তিস্তা চুক্তি নিয়ে ‘নির্ভার’ নয় বাংলাদেশ


প্রকাশিত: ০৮:২৮ এএম, ০৫ এপ্রিল ২০১৭

প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। দু’দেশের আলোচনার টেবিলে অনেক কিছুই রয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা চুক্তি না হলে ‘কিছু যায় আসে না’ বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।

তিস্তা চুক্তি না হলে আসলেই কিছু যায় আসে না! এ নিয়ে বাংলাদেশ সত্যিই কি নির্ভার?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কক্ষে ঢু মেরে জানা যায়, পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।

তাদের মতে, প্রত্যাশার পারদ কিছুটা কমাতেই তিস্তা চুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের ‘চাওয়ার’ ওপর আপাতত পেরেক ঠুকতে চাইছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে মনে ভিন্ন আশা নিয়ে তিনি সঙ্গী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর সফরে।

কী সেই ভিন্ন আশা- জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মোটা দাগে তিস্তা নিয়ে কোনো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয়নি ভারত। তবে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় অবশ্যই দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বিষয়টি উঠে আসবে। আর এটা নিয়ে আশার পারদ জ্বলছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। যা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পায়ের নিচের মাটিকে একটু হলেও নাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া মমতা নিজেও জানেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে এখন অন্যতম কাঁটা তিনি। তাই শেষ পর্যন্ত তিনি তিস্তা চুক্তিতে রাজি না হলে, মোদির কেন্দ্রীয় সরকার তাকে ছাড়াই চুক্তি করে ফেলতে পারেন।

কিন্তু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই ‘ম্যাজিক’ দেখাবেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিল নয়াদিল্লি সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী শনিবার হায়দরাবাদ হাউসে দ্বি-পক্ষীয় বৈঠকে বসবেন দুই প্রধানমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরেও একান্তে কিছু সময় আলোচনা করবেন তারা। আর সেই আলাপ থেকেই দুই নেতা তিস্তার ফর্মুলা বের করে আনতে পারেন বলেও আশা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনাকে বিরল সম্মান দেখিয়ে সফরকালে রাষ্ট্রপতি ভবনেই তার থাকার ব্যবস্থা করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। হাসিনার সম্মানে নৈশভোজের আয়োজনও করেছেন তিনি। প্রণবের ব্যক্তিগত এ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ যে হাতেগোণা কয়েকজন অতিথি থাকবেন, তাদের মধ্যে মমতাও রয়েছেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর।

আর তাই তিস্তার চুক্তি নিয়ে প্রণব মুখার্জিও বাংলাদেশের জন্য এগিয়ে আসবেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে তিস্তা চুক্তি সই না হলেও এ বিষয়ে অনেকটাই অগ্রগতি হতে পারে। আশা করা যায়, প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রতিশ্রুতি নিয়েই ফিরবেন।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কঠোর না হয়েও ভারতের কেন্দ্র মমতা ব্যানার্জির ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করেছে। আমরা আশা করছি এতে কিছুটা হলেও কাজ হবে। আর রাজি না হলে মমতাকে ছাড়াই ক্ষমতাবলে কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তি সই করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে গণমাধ্যমে যা বলা হচ্ছে, তা কোনোভাবে সত্য হলে বল থাকছে বাংলাদেশের কোর্টেই।

তিনি বলেন, তবে এটা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী এখনই হতে পারছি না। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই আমরা ‘আশা’ নিয়েই এগুচ্ছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কূটনীতিক জাগো নিউজকে বলেন, ধারণা করা হয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর কয়েক দফা পিছিয়েছে তিস্তা চুক্তিকে কেন্দ্র করেই। দীর্ঘ সাত বছর পর যখন সেই সফর হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই পুরো দেশ চুক্তির দিকে তাকিয়ে। সেকথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেন প্রধানমন্ত্রীও জানেন। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে কথা বলেছেন তা নিজেও বিশ্বাস করেন না। কারণ, তিনি জানেন তিস্তা দু’দেশের সম্পর্কের মধ্যে অন্যতম বড় ইস্যু।

তবে তার মতে, বাংলাদেশের প্রতি দিল্লি আরও একটু আন্তরিক হলেই এ সমস্যার সমাধান দ্রুত সম্ভব।

এদিকে শেখ হাসিনার এ সফরে ভারত বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি ডলারের ঋণের ঘোষণা দিতে পারে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র। অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপনসহ নানা প্রকল্পে এ অর্থ খরচ করা হবে। সফরে দুই দেশের মধ্যে ৩৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী।

সফরসূচি অনুযায়ী, শুক্রবার ভারতের পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাবেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীও এ সময় উপস্থিত থাকবেন। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি ভবন রাইসা হিলে নেয়া হবে।

সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। এদিন বিকেলে বাংলাদেশ হাইকমিশন পরিদর্শনে যাবেন শেখ হাসিনা। হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।

পরদিন সকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অব অনার দেয়া হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এ সময় উপস্থিত থাকবেন।

কর্মসূচি অনুযায়ী, এরপর শেখ হাসিনা রাজঘাটে অবস্থিত গান্ধী সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর হায়দরাবাদ হাউসে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বসবেন। দ্বি-পক্ষীয় বৈঠকের আগেই একান্ত আলোচনা সারবেন দুই প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটির হিন্দি অনুবাদ করেছে। সে বইটির মোড়ক উন্মোচন করবেন দুই প্রধানমন্ত্রী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা।

নয়াদিল্লি সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারী এবং কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধীও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গেও বৈঠক করবেন শেখ হাসিনা।

১০ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের একটি সম্মেলনেও বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ অনুযায়ী আজমির শরিফে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) মাজার জিয়ারত রাখা হয়েছে কর্মসূচিতে।

জেপি/জেডএ/এসআর/এমএআর/জেআইএম