‘নির্বাচনী ব্যয় সৎ প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫৯ পিএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

নির্বাচনী ব্যয় অনেক সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। রোববার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ অভিমত দেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছি নির্বাচনটা অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। এখানে যতখানি না মানুষের ভোটাধিকার, তার থেকে বেশি ওইখানে (বিনিয়োগ) গেছে। নির্বাচনী ব্যয় এখন অনেক সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করছে। এ ব্যয় নিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সামর্থ্য নেই।’

নির্বাচনী ব্যয় গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠছে কি না তা এখন বড় বিষয়- এমন মন্তব্য করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যয়কে আগামীতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা যায় কি না দেখতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের যে ঘোষণা দেয়া হয়, তা পরবর্তীতে পরিবীক্ষণ করার আগ্রহ বা সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে বলে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে মনে হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘হলফনামায় সম্পদের যে বিবরণ দেয়া হয় তা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই থেকে যায়, এটাকে দলিল হিসেবে তার সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ কেউ নেয় না। নির্বাচন কমিশনের সেই সক্ষমতা না থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেই সক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং এটা তাদের আগ্রহের বিষয় হওয়া উচিত।’

ঋণখেলাপির বিষয়ে তিনি বলেন, ঋণখেলাপি হিসেবে যারা ধরা পড়েছেন, তাদের ঋণের পরিমাণ খুব বড় বিষয় না। আমরা প্রকাশ্যভাবে যেটুকু জানি, সেটা হলো- সব থেকে বড় বড় ঋণ গ্রহীতা যারা নির্বাচনে এসেছেন তারা বহু আগেই তাদের ঋণের প্রভাবগুলো অন্যান্য সংযোগ ব্যবহার করে ঋণকে সমন্বয় অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থায় নতুন একটি ঋণ দিয়ে সেই ঋণের অর্থায়ন করে সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছেন। অর্থাৎ লোক দেখানো একটা ব্যবস্থার এর মধ্যে চালু রয়েছে। সেটার প্রকৃত মূল্যায়ন করার জায়গা হয় তো নির্বাচন কমিশন না, সেটা দেখভাল করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এর জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থার যে সমন্বয় থাকার কথা ছিল, সেটা আমরা দেখি না।

‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন’ শীর্ষ এ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দেবপ্রিয় বলেন, গত এক দশ ধরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়কালে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষিত হয়েছে, ভৌত অবকাঠামো খাতে বড় ধরনে বিনিয়োগের ফলে জ্বালানি সংকট অনেকখানি নিরসন হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে ব্যপকতা প্রয়োজন ছিল সেটাও অনেকখানি বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি সামাজিক সুরক্ষার জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সেটাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সমগ্রিকভাবে এই সময়কালে (২০০৮-১৮) বাংলাদেশের বড় ধরনের উন্নয়ন আমরা লক্ষ্য করেছি।

তিনি বলেন, আমরা দেখেছি অর্থনীতির গুণগতমান দ্বিতীয়ভাগে (২০১৪-১৮) এসে প্রথমভাগের তুলনায় পতন ঘটেছে। সামাজিক বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সরকারের নতুন ধরনের নীতি নিয়ে নতুন উদ্যোগে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে উদ্যম, সেই উদ্যমেও আমরা কিছুটা ঘাটতি লক্ষ করেছি। এর বড় একটি কারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে গেছে।

সিপিডির বিশেষ এই ফেলো বলেন, এখনো পর্যন্ত নির্বাচনী আলোচনায় কোনো অর্থনৈতিক বিষয় আসেনি। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেভাবে আগাচ্ছে, তাতে নির্বাচন কিভাবে হবে? কেমন করে হবে? কারা করবে? কিভাবে করবে? এসব বিষয়ের প্রাধান্য রয়েছে। জীবন-জীবিকার বিষয় কিন্তু এখনো এই নির্বাচনী বিতর্কের মধ্যে স্থান লাভ করেনি। এটি বড় একটি পরিতাপের বিষয়।

নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়ে তিনি বলেন, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনী ইশতেহার দিবেন তাকে শুধু এটা বললে হবে না ওনারা কী চান। ওনারা কিভাবে এটা অর্জন করবেন, সে কথাটিও বলতে হবে। ওনারা অনেক গগনস্পর্শী আকাঙ্ক্ষা আমাদের সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু সেটাকে অর্জন করার পদ্ধতি, তার অর্থায়নের সুযোগ একই সঙ্গে তাদের বলতে হবে। সেই সঙ্গে এটা যে বাস্তবায়ন হবে তার নিশ্চয়তা দেয়ার জন্য কী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকবে।

দেবপ্রিয় বলেন, সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু বিভাজিতভাবে বৈষম্য বেড়েছে। এটা থেকে বের হতে আগামী দিনে আমরা চাই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখে বৈষম্য কমাতে হবে। এর জন্য আমাদের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থা এবং আয় বৃদ্ধি করতে হবে। এই তিনটি অর্জনের জন্য শ্রমঘন শিল্প লাগবে। সেই শ্রমঘন শিল্প শুধু রফতানিমুখি হলে চলবে না, এটি অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্ষেত্রেও আসতে হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশাপাশি শস্য খাতের উৎপাদনে প্রণোদনা দিতে হবে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য কমাতে হবে। একই সঙ্গে কি মূল্য ভোক্তারা গ্যাস বা বিদ্যুৎ বা এলএমজি পাবে তা এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের বিষয়ে তিনি বলেন, ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে এবং মূলধন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে কি ধরনের পদক্ষেপ থাকবে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। এবারের ইশতেহারে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের বিষয় আসতে হবে।

তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরে আমরা পরিমাণগত উন্নয়ন করেছি। এখন আমাদের গুণগত উন্নয়ন করতে হবে। বড় বড় প্রকল্পে অতি অর্থায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পগুলোকে পুনঃবিবেচনা করতে হবে। কিন্তু বাতিল করা যাবে না। পুনঃবিবেচনা করতে যাবে যাতে দক্ষতার সঙ্গে এর ব্যবহার হয় এবং গরিব মানুষগুলো উপকৃত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে কর-জিডিপির হার কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে কর-জিডিপির হার ছিল ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। এই কর-জিডিপির হার কমার অন্যতম কারণ করবহির্ভূত রাজস্ব কমে যাওয়া। ২০১৪ সালে কর বহির্ভূত রাজস্ব ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২০ শতাংশ।

এ সময় তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে রাজস্ব আয় বাড়ার লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ক্ষেত্রে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে তার সুনির্দিষ্ট ব্যক্তব্য দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজস্ব সংশ্লিষ্ট আইনগুলো অনেকদিন ধরে হয়ে আছে। কিন্তু এগুলো আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারছি না।

বাজেট বাস্তবায়নের হার নিয়েও কিছুটা সমালোচনা করেন সিপিপির এই ফেলো। তিনি বলেন, প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবায়নের হার কমছে। ২০১৪ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮১ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা কমে ২০১৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।

বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, এখন আমাদের যে বৈদেশি ঋণ আছে তা খুব বেশি না। তবে ভবিষ্যতে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যাতে ঋণ পরিশোধ করতে আবার ঋণ নিতে হবে এমন দুষ্ট চক্রে আমরা পড়ে না যাই।

তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালের পর ২০১৭-১৮ সালে আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক হয়ে গেছে। আমাদের ফিন্যন্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ৫ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত না থাকলে এটা আরও নীচের দিকে টানতো। এটা থেকে দুটি ম্যাসেজ যাচ্ছে। একটা হলো আমদানি বাড়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। অন্য বছরগুলোতে প্রবাসীদের আয় দিয়ে সেবা খাতের ঘাটতিটা সমন্বয় করা যেত। এখন ট্রেড অ্যাকাউন্টে ঘাটতি এতো বেশি তা প্রবাসী আয় দিয়ে ব্যালেন্স করা যাচ্ছে না। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে রফতানি ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এনে আয় বাড়াতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চলনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, রিসার্চ ফেলো তৌফিক ইসলাম খান প্রমুখ।

এমএএস/এসএইচএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :