উত্তরায় এডিসি-এসির সঙ্গে ওসি-এসআই দ্বন্দ্ব
রাজধানীর উত্তরা থানার এক সুস্থ আসামিকে ওসির অনুমতি ব্যতীত রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগে জোন পুলিশের এডিসি ও এক সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি, পরিদর্শক ও এক এসআই উত্তরা পশ্চিম থানায় পৃথক এ তিনটি জিডি করেন। গত ২৭ ও ২৮ মার্চ এই জিডি তিনটি লেখা হয়।
সূত্র জানা গেছে, ওসি তার দায়ের করা জিডিতে লিখেছেন, ‘২৭ মার্চ রাতে আমার অনুপস্থিতিতে রিমান্ডে থাকা সুস্থ আসামি সিফাতকে উত্তরা জোনের এসির অফিসে নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট এসি, এডিসি নির্যাতন করেন। আসামিকে সুস্থভাবে নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় পাঠানো হয়েছে।’
জিডির বিষয়টি তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ মারুফ হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যোগাযোগ করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সলেমান জানান, রিমান্ডের আসামি নিতে হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আমাকে কোনো কিছু না জানিয়ে আসামিকে উত্তরা জোনের এসি স্যারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর সুস্থ আসামিকে অসুস্থ অবস্থায় পাঠানোয় আমি জিডি করেছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের পুল ক্লাবের মালিক সোবহান খানকে অজ্ঞাত ব্যক্তি ৩ মার্চ রাতে পায়ে গুলি করে। এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ সোবহান উত্তরা পশ্চিম থানায় সিফাত আহমেদ রাব্বি নামে একজনকে সন্দেহভাজন আসামি করে মামলা (৩২৬ ধারা) দায়ের করেন।
পরের দিন ৫ মার্চ সিফাতকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। পরবর্তীতে দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলে ২৬ মার্চ কারাগার থেকে থানায় নিয়ে আসা হয় সিফাতকে।
২৭ মার্চ রাতে উত্তরা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শাহেদ ফেরদৌস রানা উত্তরা-পূর্ব থানার দ্বিতীয় তলায় তার অফিসে সিফাতকে নেন। সেখানে সিফাতকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই রাতেই অসুস্থ অবস্থায় উত্তরা-পশ্চিম থানায় ফেরত পাঠায়ে দেয়া হয় সিফাতকে।
সুস্থ আসামিকে নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় ফেরত পাঠানোয় ওই রাতেই থানার পরিদর্শক মঈনুল কবির ও মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সলেমান পৃথকভাবে দুটি জিডি করেন। ২৮ মার্চ থানার ওসি রফিকুল ইসলাম নিজেও একটি জিডি করেন।
ওসি জিডিতে উল্লেখ করেন নিজের অনুপস্থিতিতে রিমান্ডে সুস্থ আসামিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট এসি, এডিসি নির্যাতন করে অসুস্থ অবস্থায় পাঠিয়েছেন। এঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ মারুফ হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা-পশ্চিম থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এটা অভ্যন্তরীণ বিষয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে, তাছাড়া তথ্য অধিকার আইন মোতাবেক এটি তথ্য প্রকাশের বিষয় নয়। এ ব্যাপারে এ মুহূর্তে আমার কোনো মন্তব্য নেই। পরিদর্শক মঈনুল কবিরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে ২৮ মার্চ সিফাতকে কারাগারে পাঠানো হয়। তার জামিন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে হাজির করার নির্দেশ এলে কারাগার থেকে জানানো হয় সে অসুস্থ। সে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিফাতদের বাসা উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডের ৮ নম্বরে। সিফাতের পরিবার ভবনের ৭ম ফ্লোরে ভাড়ায় থাকেন। সিফাতের বাবা ফিরোজ আহমেদ মা সাবিকুন্নাহার আইরিন।
সিফাত ২০১০ সালে স্কলাস্টিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ-লেভেল পরীক্ষা দিয়ে একটি বিষয়ে ফেল করে। এরপর সে আর পড়ালেখা করেনি।
ঘটনার বিষয়ে বাবা ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমার ছেলে গুলির ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, শত্রুতার জেরে সিফাতকে আসামি করা হয়েছে। ছেলেকে রিমান্ডের নামে এডিসি, এসি সাহেব নির্যাতন করেছেন।
উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইকবাল হোসেন যোগাযোগ করা হলে তিনি তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হন নি।
উত্তরা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মুহাম্মদ শাহেদ ফেরদৌস রানা তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের কথা স্বীকার করে বলেন, আমার যা বলার তদন্ত কমিটিকে বলব।
জেইউ/বিএ/এমএস