পর্যটন ও পরিবেশের স্বার্থে রক্ষা করতে হবে সুন্দরবন
হাসান জাহিদ
সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বা পেরা বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ইউনেস্কো স্বীকৃত সুন্দরবন। এই বন ধুঁকছে অতিমাত্রায় আহরণে, মানব-হস্তক্ষেপে ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলে। সুন্দরবনের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে মানুষের বিষাক্ত নখের আঁচড় পড়েনি।
ভৌগোলিকভাবে ভগ্ন বা ফ্র্যাজাইল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাচীনকাল থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে এই জাদুকরি-অপরূপ জোয়ারভাটার বন। তবে মানুষের অত্যাচারে ন্যূব্জ হয়ে দুর্বল সুন্দরবন ২০০৭ সালে সিডরের ভয়াবহ আক্রমণ থেকে উপকূলবাসীকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারেনি বরং নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর আইলাসহ আরও অনেক বিধ্বংসী ঝড় সুন্দরবন সামলাতে পারেনি।
১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,৫১৭ বর্গকিলোমিটার (৬৬%) বাংলাদেশে। বাকি অংশ (৩৪%) রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশের বিশাল অংশের এই বনের এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে মানুষ ক্ষত সৃষ্টি করেনি। সুন্দরবনের ওপর অত্যাচর চলছে বনের সম্পদ আহরণকারী ও সুন্দরবন ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও লুটপাটে পোড়া। প্রধান কারণগুলো:
>> অতি আহরণ
>> অপরিপক্ব সুন্দরীগাছ ও অন্যান্য গাছ কর্তন
>> অতিমাত্রায় মধু ও গোলপাতা আহরণ
>> বুনোপ্রাণীর আবাসস্থল সংকোচন ও ধ্বংস
>> বনদস্যুদের উৎপাত
>> চোরাশিকারিদের উৎপাত
>> হরিণ শিকার করে তার মাংস বিক্রি
>> বনের ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও লুটপাট
>> ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন
>> ভারসাম্য ও ইকোসিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়া
>> বনের ভেতরে নদী বা খালে চলন্ত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকার বর্জ্য ও পোড়া তেল জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অনেক সময় শোনা যায় এবং বিবিসির প্রামাণ্যচিত্র ও অন্যান্য প্রামাণ্যচিত্র থেকে দেখা যায়, বাঘ গাঁয়ে ঢুকে মানুষ বা গরু-ছাগল মেরে ফেলছে। গ্রামবাসী জাল বা ফাঁদ পেতে ও অন্যান্য উপায়ে বাঘ আটক করে পিটিয়ে মারছে। বাঘকে মানুষখেকো আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। বাঘ শক্তিশালী ও সাহসী শিকারি হলেও তারা মানুষকে ভয় পায় ও এড়িয়ে চলে। তাদের গ্রামে ঢুকে পড়ার অন্যতম কারণ তারা তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। মনুষ্য হস্তক্ষেপে দিশেহারা ও বিপন্ন।
বহুকাল আগে যেটা হতো, এখন সেটা হয় না। বাঘ বুড়ো হলে বা আহত হয়ে স্বাভাবিক শিকারে অক্ষম হলে সহজ শিকার মানুষকে খাদ্যে পরিণত করতো। তখন তেমনটি হলে তাকে মানুষখেকো আখ্যা দেওয়া হতো, আর সরকার থেকে শিকারিদের আহ্বান জানানো হতো মানুষ হত্যাকারী বাঘকে মেরে ফেলতে। সিডরের পর জলোচ্ছ্বাস ও স্রোতে বরগুনাসহ অনেক অঞ্চলে মরে ভেসে এসেছিল বুনোশুয়োর, হরিণ ও নানাজাতের পাখি।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, ইকোসিস্টেম ও মানুষের মধ্যে একটা প্রাকৃতিক ও অদৃশ্য ভারসাম্যের শৃঙ্খল ছিল। মানুষের সংখ্যার জ্যামিতিক বৃদ্ধি ও মানুষের লোভী মনোভাবের কাছে প্রকৃতি হার মেনেছে। আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে মানবসংখ্যার হার কি অস্বাভাবিক বেশি নয়? যে হারে প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে, সে হারে মানুষের শিক্ষা-সচেতনতা নৈতিকতা বাড়ছে না। বাড়ছে লোভ, দুর্নীতি ও অপরাধের প্যারামিটার। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, শেখ হাসিনার আমলে প্রধান বনরক্ষক বা ‘বনভক্ষক’র বিছানা ও বালিশের তলে কোটি কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছিল?
বনদস্যুরা গরিব ও অসহায় বাওয়ালি-মৌয়ালদের জিম্মি করে পণ দাবি করে। জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দেয়। কোস্ট গার্ড বাংলাদেশ বন থেকে চোরাচালানি, তথা গাছ পাচার ও চোরাশিকারি রোধে কাজ করছে। সূত্রমতে, বড় বড় ট্রলারে কাচা গাছ ভারী কিছুতে (পানিতে যেন না ভেসে ওঠে) বেঁধে অপরাধী চক্ররা গাছ পাচার করছে। এ রকম অনেক ফিরিস্তি দেওয়া যায়।
বনে বিচরণকারী গরিব বাওয়ালি-মৌয়াল ও জোংড়াখোটারা অভাবে পড়ে অতি আহরণ করেন। জেলেরাও তাই করেন। এদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মাবলি সরকার থেকে দেওয়া আছে। কখন মাছ ধরতে হবে, কোন বয়সের সুন্দরী, বাইন বা হেঁতাল গাছ কাটতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এই নিয়ম পালন করতে পারেন না শিক্ষা, সচেতনতা ও অভাবের কারণে। এসব হতভাগ্য বাওয়ালি বা মৌয়ালদের অনেকেই এ পেশা থেকে সরে যাচ্ছেন। কেউ বিকল্প কাজ খুঁজে নিচ্ছেন, কেউবা উদ্বাস্তু হয়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছেন।
সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারতো। কিন্তু বিশ্বমানের তো দূরের কথা, দেশের অভ্যন্তরেই খুব বেশি মানুষ সুন্দরবন যান না প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিরাপত্তার অভাব ও সুন্দরবনের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ফলে। যুগে যুগে এই বনের ওপর মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা সীমা লঙ্ঘন করে গেছে।
মানব হস্তক্ষেপ, বেহিসেবি সম্পদ আহরণ, নির্বিচারে গাছ কর্তন, চোরাকারবারি, অতিরিক্ত গোলপাতা আহরণ, বাঘের গহীন আশ্রয়ে মানুষ ও বনদস্যুর পদচারণা, বনবিভাগের দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় সুন্দরবন প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে। বনবিবি ও দক্ষিণ রায়ের সুন্দরবন, বনবিবি মিথ হারিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের ওপর বিনাশী প্রভাব। যে মিথ তৈরি হয়েছিল ভয়ংকর-সুন্দর বাঘকে নিয়ে; সেই বাঘও বিপর্যস্ত-বিপন্ন ও চরমভাবে বিপন্ন তালিকাভুক্ত।
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের এই করুণ পরিণতি মানুষেরই লোভী মনোবৃত্তির যোগফল। ২০০৫ সালে গণনায় সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪০৫টি। ২০১৭ সালে তা এসে ঠেকেছিল ১০৪টিতে। মাত্র চৌদ্দ বছরে ৩০০ বাঘ নাই হয়ে গেছে। তাহলে ধরে নেওয়া যায়, প্রতি বছর ২১টি করে বাঘ বিলীন হয়েছে। এই হারে নাই হলে অচিরেই সুন্দরবনের বাঘ নিঃশেষিত হয়ে যাবে।
সুন্দরবনের ওপর মানুষের নির্মম আচরণে সুন্দরবন ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য আজ চরম হুমকির মুখে। সুন্দরবন নিশ্চিহ্ন হলে হারিয়ে যাবে বনবিবি মিথ ও সেই সম্পর্কিত ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রথাগত ঐতিহ্য। বাংলাদেশের সুন্দরবনের ভারসাম্য ঠিক থাকলে ও বাঘের বসবাসযোগ্য হলে আরও একটি কারণে এই অংশে বাঘের সংখ্যা বাড়তে পারতো। সুন্দরবনের পশ্চিম অংশ থেকে বাঘ হয়তো এই অংশে মাইগ্রেট করতো।
সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাব
গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আমাদের কাঁধে চেপে আছে আদানির বিদ্যুতের বোঝা আর রামপালের অভিশাপ। এই দুটোই শেখ হাসিনা করেছিলেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে ত্রিশ পৃষ্ঠার বেশি দীর্ঘ যে রিপোর্টটি ইউনেস্কো প্রকাশ করেছে, এতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের মূলত চার ধরনের ক্ষতির আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়:
১. রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে কয়লা পুড়িয়ে। এই কয়লা পোড়ানোর পর সেখান থেকে নির্গত কয়লার ছাইকে সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইউনেস্কোর এই রিপোর্টে।
২. বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্য এবং পানিকে দ্বিতীয় হুমকি গণ্য করেছে ইউনেস্কো।
৩. এই প্রকল্পকে ঘিরে সুন্দরবন এলাকায় যেভাবে জাহাজ চলাচল বাড়বে এবং ড্রেজিং করার দরকার হবে, সেটিও সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৪. আর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে ওই অঞ্চলের সার্বিক শিল্পায়ন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে মনে করেন ইউনেস্কো ও বিশেষজ্ঞরা।
ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার এবং ইন্টারন্যাশনাল কনজারভেশন ইউনিয়নের তিনজন বিশেষজ্ঞ সরেজমিনে ঘুরে দেখে এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে রিপোর্টটি তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্টের জন্য আইইউসিএন যে নির্দেশনা দিয়েছিল, তা মেনে চলা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয় এ রিপোর্টে।
এ ছাড়া সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য ক্ষতি এড়াতে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে ধরনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং যেরকম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা উচিত, সেটাও করা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করা হয় রিপোর্টে। সুন্দরবনের দিকে নজর পড়ছেই উদ্যোক্তাদের। এমনকি সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে ফার্নেস ওয়েল চালিত স্বল্প মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রচেষ্টা চলছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর দেখতে পায়, প্রকল্পটি সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনের প্রান্তসীমা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত, যা সুন্দরবনের পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকার মধ্যেই পড়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী, পাওয়ারপ্যাকের প্রকল্পটি ‘লাল বা বিপজ্জনক শ্রেণিভুক্ত’।
খোদ ভারতীয় পরিবেশ গাইডলাইনসেই বলা আছে, যে কোনো সংবেদনশীল প্রাকৃতিক স্থাপনার অন্তত ২০ কিলোমিটার পেরিফেরিতে কোনো ভারী শিল্পস্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বর্জ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না।
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশেরই অমূল্য সম্পদ নয়, বিশ্বের কাছেও এ বন গুরত্বপূর্ণ হেরিটেজ। ইউনেস্কো এসব হেরিটেজ রক্ষার্থে সারাবিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে। এই তো কিছুদিন আগে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের হস্ত বুনন শিল্প জামাদনি শাড়িকে তারা স্বীকৃতি দিয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় আমাদের সরকার ও জনগণের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল একে অস্তিত্বমান রাখা, এর প্রসার ও বিশ্বে এর বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার। এ বুননশিল্পের জন্য বৃহত্তর বুনন পল্লি সৃষ্টি করা জরুরি।
আমরা মনে করি, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার অবিলম্বে সুন্দরবনকে বাঁচাতে ও জামদানি বুননশিল্পকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি, দুই পদ্ধতিতেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপনীত করার উদ্যোগ নেবে। পরিবেশ ও পর্যটন শিল্প রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
এসইউ