পুরান ঢাকায় সাকরাইন: ঘুড়ির আকাশ এখন আলোর দখলে

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশিত: ০৯:২৮ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
সাকরাইন উৎসব ঘিরে পুরান ঢাকার আকাশে লেজার শো’র ঝলকানি/ছবি: জাগো নিউজ

দিনের আকাশ ছিল রঙিন ঘুড়ির দখলে, কিন্তু সূর্য ডুবতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের অন্ধকার চিরে পুরান ঢাকার আকাশ এখন আগুনের ফুলকি আর বর্ণিল আলোর দখলে। যান্ত্রিক শব্দ আর লেজার লাইটের তীব্রতায় মনে হচ্ছে, নতুন করে জেগে উঠেছে বুড়িগঙ্গার তীরে।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষ সংক্রান্তি বা সাকরাইন উৎসবের রাত এভাবেই ‘আলোর নগরী’-তে পরিণত করেছে পুরান ঢাকাকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল পর্যন্ত ছাদে ছাদে যে নাটাই-সুতোর লড়াই চলছিল। গোধূলি নামার সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নিয়েছে আতশবাজির মহোৎসবে। গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার আর নারিন্দার প্রতিটি বাড়ির ছাদ থেকে ছোঁড়া হচ্ছে রকেট ভলি, রোমান ক্যান্ডেল আর হাউই বাজি। মুহুর্মুহু শব্দ আর লাল-নীল-সবুজ আলোর ঝলকানিতে মুহূর্তের জন্য দিনের আলোর বিভ্রম তৈরি হচ্ছে।

একই সঙ্গে আকাশে উড়ছে ফানুস। নিচ থেকে দেখলে মনে হয়, অন্ধকার আকাশে যেন তারাগুলো একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে। রাত যত বাড়ছে, আতশবাজির গর্জন আর আলোর তীব্রতা যেন ততই বাড়ছে।

উৎসবে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ঘুড়ি ওড়ানো দিনের নেশা। কিন্তু রাতের আসল রোমাঞ্চ এই ফানুস আর আতশবাজি। পুরো আকাশটা যখন ফানুসে ছেয়ে যায়, সেই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

পুরান ঢাকায় সাকরাইন: ঘুড়ির আকাশ এখন আলোর দখলে
সাকরাইন উৎসবে পুরান ঢাকার বিভিন্ন বাড়ির ছাদে আয়োজন করা হয়েছে ডিজে পার্টির/ছবি: জাগো নিউজ

লেজার শো ও ডিজে পার্টির আধুনিকতা

ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব এখন আর কেবল ঘুড়ি ও পিঠা-পুলিতে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছর ধরে সাকরাইনের রাতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক লেজার শো। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার বিম দিয়ে আকাশের বুকে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সুউচ্চ শব্দের ডিজে মিউজিক। তরুণরা নেচে-গেয়ে উদযাপনে মেতেছে, যা এই উৎসবকে দিয়েছে এক আধুনিক ও যান্ত্রিক রূপ।

তবে আলোর এই ঝলকানি সবার জন্য আনন্দের বার্তা আনেনি। ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ার কারণে আতশবাজি ও ফানুস থেকে অগ্নিকাণ্ডের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হানিফ বলেন, আলোর খেলা সুন্দর, কিন্তু তীব্র শব্দ আর আতশবাজির ধোঁয়ায় টেকা দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ শব্দের কারণে বাড়িতে অসুস্থ মানুষ বা শিক্ষার্থীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সঠিকভাবে উৎসব পালনের জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

নারিন্দার প্রবীণ বাসিন্দা মোহন রায় বলেন, আগে সন্ধ্যার আলো ছিল স্নিগ্ধ। আমরা প্রদীপ জ্বালাতাম, পরিবারের সবাই মিলে উঠানে বসতাম। এখনকার আলোর ঝলকানি চোখ ধাঁধিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই প্রাণের টানটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। উৎসব এখন কেবলই জাঁকজমক আর বিনোদনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমডিএএ/এমএমকে/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।