আসছে বাজেটেই সর্বজনীন পেনশনের রূপরেখা, তবে…

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫৩ এএম, ২৯ মার্চ ২০১৮
আসছে বাজেটেই সর্বজনীন পেনশনের রূপরেখা, তবে…

উন্নত বিশ্বের মতো সবার জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী বাজেটেই এ ব্যবস্থার রূপরেখা দিতে চান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ কারণে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি’র খসড়া কাঠামো প্রস্তুতের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ে অর্থনীতিবিদরা। কবে নাগাদ ‘সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি’ কার্যকর হবে তারও কোনো সঠিক সময় বলতে পারেননি অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, এটি বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। অনেক চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে এ বিষয়ে কাজ করছে অর্থ বিভাগ। কিন্তু আগামী বাজেটেই অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে একটা রূপরেখা দিতে চান- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থ বিভাগ বলছে, ‘হ্যাঁ, বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে একটা রূপরেখা থাকবে। গত বছরের বাজেট বক্তৃতায়ও ছিল। তবে কার্যকরের বিষয়টি বেশ সময়সাপেক্ষ। এটি কার্যকর করতে বেশ সময় লাগবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পেনশন তহবিল হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। অর্থাৎ চাকরিজীবী ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এ তহবিলে অর্থ দেবে। এর পরিমাণ হতে পারে চাকরিজীবীর মূল বেতনের শতকরা ১০ ভাগ। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষও সমপরিমাণ অর্থ দেবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে একই নিয়মে তহবিল গঠন করা হবে।

পেনশনের এ তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য একটি রেগুলেটরি অথরিটি থাকবে। এ অথরিটির মাধ্যমেই পেনশনের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমের আওতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বয়স হবে ৬০ বছর। বেসরকারি খাতের জন্য ৬৫ বছর। নির্ধারিত সময়ে চাকরি শেষে অর্ধেক পেনশনের টাকা এককালীন তুলতে পারবেন। বাকি টাকা তহবিলে থাকবে। সে অর্থ পরবর্তীতে প্রতি মাসে ধাপে ধাপে উঠাতে পারবেন।

তহবিল পরিচালনার জন্য আলাদা রেগুলেটরি অথরিটি গঠন করা হবে। তারা লাভজনক খাতে তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করবেন। বিনিয়োগ সুরক্ষাও দেয়া হবে। এ থেকে যে মুনাফা আসবে, তার অংশ মাসে মাসে পাবেন সুবিধাভোগীরা। পেনশনভোগীদের স্মার্টকার্ড দেয়া হবে। প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমে ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সুবিধা থাকবে।

তবে বর্তমান সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এ ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে না। যে বছর থেকে এটি কার্যকর হবে, তারপর যোগদানকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এ পদ্ধতি। সূত্র আরও জানায়, সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতির আওতায় বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে বড় বড় কর্পোরেট হাউস, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে কর্মরত চাকরিজীবীদের আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য খাতের প্রতিষ্ঠানকেও আনা হবে।

মফস্বলের লোকজনকে কীভাবে এর আওতায় আনা হবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ‘যে কেউ বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তের ব্যাংকের শাখায় অর্থ জমা দিতে পারবেন। সেই অর্থ এখানে চলে আসবে। কিন্তু অর্থ দেবেন কিনা- এটাই বিষয়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কে? এ খাতে অর্থ দিলে রিটার্ন কত? এমন প্রশ্ন তো থেকেই যাচ্ছে।’

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের বিষয়ে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এজন্য পেনশন তহবিল জেনারেট করতে হবে। এ ফান্ড মেইনটেইনের জন্যও আবার অভিজ্ঞ লোকবল লাগবে।’

‘ইনভেস্টের জন্য শেয়ারবাজার আছে, ফিক্স ডিপোজিট আছে। পেনশনারদের অর্থ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলাম। শেয়ারবাজারের অবস্থা তো জানেন…। সুতরাং এ ফান্ড বিনিয়োগের মতো প্রোপার মার্কেট থাকতে হবে। যেটা বর্তমানে বাংলাদেশে নেই।’

‘ধরা যাক আইন অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডে পাঁচ লাখ টাকা জমা থাকার কথা। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। সরকারি অথরিটি ওই প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য গেলো। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বললো, তারা লসে ছিল। কর্মীদের বেতনও দিতে পারিনি। আবার প্রভিডেন্ট ফান্ড কোথায় পাব? তখন কী হবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যারা কর্মী তাদেরও তো ফান্ডে বেতনের একটা অংশ জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে কত, কী রিটার্ন আসবে সেটাও তো কর্মী হিসাব করবে। তাই তাদের এ ফান্ডের আওতায় আনতে সময় লাগবে।’

‘এটি পরিচালনার জন্য যে রেগুলেটরি অথরিটি থাকবে সেখানে একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে। সরকারের প্রথা অনুযায়ী, একজন সচিব অবসরগ্রহণের পর তাকে একটা পজিশন দিতে হয়। তাই তাকে এ অথরিটির চেয়ারম্যান করে দেয়া হলো। কিন্তু তিনি কার্মজীবনে এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। যখন এ বিষয়গুলো সবাই জেনে যাবে তখন কি কেউ এতে অংশগ্রহণ করবে? আবার সরকারের কাছাকাছি অনেক বড় বড় লোক থাকেন। কীভাবে, কোন প্রতিষ্ঠানের অর্থ হাতিয়ে নেয়া যায়, সে চেষ্টায় তারা থাকেন। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ যে থাকবে না, সেটাও তো মাথায় রাখতে হবে।’

‘সরকার এখন সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রচলন করছে। অথরিটির আওতায় সরকারি-টা ঠিক আছে। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরে তো সমস্যা রয়ে গেছে। তবে সর্বজনীনের বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে একটা চিন্তা শুরু হয়েছে, এটা ভালো। অবসরের পর সরকারি-বেসরকারি সব কর্মকর্তাকেই বসে থাকতে হয়। এ কারণে এ বিষয়ে একটা কিছু করতে হবে। বিষয়টিকে একটু গতিশীল করার জন্য আগামী বাজেট বক্তৃতায় এ ব্যবস্থার একটি রূপরেখা উল্লেখ থাকবে। গত বছরের বাজেট বক্তৃতায়ও যেমনটি ছিল।’

তবে পেনশন ব্যবস্থা কবে নাগাদ কার্যকর হবে- সেটা এখন বলা খুবই কঠিন। এটা বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। এগুলো নিয়ে কাজ করছে অর্থ বিভাগ- যোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতির উদ্যোগ ভালো। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এতে সরকারি-বেসরকারি পেনশনভোগীরা উপকৃত হবেন। তবে সরকারি খাতে সহজ হলেও বেসরকারি খাতে এটির বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করি।

‘কারণ, বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে হবে সরকারের। তারা রাজি না হলে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে পেনশন তহবিল পরিচালনা করাও কঠিন হবে’- যোগ করেন তিনি।

সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ শতাংশ। তারা পেনশন সুবিধা পান। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ৯৫ শতাংশের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত । তাদের কোনো পেনশন সুবিধা নেই। দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ার কারণে সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বেড়েছে। এ ঝুঁকি মোকাবেলা ও সমতা বিধান করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।

এমইউএইচ/এমএআর/আরএস/আরআইপি