সংসদে মুলতবি প্রস্তাব কী? ৩৩ বছর পর কেন ফিরে এল এই রীতি
জাতীয় সংসদে বুধবার ফিরেছিল এক প্রায় বিস্মৃত সংসদীয় অস্ত্র, ‘মুলতবি প্রস্তাব’। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভুলে থাকা রীতি আবার উঠে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। প্রায় ৩৩ বছর পর জাতীয় সংসদে এই প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শুধু একটি ঘটনাই নয়; এটি যেন সংসদীয় চর্চার পুরনো, শক্তিশালী এক ধারার নতুন করে জেগে ওঠা।
দিন তিনেক আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা শফিকুর রহমানের উত্থাপিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-সংক্রান্ত প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। সেই সূত্র ধরে ৩১ মার্চ মঙ্গলবার বহুদিন পর জাতীয় সংসদ দেখে এক জমজমাট বিতর্ক, যা স্বাভাবিক কার্যসূচি স্থগিত রেখে অগ্রাধিকার পেয়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ‘মুলতবি প্রস্তাব’?
প্রশ্নটা সেখানেই। একটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা কেন সংবাদ? কারণ, এটি সংসদের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত প্রক্রিয়াগুলোর একটি।সহজভাবে বললে, মুলতবি প্রস্তাব হলো এমন একটি প্রস্তাব, যা কোনো জরুরি ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আনা হয়। এটি এতটাই অগ্রাধিকার পায় যে, সংসদের চলমান সব কাজ স্থগিত রেখে ওই একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা হতে পারে।একজন সদস্য সংসদ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে নোটিশ দিলেই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। এরপর স্পিকারকে তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে হয় তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন কি না। গ্রহণ না করলেও কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়।
কী ঘটে এই আলোচনায়?
মুলতবি প্রস্তাবের মূল শক্তি তার ‘জরুরি’ চরিত্রে। সাধারণত দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়, প্রয়োজনে ভোটাভুটিও হতে পারে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে রাজনৈতিকভাবে বাধ্যবাধকতার মুখে পড়তে হয়।
তবে ভোটাভুটি না হলেও এর প্রভাব কম নয়। সংসদে এমন খোলামেলা বিতর্ক অনেক সময় সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে, জনমতকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে এটি একধরনের সংসদীয় ‘চাপ প্রয়োগের’ বৈধ পদ্ধতি হিসেবেও কাজ করে।সব বিষয়ে কি আনা যায়?না। নিয়ম বেশ কঠোর।• বিষয়টি সাম্প্রতিক হতে হবে • জাতীয় জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে হবে • আদালত বা তদন্তাধীন বিষয়ে হওয়া যাবে না • আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বিষয় হলে তা মুলতবি প্রস্তাবের আওতায় আসে না অর্থাৎ, এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয় – বরং এমন ইস্যু, যেখানে সংসদের তাৎক্ষণিক মনোযোগ জরুরি।
ইতিহাস কী বলছে?
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব খুব ঘন ঘন দেখা যায় না। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ১২টি সংসদে মোট ৩৫টি প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছিল দ্বিতীয় সংসদে।
১৯৯০ এর দশকের শুরুতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা যেমন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংসদে আলোচিত হয়েছিল এই প্রস্তাবের মাধ্যমে । এরপর দীর্ঘ বিরতি।
১৯৯১ সালের ২৩ এপ্রিল এনডিপি (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি) সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আনীত মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচনার জন্য গৃহীত হয়। এর বিষয়বস্ত ছিল ‘মেহেরপুরে বিএসএফ-এর গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ চার বাংলাদেশি নিহত’ হওয়ার ঘটনা। প্রস্তাবটি সংসদে গৃহীত হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। ১৯৯২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ‘পাকিস্তানী নাগরিক’ গোলাম আযমের জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রধান হওয়া নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব করেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য শামসুল হক (ময়মনসিংহ)। একই বছর ২৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনেন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেনন (বাকেরগঞ্জ)। প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং তা সংসদে আলোচিত হয়। ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়ে আলোচিত হয়। প্রস্তাবটি আনেন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (যশোর-২)। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের হাতে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর নেতা জোবায়ের চৌধুরী রিমু হত্যা। এরপর থেকে জাতীয় সংসদে কোনো মূলতুবি প্রস্তাব আলোচিত হয়নি।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ কমপক্ষে ২১ জনের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে সংসদে মুলতবি আলোচনার জন্য নোটিশ দেন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি। স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার না গ্রহন করার কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ওই বিষয়ে তখন চলমান বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা। ফলে বিষয়টি শুধু সংসদীয় নয়, রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
তাহলে এখন কেন ফিরল?
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবের ফিরে আসা নিছক নিয়মতান্ত্রিক ঘটনা নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে জনমত – সবকিছু মিলিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিতও এতে দেখা গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের র বক্তব্য অনুযায়ী প্রস্তাবটি বিরোধীদলীয় নেতা নিখুঁত ভাবে আনেন নি। তবু সেটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। এটিই ইঙ্গিত দেয়, রাজনৈতিক বিবেচনা কখনও কখনও প্রক্রিয়াগত কড়াকড়িকে ছাড়িয়ে যায়।উদারতার সংকেত, না কৌশল?
সমালোচকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ। আবার অনেকের মতে, দীর্ঘদিন পর এমন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংসদীয় উদারতারই প্রকাশ।
আসলে সত্যটা মাঝামাঝিই। মুলতবি প্রস্তাব যেমন সরকারের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে, তেমনি এটি গণতান্ত্রিক আলোচনার ক্ষেত্রও বিস্তৃত করে।
মুলতবি প্রস্তাব মানেই সরকারের বিরুদ্ধে তিরস্কার, এমন সরল সমীকরণ সবসময় ঠিক নয়। বরং এটি সংসদকে কার্যকর, প্রাণবন্ত এবং জবাবদিহিমূলক করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
প্রশ্নটা এখন একটাই। ৩৩ বছর পর যে দরজা খুলেছে, তা কি নিয়মিত ব্যবহারের পথে যাবে, নাকি আবারও বন্ধ হয়ে যাবে সময়ের সঙ্গে?