মালয়েশিয়ায় গতি পাচ্ছে এমআরপি
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রায় সাড়ে সাত লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির হাতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) তথা ডিজিটাল পাসপোর্ট পৌঁছে দেয়ার পথে একধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। এমআরপি পাসপোর্ট সেবাদানে পরিবর্তন আনার ফলে দুর্ভোগ কমবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের।
অর্থ-সময়ের যাচ্ছেতাই অপচয় সেই সঙ্গে পদে পদে পোহাতে হত চরম ভোগান্তি। সীমাহীন এই কষ্টের দিন শেষ হয়ে আসছে, এমন আশাবাদ মালয়েশিয়ায় দায়িত্বরত বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এম এসকে শাহীন। দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানকল্পে প্রবাসীদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন দূতাবাসের এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ফার্স্ট সেক্রেটারি এম এসকে শাহীন বলেন, এখানকার বাংলাদেশি পরিবার পরিজনরা এবং সে দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা যাতে কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়া পাসপোর্ট সংক্রান্ত যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন, সে জন্য দূতাবাসের হেল্পলাইনেরও সহযোগিতা নিতে পারেন প্রবাসীরা। এ জন্য দূতাবাসের কর্তারা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য যে, শ্রমিকের এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) করতে ২৯ মে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডাটাএজ পাসপোর্টের আবেদনপত্র জমা নিতে শুরু করে। কিন্তু এর তিন মাস পর ডাটাএজ কর্তৃপক্ষ প্রবাসীদের হাতে পাসপোর্ট দেয়া শুরু করলেও ডাটাএজের কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন প্রবাসীরা।
সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, এমআরপি কার্যক্রম সরকার নির্ধারিত ফি ১১৬ রিঙ্গিতে চালু থাকলেও ব্যাংক ড্রাফ্ট ১১৬ এবং ডাটাএজের সার্ভিস চার্জ ৬০ রিঙ্গিত মোট ১৭৬ রিঙ্গিত ব্যাংক ড্রাফ্ট করার পরে জমা নেয়ার সময় প্রবাসীদের কাছ থেকে কর্তারা হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা। ফাইল প্রতি ১ থেকে দেড়শ রিঙ্গিত না দিলে ফিঙ্গারিং হয়না।
দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, ডাটাএজের বিরুদ্ধে এ রকম কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্তা নেয়া হতো।
একটি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩ নভেম্বর অতিরিক্ত সচিবের (বহিরাগমন ও নিরাপত্তা) সভাপতিত্বে এমআরপি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে উপস্থিত এক সদস্য জানান, মালয়েশিয়াতে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে এমআরপি প্রদান গত ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। এ তারিখের পর কোনো ধরনের ডাটা এনরোলমেন্ট অনলাইন সফটওয়ার-এ আসেনি। ফলে আউটসোর্সিং সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ স্থবির হয়ে যায়। মালয়েশিয়াতে পাসপোর্ট বিতরণ না হওয়ায় সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে ওই দিনের বৈঠকে উপস্থিত বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুল মাবুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এমআরপি নিয়ে সৃষ্টি হওয়া সমস্যা সাময়িক। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিষয়টি সমাধান হবে। এরপরও মালয়েশিয়াতে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে এমআরপি কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি সমাধানের পথে রয়েছে। আমরা আউটসোর্সিং কোম্পানিকে সাব-কন্ট্রাক্ট কোম্পানির ‘কন্ট্রাক্ট বাতিল আদেশ’ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করছি, কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়াতে বসবাসরত ছয় লাখ বাংলাদেশিকে এমআরপি দিতে ডাটাএজ-আইপিপল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার।
গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সই করা চুক্তিতে বলা হয়, তারা মালয়েশিয়ার আটটি প্রদেশে পাসপোর্ট দেয়ার জন্য আবেদন ও বিতরণ কেন্দ্র খুলবে। সেখান থেকেই এমআরপি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুবিধার জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়।
পাসপোর্ট অধিফিতর সূত্রে জানা গেছে, যৌথ কোম্পানিটি এমআরপির কাজ পাওয়ার পর তারা মালয়েশিয়ার আটটি রাজ্যে আধুনিক তালিকাভুক্তকরণ কেন্দ্র স্থাপন করে। এ কেন্দ্রগুলোতে ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন খোলা থাকলেও সেখান থেকে কোনো সেবা দেয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে আবেদন জমা নেয়ার পর ওই সব আবেদনের একটি কপি অনলাইনের মাধ্যমে ঢাকার বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরে পাঠিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু ঢাকায় এমআরপি দেয়ার কাজটি করছে ডিলার ইন্টারন্যাশনাল নামে পোল্যান্ডভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। আর সফটওয়ার তৈরির কাজটি করছে আইরিশ নামের একটি কোম্পানি।
কিন্তু তারা ঠিক সময়ে সফটওয়ার তৈরি করে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরকে দিচ্ছে না। তাই এমআরপি তৈরিতে সফটওয়ার সংক্রান্ত সহায়তা দেয়ার প্রতিষ্ঠান মালয়েশীয় আইরিশ কর্পোরেশনের গাফিলতির কারণে শুরুর দিকে এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ কারণে ঢাকায় মালয়েশিয়ার আউটসোর্সিং কোম্পানির ডাটা ট্রান্সফার করে ঢাকায় প্রিন্ট দেয়া অনেক দিন বন্ধ ছিল।
এদিকে মালয়েশিয়াতে দূতাবাস কর্মকর্তারা প্রায় ৬০ হাজার এমআরপি এ পর্যন্ত নিজেরা ইস্যু করতে পেরেছে। দূতাবাসের এমআরপি কার্যক্রম সরকার নির্ধারিত ফি ১১৬ রিঙ্গিতেই চালু রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি আউটসোর্সিং হিসেবে তথ্য সংগ্রহ ও পাসপোর্ট বিতরণের কাজ করবে সারা মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি অধ্যুষিত আটটি স্থানে। বাকি কাজ করবে কুয়ালালামপুর দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অধিদফতর।
২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাস মালয়েশিয়ায় থাকা সকল বাংলাদেশির হাতে ডিজিটাল পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন বলে আশা করছেন দূতাবাস কর্তারা।
বিএ/এমএস