরিয়ে নিলাম। আরভিনের ট্রাইপডে বন্দি হলো আমাদের হাসিমুখের একটি গ্রুপ ছবি। এখান থেকেই খাদিজা আপু আর লারিসাকে সিএনজিতে তুলে দেওয়া হলো গুলখালির উদ্দেশ্যে।
আমাদের ডানপাশে দূরে ঝাউবনের সারি জানান দিচ্ছিল সাগর খুব কাছেই, যদিও দেখা মিলছিল না তার। দুপুরের দিকে যখন গুলখালি পৌঁছলাম, চারদিকে সিম বাগানের সমারোহ। দুপুরের আহারে ছিল ভাত, সুরমা মাছ আর ডাল। তৃপ্তির ভোজন শেষে যখন আবার হাঁটা শুরু করলাম, মাথার ওপর সূর্য তখন বেশ কড়া। শাকিল আর টনি স্মৃতিচারণ করছিল তাদের আগের বারের ভ্রমণের কথা, যখন রমজানের কারণে সব দোকানপাট বন্ধ ছিল।

বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ আমরা যখন আকিলপুর সৈকতে পৌঁছলাম; তখন সাগরের রূপ দেখে সব ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। রোদে চিকচিক করা জলরাশি আর সৈকতে ঘুরতে আসা মানুষের কোলাহল, সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। হঠাৎ খাদিজা আপু আবদার করলেন, ‘সাগরে একটু পা ভেজাবো না?’ টনির উৎসাহে আমরা যখন সাগরের দিকে পা বাড়ালাম, নরম কাদায় পা ডুবে গিয়ে এক অদ্ভুত ‘কাদাথেরাপি’ হয়ে গেল!
পশ্চিমে তখন সূর্য ডুবছে। গোধূলির সেই রক্তিম আলোয় নিজেদের রাঙিয়ে নিয়ে, একরাশ প্রশান্তি আর দারুণ কিছু স্মৃতি নিয়ে আমরা আবার ফিরে চললাম আমাদের চিরচেনা যান্ত্রিক জীবনে।
এসইউ