পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহসহ ৭ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫৭ পিএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০৪:১৫ পিএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহসহ ৭ জন

মিরপুরের মাজার রোডের বাঁধন সড়কের বর্ধনবাড়ি এলাকার ভাঙ্গাওয়াল গলির ছয়তলা বিশিষ্ট ‘কমলপ্রভা’ নামের বাড়িটির পঞ্চমতলা যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পঞ্চমতলার ‘জঙ্গি আস্তানা’ থেকে দুই শিশুসন্তানসহ ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ এবং তার দুই স্ত্রী ও দুই সহযোগীর পুড়ে কয়লা হওয়া বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বুধবার বেলা ৩টা ১৮ মিনিটে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে পরপর তিনটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে প্রায় ৫০০ মিটার বেগে বিস্ফোরক পদার্থগুলো চারদিকে ছিটকে পড়ে। এতে ভবনের পঞ্চমতলার জানালার থাই গ্লাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

jagonews24

পঞ্চমতলার মেঝেতে ফাটল তৈরি হয়। ওই ফাটল দিয়ে পঞ্চমতলার ‘জঙ্গি আস্তানায়’ রক্ষিত কেমিক্যাল চতুর্থতলায়ও ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের পর ওই কেমিক্যালে আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ওই আগুনে ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহসহ তার দুই সহযোগী, দুই স্ত্রী ও দুই সন্তানও পুড়ে কয়লা হয়ে যায়।

র‌্যাব ডিজি আরও বলেন, চোখে দেখে নিহতদের কাউকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া তাদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ ২০০৫ সালে জঙ্গিবাদে (জেএমবি) সম্পৃক্ত হয়। ২০০৮-০৯ সালে জেএমবি ভেঙে তামিম-সারোয়ারের নেতৃত্বে নব্য জেএমবি গঠিত হয়। ওই সময় ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়।

তার বাসায় (‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ) নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ে প্রায় সব নেতাই সময় কাটিয়েছেন বলেও জানান র‌্যাব প্রধান।

প্রসঙ্গত, জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে সোমবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে ঘিরে ফেলা হয় রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডে বাঁধন সড়কের বর্ধনবাড়ি এলাকার ভাঙ্গাওয়াল গলির ছয়তলা বিশিষ্ট ওই বাড়িটি। বাড়িটিতে দুই স্ত্রী, সন্তান ও সহযোগীসহ দুর্ধর্ষ জঙ্গি আব্দুল্লাহ অবস্থান করছিলেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকও মজুদ করে রাখা হয়েছিল।

পরবর্তীতে তাদের আত্মসমর্পণ করার কথা থাকলেও মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা আত্মঘাতী হন।

jagonews24

র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহর বাবার নাম মৃত মীর ইউসূফ আলী, বাড়ি মেহেরপুরে। তার দুই স্ত্রী- নাসরিন ও ফাতেমা, দুই সন্তান- ওসমান (৯-১১) ও ওমর (৩)। ওই বাসায় আব্দুল্লাহর বোন মেরিনাও অবস্থান করছিলেন। তিনি সোমবার গভীর রাতে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পরবর্তীতে মেরিনার মাধ্যমে র‌্যাবের সঙ্গে আব্দুল্লাহর যোগাযোগ স্থাপন হয়।

আব্দুল্লাহর আরেক ভাই (৪৫), তবে তার নাম জানা যায়নি। তিনি কোরআনে হাফেজ বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে মুফতি মাহমুদ খান সংবাদকর্মীদের জানান, জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ না করে রাত পৌনে ১০টার দিকে পরপর বড় চারটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে র‌্যাবের চার সদস্য স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন। বিস্ফোরণের কারণে ওই ভবনের আগুন লেগে যায়।

বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল পৌনে ৯টার দিকে ওই বাড়ির ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি অভিযান শুরু করে র‌্যাব সদস্যরা।

এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মুফতি মাহমুদ খান ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ তার সহযোগীদের নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন।

jagonews24

তিনি আরও বলেন, তারা ধ্বংসাত্মক কিছু করতে পারে কি না- সেই বিষয়ে র‌্যাবের কড়া নজরদারি রয়েছে। র‌্যাবও সতর্কাবস্থায় আছে।

এর আগে বাড়িটির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এছাড়া টেলিফোন, ডিস ও ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। মানসিকভাবে চাপে ফেলতে এবং তারা (জঙ্গিরা) যাতে বাধ্য হয় আত্মসমর্পণ করতে- এ কারণে এসব করা হয়েছে বলেও র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

এরও আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেন, আব্দুল্লাহ দুর্ধর্ষ জঙ্গি। তার সঙ্গে আমাদের রাত ৪টা থেকে যোগাযোগ হচ্ছে। তাকে আমরা বিভিন্নভাবে আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানাই। তিনি আহ্বানে সাড়া দিয়ে কিছুটা সময় চেয়েছেন।

বেনজীর বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছি। এরপরও তিনি যদি আত্মসমর্পণ না করেন এবং র‌্যাবের ওপর হামলার চেষ্টা করেন তাহলে আমরা আইনি পদ্ধতিতে অভিযানে যাব।

বাড়িটিতে মোট ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। তবে এরই মধ্যে নারী ও শিশুসহ সব বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

jagonews24

ভেতরে কী পরিমাণ বিস্ফোরক রয়েছে জানতে চাইলে র‌্যাব প্রধান বলেন, আমাদের তথ্যমতে ভেতরে ৫০টিরও বেশি দেশীয় তৈরি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি বোমা) রয়েছে। এছাড়া অ্যাসিডসহ বিস্ফোরক তৈরির বিভিন্ন দ্রব্যাদি তার কাছে মজুদ আছে। ছোট একটা পিস্তল আছে বলেও আমরা ধারণা করছি।

টাঙ্গাইলের একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই আস্তানা থেকে জেএমবির দুই জঙ্গিকে আটক করা হয়। পরে তাদের তথ্য অনুযায়ী রাত ১টায় অভিযান চালিয়ে মাজার রোডের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দক্ষিণে বর্ধনবাড়ি এলাকার ভাঙ্গাওয়াল গলির ২/৩/বি নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলায় জঙ্গি আস্তানাটি খুঁজে পায় র‌্যাব। 

জেইউ/এমএআর/আরআইপি