চট্টগ্রামে তেলের সংকট নেই, তবুও পাম্পে দীর্ঘ লাইন
চট্টগ্রাম নগরীতে জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট না থাকলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন ও চরম ভোগান্তি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতা, সরবরাহে সাময়িক চাপ এবং গুজব—এই তিন কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার সরেজমিন নগরীর বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ পাম্পে তেল রয়েছে। কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে, আবার কিছু পাম্পে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে। বুধবার (২৫ মার্চ) এ সংকট কেটে যাবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই পেট্রোল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ভোগান্তিতে তেল না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
আবার অনেকেই জার নিয়ে বাসায় তেল মজুত করছেন। ৫ ও ১০ লিটারের জার বাইকের পেছনে ঝুলিয়ে তেল নিয়ে যেতে দেখা গেছে। নগরের কিছু পাম্পে পর্যাপ্ত তেল দেওয়া হলেও কোথাও ২০০ টাকার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বায়েজিদের সেনা কল্যাণ পাম্প, গণি বেকারির কিউসি ট্রেডিং এবং নতুন ব্রিজের মীর ফিলিং স্টেশনে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ষোলশহরের ফোসিল পাম্পে ২০০ টাকা করে তেল দেওয়া হচ্ছে। পাঁচলাইশের পদ্মা অয়েল পাম্পে ২ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের দিন ও পরদিন সরকারি ছুটির কারণে দেশের বিভিন্ন জ্বালানি ডিপো বন্ধ থাকায় সাময়িকভাবে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। একই সঙ্গে ব্যাংক বন্ধ থাকায় পে-অর্ডার করতে না পারায় ফিলিং স্টেশন মালিকরা ডিপো থেকে নতুন করে তেল তুলতে পারেননি। ফলে অনেক পাম্পে তেলের স্বল্পতা দেখা দেয় এবং কোথাও কোথাও দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, ঈদের ছুটি শেষে মঙ্গলবার থেকে ব্যাংক খোলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ফিলিং স্টেশন মালিকরা আবার পে-অর্ডার করতে পারছেন এবং ডিপো থেকেও নতুন করে তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, বুধবারের মধ্যেই পাম্পগুলোতে এই সংকট কেটে যাবে।
চালকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে তেলের সংকট না থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
রাইডশেয়ার চালক শরিফুল ইসলাম জানান, ভবিষ্যতে সংকট হতে পারে—এই আশঙ্কায় অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করতে পাম্পে ভিড় করছেন।
চট্টগ্রাম নগরের গণিবেকারি এলাকার কিউসি ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপক মীর খান জানান, গত তিন দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় জ্বালানি তেলের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। অনেক চালক প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি তেল নিতে চাইছেন। ফলে দ্রুত মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে অনেক জায়গায় বিক্রির পরিমাণ সীমিত রাখা হয়েছে, যাতে বেশি সংখ্যক গ্রাহক অন্তত কিছু তেল নিতে পারেন।

নতুনব্রিজ এলাকার মীর ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। শত শত মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অ্যাম্বুলেন্স লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তেল পাওয়ার আশায় চালকেরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন।
মীর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জানান, ঈদের ছুটির পর হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।
তাদের মতে, প্রকৃত অর্থে বড় কোনো ঘাটতি না থাকলেও সরবরাহের ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ‘কৃত্রিম সংকটের’ মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ভোগান্তি বেশি হচ্ছে।
এদিকে দীর্ঘ লাইনের কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে যানজট তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারে গুজব নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয় এবং তদারকি জোরদার করা গেলে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. মারুফ বলেন, দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পেয়েছি। ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে নিয়েছি।
এদিকে গ্রাহকদের অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, ঈদের ছুটির কারণে ডিপো বন্ধ থাকায় সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল, যার প্রভাব পাম্পগুলোতে পড়েছে। তবে এখন ডিপোগুলো চালু হয়েছে এবং নিয়মিত তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে।
গ্রাহকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনের বেশি তেল কিনে মজুত না করতে। অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা অযথা ভিড় ও সংকট বাড়ায়।
মন্ত্রী দাবি করেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
এমআরএএইচ/এসএইচএস