যমুনার তীরে বন্ধুদের সঙ্গে একদিনের মিনি ট্যুর
ছবি: খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুলের তোলা
খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল
শহরের বিরক্তিকর কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ থেকে এক চিলতে ফুরসত পেতে কে না চায়। তাই তো এই ঈদে ঢাকা থেকে আসা ভাইয়েরা ও শৈশবের দুরন্তপনা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম একদিনের মিনি ট্যুরে। কয়েকদিন ধরেই আমাদের মাঝে ভ্রমণ নিয়ে বিচিত্র পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যমুনা সেতু ও নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করবো। যমুনা পানি প্রবাহের দিক থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী। তবে দৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। আর যমুনা সেতু বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজর নামাজ আদায় করে আমরা যমুনার অপার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। যাত্রাপথে পূর্বের বিভিন্ন ভ্রমণের বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পাশাপাশি চললো হাসি-ঠাট্টা। আর সেই সঙ্গে যাত্রাপথের পুরো সময়টা জুড়ে আমাদের কণ্ঠে শোভা পেল জনপ্রিয় সব সংগীত ও গজল। এমন আনন্দঘন মূহুর্ত উপভোগ করতে থেকে আমরা যমুনার দিকে ছুটতে লাগলাম।
পথিমধ্যে আমাদের ভূঞাপুরের ঐতিহ্যবাহী ইব্রাহীম খাঁ কলেজ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো। সারাদেশে খ্যাতি পাওয়া প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ অত্র কলেজ ক্যাম্পাসে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। দেখতে দেখতে আমরা অতিক্রম করলাম দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ গোবিন্দাসী গরুর হাট। এখানে আমরা একঝলক যমুনার মায়াবি রূপ দেখতে পেলাম। এর কিছুক্ষণ পর আমাদের গাড়ি চিরযৌবনা যমুনার তীরে থামল। যেখানে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো সেখান থেকে যমুনা বহুমুখী সেতু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তা দেখে সবাই উল্লাসে ফেটে পড়লো। মনে হচ্ছে আমাদের আজকের ভ্রমণ সার্থক হবে।
যমুনা নদীর স্বচ্ছ পানি দেখে আমাদের মন গেয়ে উঠলো ‘আমার যমুনার জল দেখতে কালো চান করিতে লাগে ভালো যৌবন মিশিয়া গেল জলে।’ যমুনা আসবো আর যমুনার পানিতে নামবো না তা হবে না, তা হবে না। তৎক্ষনাৎ আমরা নদীর পাশে একটি কাপড়ের দোকান থেকে ত্রি কোয়াটার প্যান্ট কিনলাম আর দৌড়ে গেলাম নদীতে।
তবে নদীর শীতল পানিতে খাবি খাওয়ার আগে আমরা একটি নৌকা ভাড়া করলাম। যমুনায় এসে যদি নৌকা বিলাস না করতে পারি তাহলে আমাদের আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়বে সেই চিন্তা থেকে আমরা এক মাঝির দ্বারস্থ হলাম এবং ঘণ্টাখানিকের জন্য নৌকা নিলাম। নৌকায় চেপে মাঝি আমাদের যমুনা বহুমুখী সেতুর নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে আনবে। নৌকা করে নদীতে ভাসতে ভাসতে আমরা গাঙের ডলফিন শুশুক এর দেখা পেলাম। একাধিকবার শুশুকের দেখা পেয়ে আমরা রোমাঞ্চিত হলাম।
যমুনার চরে বাদাম আর মিষ্টি আলুর আবাদ হয়েছে, দূর থেকে তা দেখে মনে হচ্ছে যমুনার বুকে যেন এক টুকরো সবুজ কার্পেট বিছানো। যমুনায় ভাসতে ভাসতে আমরা নিজেদের ফ্রেমবন্দি করলাম। আনন্দঘন মূহুর্তের ভিডিও ধারণ করতে লাগলাম। আর দেখতে দেখতে নৌকার মাঝি আমাদের যমুনা বহুমুখী সেতু ও যমুনা রেল সেতুর নিচে দিয়ে ঘুরিয়ে আনলেন। এ যেন সত্যিই এক স্বপ্নীল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সামিল। তীরে পৌঁছানোর পর আমরা পাশের দোকান থেকে কেনা পোশাক পরিধান করে নদীতে সটান করে নেমে পড়লাম।
যমুনার শান্ত-শীতল পানিতে নেমে আমাদের আনন্দ ও ফুর্তি আরও বহুগুণে বেড়ে গেল। নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরে যেতে আমরা ব্যাকুল। বুকে সাহস আর বল নিয়ে সাঁতার কাটতে লাগলাম এবং চূড়ান্তভাবে নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে যেতে সমর্থ হলাম। চরের বালু স্পর্শ করে আমরা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উল্লাসে খানিক মজেছিলাম। চরে পৌঁছে আমরা দেখতে পেলাম হরেকরকম ফসল আবাদ হয়েছে। বাদাম, মিষ্টি আলু ও ছোলাসহ বিভিন্ন ফসল শোভা পাচ্ছে সেখানে।
চরের সৌন্দর্য উপভোগ করে আবারও যমুনার শীতল পানিতে সাঁতরে যখন তীরে পৌছালাম তখন সূর্য আমাদের খাঁড়াভাবে তা দিচ্ছে। তীরে পৌঁছে শরীরের পোশাক পাল্টে ফ্রেশ হয়ে আমরা পাশের মসজিদ থেকে জোহরের নামাজ আদায় করে বাড়ীর দিকে ফিরতে লাগলাম। ফেরার পথে আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়া চাই। খাওয়ার জন্য আমরা নলিন বাজার ঘুরে হেমনগর আসলাম।
হেমনগর রাজবাড়ীর কাছে এক রেস্টুরেন্টে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে প্রবেশ করলাম। সেখানে ডিম দিয়ে পেটপুরে খাওয়ার পর আসর নামাজ আদায় করে হেমনগর রাজবাড়ী ঘুরে ঘুরে দেখলাম। যেহেতু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে তাই বিলম্ব না করে সেখান থেকে রওনা হলাম। ফেরার পথে আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ গম্বুজওয়ালা মসজিদ ২০১ গম্বুজ মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করে বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
আর এভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একটি দিন আমাদের অতিবাহিত হলো। একাকিত্বের বেড়াজাল ছিন্ন করে আমাদের মিনি ট্যুর যুগযুগ স্মৃতি হয়ে থাকবে। এমন আনন্দঘন ও প্রফুল্ল দিন আমাদের জীবনে বারংবার আসুক এমন প্রত্যাশা করি।
লেখক: শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ
আরও পড়ুন
গরমে ঘুরতে গেলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে
আরব সাগরের নীল জলরাশি ছুঁয়ে যে শহর
কেএসকে