মে মাসে জ্বালানি তেলে থাকছে স্বস্তি

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১২:১৫ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
ক্রমে কাটছে জ্বালানি সংকট/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে কমেছে লাইন। পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়ানোয় মজুত বেড়েছে পেট্রোলিয়াম জ্বালানির। আগামী মে মাসে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে আপাতত নির্ভার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)।

জানা যায়, বর্তমানে স্টোরেজ ও জাহাজ মিলে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল মজুত আছে বিপিসির হাতে। দুশ্চিন্তা কেটে গেছে অকটেন-পেট্রোল নিয়েও। এতে পুরো মে মাসের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরেছে বিপিসিতে।

মে মাসে আরও ১৭টি পার্সেলে আসবে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন জ্বালানি। পাশাপাশি পুনরায় উৎপাদনে আসবে ইস্টার্ন রিফাইনারিও। ফলে জ্বালানির সংস্থান নিয়ে প্রায় দুই মাসের নির্ঘুম রাত কাটার অবসান ঘটতে যাচ্ছে অপারেশনে যুক্ত বিপিসি ও তিন বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তাদের।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মো. মনির হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সারাদেশে প্যানিং বায়িংয়ের কারণে মাঠপর্যায়ে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিপিসির স্বাভাবিক অপারেশন, আমদানি সবই পরিকল্পিতভাবে হয়েছিল।’

‘দাম না বাড়িয়েই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল’

মূলত মার্চ মাসের শুরুর দিকে কৃত্রিম মজুত ঠেকাতে রেশনিং করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বালানির দাম না বাড়িয়েই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বড় অংকের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা দুরূহ ব্যাপার। যে কারণে গত ২০ এপ্রিল সহনীয় মাত্রায় জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়।’

‘সরকার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত সুচারুরূপে নিয়েছে। আমাদের জ্বালানি বিভাগের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা ও নির্দেশনা ছিল গোছানো। এর সুফল আমরা পাচ্ছি। এখন মে মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমাদের হাতে এসে গেছে’-বলছিলেন সরকারের এই কর্মকর্তা।

‘এখনো প্রায় তিন লাখ টনের মতো ডিজেল আমাদের হাতে আছে। মে মাসেও পরিকল্পনামাফিক জ্বালানি আসবে। এতে পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি সংকট কেটে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে।’

জ্বালানি তেল

স্পট মার্কেট থেকে প্রথমবারের মতো ২৫ হাজার টন ডিজেল কেনা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতদিন অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু কেউ চুক্তি করতে আসেনি। প্রথমবারের মতো পেট্রোগ্যাস পিজি জমা দিয়েছে। ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের জন্য তারা চুক্তিও করেছে। আশা করছি মে মাসে তাদের চালানটিও পাওয়া যাবে।’

এপ্রিল মাসে সাড়ে ৬ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি

বিপিসির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি (এপ্রিল) মাসে ১৭ পার্সেলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চায়না থেকে সব মিলিয়ে ৬ লাখ ৭৭ হাজার টন জ্বালানি আসবে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৬২ হাজার ২৩৮ টন ডিজেল, ৬১ হাজার ৬৩৬ টন জেট এ-১ এবং ৫৩ হাজার ৩৬৪ টন অকটেন রয়েছে। পাশাপাশি পাইপলাইনে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এসেছে ৪০ হাজার টন ডিজেল। ২৮ এপ্রিল ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আরেকটি পার্সেল আসছে। আবার মে মাসের ২৬ হাজার ৫১৮ টন অকটেনের একটি আগাম পার্সেল আগামী ২৯ এপ্রিল আসার কথা রয়েছে।

বন্দরে খালাসরত ৫ জাহাজ

গত ১০ দিনে ডিজেল-অকটেন ও জেট ফুয়েল নিয়ে ১০টির বেশি জাহাজ এসেছে বাংলাদেশে। কয়েকটি জাহাজ ইতোমধ্যে খালাস করে চলে গেছে। এখনো খালাসরত অবস্থায় রয়েছে পাঁচটি জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দরে বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ৫, ৬ এবং ৭ নম্বর ডলফিন জেটিতে তিন জাহাজ থেকে নিয়মিত পরিশোধিত জ্বালানি খালাস হচ্ছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৫ নম্বর জেটিতে ‘এমটি কোয়েতা’ থেকে ৩৩ হাজার ৪শ টন ডিজেল, ৬ নম্বর জেটিতে ‘এমটি জিং টং ৭৯৯’ থেকে ৩৪ হাজার ৬৬৭ টন জেট ফুয়েল এবং ৭ নম্বর জেটিতে ‘এমটি লিয়ান সং হো’ থেকে লাইটারিংয়ের ডিজেল খালাস করছে ‘এমটি লুসিয়া সোলিস’।

আরও পড়ুন

‘এত লোডশেডিং শেষ কবে হয়েছে ভুলে গিয়েছি’
উধাও দীর্ঘ লাইন, জ্বালানি সংগ্রহে ফিরেছে স্বস্তি
এক লাখ টন ক্রুডবাহী ‘এমটি নিনেমিয়া’ ৬ মে বাংলাদেশে আসছে
অকটেনে ‘ভাসছে’ বিপিসি, তবু পাম্পে হাহাকার

এর মধ্যে বন্দরের আলফা অ্যাংকরে অবস্থান করছে ৩৪ হাজার ৩৫৩ টন ডিজেলবাহী ‘এমটি এফপিএমসি ৩০’, ৩৩ হাজার ৪০৫ টন ডিজেল নিয়ে আসা ‘এমটি হাফনিয়া চিতা’ এবং ৩৫ হাজার ৫৫ টন ডিজেল নিয়ে আসা ‘এমটি প্রাইভ অ্যাঞ্জেল’। পাশাপাশি আলফা অ্যাংকরে থাকা আরেক জাহাজ ‘এমটি লিয়ান সং হো’ থেকে ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল লাইটারিংয়ে করে খালাস নেওয়া হচ্ছে।

২৮ এপ্রিল ‘এমটি গ্রান্ড কোভা’ নামে আরেকটি জাহাজ ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আসছে। পাশাপাশি ২৯ এপ্রিল আসছে ২৬ হাজার ৫১৮ টন অকটেনের একটি পার্সেল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরবরাহকারী যেসব পার্সেলের লেকেন (জ্বালানি বাণিজ্যে জাহাজ পৌঁছানোর ডেডলাইন) আছে সেগুলো নির্ধারিত সময়ে খালাস করে দেওয়া হচ্ছে। তবে যেগুলো লেকেন ফেল করেছে সেগুলো পরে খালাস করা হচ্ছে। কারণ লেকেন অনুযায়ী খালাস না নিলে জাহাজগুলোতে প্রতিদিনের জরিমানা গুনতে হয়। এক্ষেত্রে লেকেন ফেল করা জাহাজগুলো পরে খালাস নিলেও জরিমানা দিতে হবে না। এটি সরবরাহকারীর ব্যর্থতা।’

জ্বালানি তেল

তিনি বলেন, ‘মে মাসের নির্ধারিত অকটেনের একটি চালান আগেভাগে চলে আসছে। পার্সেলটিতে ২৬ হাজার ৫১৮ টন অকটেন থাকবে। ২৯ এপ্রিল জাহাজটি আসবে।’

মে মাসে আসবে সাড়ে ৫ লাখ টন জ্বালানি

মে মাসে সাড়ে ৫ লাখ টন জ্বালানি আমদানির শিডিউল চূড়ান্ত করেছে বিপিসি। এর মধ্যে ২৫ হাজার টনের স্থলে ২৬ হাজার ৫১৮ টনের অকটেনের পার্সেলটি ২৯ এপ্রিল আসার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ১৩টি পার্সেলে সাড়ে তিন লাখ টন ডিজেল, দুটি পার্সেলে ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং তিনটি পার্সেলে ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানি হবে।

পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে মে মাসে ২৫ হাজার টনের একটি পার্সেল আসার কথা রয়েছে। দুবাইভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’র পক্ষে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান জিসিজি গ্লোবাল কমার্স গেটওয়ে লিমিটেড এবং বিপিসির সঙ্গে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পেট্রোগ্যাস নামের প্রতিষ্ঠানটি আগে ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের জন্য পিজি দিয়েছিল। কিন্তু পরে চুক্তি করেনি। এখন ওই পিজি সারেন্ডার করে তারা ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের জন্য পিজি দিয়েছে। চুক্তিও করেছে।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/ এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।