হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০৯ পিএম, ২৫ এপ্রিল ২০২১ | আপডেট: ০২:০৫ এএম, ২৬ এপ্রিল ২০২১
ফাইল ছবি

নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে হেফাজতের ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন সংগঠনটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। রোববার (২৫ এপ্রিল) রাত ১১টায় এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ ঘোষণা দেন।

মাত্র ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন, ঈমানি-আকিদার সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো। হেফাজতে ইসলামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের পরামর্শক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

আগামীতে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে আবার হেফাজতের কার্যক্রম শুরু হবে বলেও ভিডিওবার্তায় জানান জুনায়েদ বাবুনগরী।

দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজত আলোচনায় আসে গত বছরের শেষ দিকে। তখন সংগঠনটির নেতারা ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতায় ব্যাপক ঝাঁঝালো বক্তব্য দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে গত ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনের বিরোধিতায় ফের সরব হন সংগঠনটির নেতারা। মোদির সফরের এক সপ্তাহ আগ থেকে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন তারা। করেন ছোটখাট বিক্ষোভও। কিন্তু তাদের ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায় নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসার পর। স্বাধীনতা দিবসে অর্থাৎ ২৬ মার্চ একেবারে প্রকাশ্যে বিক্ষোভের ডাক দেন তারা। এই বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ঢাকায় আহত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ঝরে চার প্রাণ।

এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস আন্দোলন হতে থাকে। একপর্যায়ে হেফাজত ২৮ মার্চ হরতাল ডাকে। আবার এই হরতাল ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা। দেশের সরকারি বিভিন্ন দফতর, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যালয় কিংবা নেতাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকর্মীর প্রাণহানিও হয়। এসব ঘটনায় বেশ কিছু নাশকতার মামলা হয়।

এর কয়েকদিন পর ঘটে হেফাজতের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড। ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীসহ অবরুদ্ধ হন মামুনুল। খানিকবাদে সেই রিসোর্টে হামলা-ভাঙচুর করে মামুনুলকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান হেফাজতের নেতাকর্মীরা। পরে সেই ঘটনায় একাধিক মামলা হয় হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সেই ঘটনাপ্রবাহ গড়ায় বহুদূর। দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম সংসারের ছেলে তার মায়ের বিয়ে বিচ্ছেদের পেছনে মামুনুল হককে অভিযুক্ত করেন। এরপর মামুনুলের তৃতীয় বিয়ের খবরও পাওয়া যায় মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা এক সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি)। এ নিয়ে ব্যাপক ইমেজ সংকটে পড়ে হেফাজত।

এর মধ্যে হেফাজতের বিষয়ে নড়েচড়ে বসে সরকার। ১ এপ্রিল হেফাজতের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলামসহ ৫৪ নেতা-কর্মীর ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সচল করা হয় ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৭-৮ বছর আগের পুরনো মামলা। এসব মামলায় প্রথমে কর্মীদের, পরে স্থানীয় থেকে মধ্যম সারির নেতাদের এবং এর পরে কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করতে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সর্বশেষ গত ১৮ এপ্রিল সংগঠনটির সবচেয়ে মাঠ গরম করা নেতা মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়। তিনি এখন রিমান্ডে রয়েছেন

মামলার আসামি হেফাজত নেতাদের একের পর এক ধরা হতে থাকলে গত সপ্তাহে সংগঠনটির মহাসচিব নূরুল ইসলাম জিহাদীসহ কয়েকজন নেতা রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় যান। সেখানে বৈঠক করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের আর গ্রেফতার না করার আর্জি জানান তারা।

কিন্তু সেই বৈঠকের পরও থামেনি গ্রেফতার অভিযান। এরই মধ্যে হেফাজতের নায়েবে আমির আহমদ আবদুল কাদেরসহ আরও কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অভিযানের চাপের মধ্যে বাবুনগরী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দিলেন।

পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, আন্দোলনের নামে সরকার উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন হেফাজত নেতারা। আর এসবের নেতৃত্বে ছিলেন মামুনুল হক, পৃষ্ঠপোষকতা এসেছে দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন অপশক্তি থেকে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে হেফাজতের যাত্রা শুরু। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার তৎকালীন মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই সংগঠনের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।

আহমদ শফীর মৃত্যুর পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির ও নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। পরের মাস ডিসেম্বরের ১৩ তারিখে নূর হোসাইন কাসেমী মারা গেলে নায়েবে আমির নূরুল ইসলাম জিহাদীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়।

মিজানুর রহমান/জেডএইচ/এইচএ/

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]