প্রিয়া যখন ভয়ঙ্কর
ভয়ঙ্কর প্রিয়ার জেল জুলুমেও ভয় নেই। ঠান্ডা মাথার কিলার প্রিয়া। ব্যবহার করেন না আগ্নেয়াস্ত্র। হাতিরঝিলে যুবদল নেতা সেন্টুকে গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতারের পর জেলে গিয়েও থেমে থাকেনি প্রিয়া। জেলে বসেই পরিকল্পনা করেন ডাকাতির। অন্য অপরাধীদের সাথে যোগাযোগ করে জেল থেকে বেড়িয়েই পাজেরো গাড়ীর চালক টিপু সুলতানকে খুন করে গাড়ী ডাকাতি করে প্রিয়া।
চালককে খুন ও পাজেরো গাড়ী ডাকাতির অভিযোগে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মোর্শেদা আক্তার প্রিয়া (৩২) ও সহযোগী মেহেদী হাসানকে (৩৬) আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত শনিবার রাতে রাজধানীর শাহআলী থানাধীন ১ নম্বর সেকশনের গোদারা ঘাটের কাজী ফুড়ি এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে প্রিয়া। শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এসএমইসিআই প্রকল্পের পাজেরো স্পোর্টস জীপের (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩-৮১০৪) চালক ছিলেন টিপু সুলতান। প্রিয়ার সহযোগী মেহেদীর পূর্বপরিচিত ছিলেন টিপু।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রিয়া ডিবি পুলিশকে জানায়, পরিকল্পনা অনুয়ায়ী গত ১৬ মার্চ সন্ধ্যায় ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন শেওড়া এলাকায় মেহেদী হাসানের ভাড়া বাসায় মিলিত হয় প্রিয়া। সেখানে প্রিয়ার কথা মতো মেহেদী তার পূর্ব পরিচিত চালক টিপু সুলতানকে বাসায় ডাকেন। টিপু সুলতান সেখানে উপস্থিত হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কৌশলে প্রিয়া কোকের সঙ্গে নেশা জাতীয় ওষুধ খাওয়ায় টিপুকে।
এরপরই তারা দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে গাড়ীতে ওঠে। গাড়ী চালানোর সময় ঘুম ঘুম ভাব লাগছে বলে টিপু তাদের জানায়। এসময় তারা ঘুম কাটানোর কথা বলে আবারো চেতনা নাশক ওষুধ খাইয়ে তাকে পেছনের সিটে বসিয়ে চালকের আসনে বসে পড়ে মেহেদী।
পরে ১৭ মার্চ সকালে তারা টিপুকে অচেতন অবস্থায় হাত-পা বেঁধে রাস্তার উপর ফেলে দেয় এবং জীপটি তার মাথার উপর তুলে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ীর রাস্তায় টিপু ফেলে দিয়ে জীপ নিয়ে চলে যায় প্রিয়া ও মেহেদী।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রিয়া ডিবি পুলিশকে আরও জানায়, ইতিপূর্বেও যুবদল নেতা সেন্টুকে হাতিরঝিলে গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যার নেপথ্যে ছিল তার পরিকল্পনা। ওই ঘটনায় প্রিয়া গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলে সেখানে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পায় মেহেদী হাসানকে এবং মেহেদীর সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে প্রিয়া। আর সেই পরিকল্পনা মোতাবেক খুন হন পাজেরো গাড়ী চালক টিপু সুলতান।
প্রিয়া ও মেহেদী আরও জানান, হত্যাকাণ্ডে কোন ধরণের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন না তারা। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও বহনে ঝুঁকি থাকায় শ্বাসরোধ কিংবা গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যার কাজ সহজ মনে করেন তারা।
শনিবার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে প্রিয়ার সাথে আটক হন গাড়ী ছিনতাইকারী চক্রের দুইজন। গ্রেফতারকৃতরা জেলে বসেই চালককে হত্যা ও পাজেরোটি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে।
এ ব্যাপারে ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিচালক হাবিবুল ইসলাম গত ১৭ মার্চ দারুসসালাম থানায় লিখিত অভিযোগ করেন, এসএমইসিআই প্রকল্পের চালক টিপু সুলতান পাজেরো জীপসহ নিখোঁজ রয়েছে।
এ অভিযোগের ভিত্তিতে ডিবি (পশ্চিম) গাড়ী চুরি প্রতিরোধ টিম অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। এর আগে গত ১৭ মার্চ তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ী এলাকা থেকে ওই চালকের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ। পরে ১৮ মার্চ তার স্ত্রী ইতি পারভিন ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে প্রকল্পের চালক টিপু সুলতানের লাশটি সনাক্ত করেন।
আটককৃতরা কি উদ্দেশ্যে গাড়ী ছিনতাইয়ের আগে চালককে হত্যা করলো জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃতরা পেশাদার ছিনতাইকারী। ছিনতাই এর কাজে বাধা আসলে খুনের ঘটনাও ঘটায় অবলীলায়।
এর আগেও তারা একাধিকার গ্রেফতার হয়েছিল উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, ওরা ভেবেছিল গাড়ীটি বিক্রি করে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। মূলত গাড়ী ছিনতাই করার উদ্দেশ্যেই তারা এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। তাদের সঙ্গে হোসেন নামে আরো একজন জড়িত ছিল বলে জানা গেছে, তাকেও খুঁজে বের করা চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং রিমান্ডে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান তিনি।
জেইউ/আরএস/পিআর