পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে চলছে ময়লার গাড়ি, দীর্ঘ হচ্ছে শোকের মিছিল

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৯:৫৫ পিএম, ২৫ নভেম্বর ২০২১

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ময়লাবাহী গাড়ির চাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের (১৮) মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বৃহস্পতিবার (২৫ নভেম্বর) দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। যে গাড়িটি নাঈমকে চাপা দিয়েছিল, সেটির চালক ডিএসসিসির নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন না। তিনি মূলত সংস্থাটির একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। রাস্তাঘাট ঝাড়ু দেওয়া এবং ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারই ছিল তার কাজ। কিন্তু এমন একজন কীভাবে, কোন যোগ্যতায়, কার অনুগ্রহে ময়লাবাহী গাড়ির চালক হলেন, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সবাই। যদিও এ বিষয়ে সদুত্তর মেলেনি ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী থেকে গাড়িচালক বনে যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. হারুন মিয়া। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এ ঘটনায় চালকের সহকারী মো. আব্দুর রাজ্জাক ওরফে রাসেল গ্রেফতার হয়েছেন। তিনিও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে ডিএসসিসিতে কর্মরত। তাকে তিনদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত

অন্যদিকে হারুন ও আব্দুর রাজ্জাককে কর্মচ্যুত করেছে ডিএসসিসি। পাশাপাশি বরাদ্দকৃত গাড়ি নিজে না চালিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্যকে চালাতে দেওয়ায় করপোরেশনের গাড়িচালক (ভারী) মো. ইরান মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে, একই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

এদিকে শিক্ষার্থী নাঈমের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ময়লার গাড়ির চাপায় আহসান কবীর খান (৪৫) নামের আরও এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। 

ডিএনসিসির একাধিক সূত্র জাগো নিউজকে জানায়, পান্থপথে প্রথম আলোর সাবেক কর্মী আহসান কবীর খানকে চাপা দেওয়া ডিএনসিসির ময়লার গাড়িও চালাচ্ছিলেন ফটিক নামে পরিচিত এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তিনি ডিএনসিসির বৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীও নন। ওই গাড়ির মূল চালক মো. হানিফ।

দুই সিটি করপোরেশনের একাধিক সূত্র জানায়, হারুন-ফটিকের মতো এমন আরও বহু গাড়িচালক রয়েছেন, যারা পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পিয়ন হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত (মাস্টাররোল), অথবা বৈধ নিয়োগপ্রাপ্তও নন। কিন্তু পরিবহন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এবং অর্থের বিনিময়ে তারা পেয়েছেন গাড়িচালকের দায়িত্ব।

গতকাল বুধবার (২৪ নভেম্বর) দুপুরে গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান মারা যান। তিনি উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগ সূত্র জানায়, যে ময়লার গাড়ির চাপায় নাঈম হাসান নিহত হয়েছেন, সেটি ভারী যান। সংস্থাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহারের জন্য এমন ৩১৭টি ভারী যান আছে। কিন্তু চালক আছেন মাত্র ৮৬ জন। বাকি গাড়িগুলো পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই চালান। যাদের অধিকাংশেরই লাইসেন্স নেই। ফলে সংস্থার গাড়িগুলো মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ঘটনাটির জন্য আমরা খুবই মর্মাহত। তিন বছর ধরে সে (হারুন) ওই গাড়িটি চালায়। এখন বিষয়টি তদন্ত করে বিস্তারিত বলতে পারবো।

তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে ময়লাবাহী গাড়ি চালানোর বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর আগেও ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চাপায় একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন পথচারী। এ বছরের মার্চে ডিএসসিসির একই ধরনের গাড়িচাপায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) টেলিফোন অপারেটর মোহাম্মদ খালিদ প্রাণ হারান। পরের মাসে যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচা এলাকায় মো. মোস্তফা (৪০) নামে একজন রিকশাচালক নিহত হন। আহত হন ওই রিকশার যাত্রী। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা ময়লার গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়া ২০১৮ সালে জুরাইনে আরেক পথচারী নিহত হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির নিয়োগপ্রাপ্ত দুজন চালক জাগো নিউজকে বলেন, আগের তিনটি দুর্ঘটনায় জড়িত চালকেরাও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতেন। বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। কারও বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়নি। বরং এ অদক্ষ চালকদের অর্থের বিনিময়ে কোটি টাকা দামের গাড়িচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, চালক সংকটের কারণেই অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ করা কর্মীদের দিয়ে সরকারি গাড়ি চালানো হচ্ছে।

নাঈমের মৃত্যু: তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি

নাঈম হাসানের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রধান করা হয়েছে সংস্থাটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সিতওয়াত নাঈমকে। অপর দুই সদস্য হলেন- পরিবহন শাখার মহাব্যবস্থাপক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস ও যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান। গতকাল বুধবার রাতে দক্ষিণ সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, এ কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, গতকাল বুধবার রাতে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি জেনেছি। এখন আমরা ঘটনার তদন্ত শুরু করছি।

বুধবার রাতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের জাওলাহাটিতে নাঈম হাসানের জানাজায় অংশ নেন ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য কামরুল ইসলাম। এসময় তারা নাঈম হাসানের বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেন।

পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ঘাতক চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে মেয়র তাপস বলেন, এ রকম গাফিলতি ও কোনো অন্যায় বরদাশত করা হবে না। আমরা এরই মধ্যে করপোরেশন থেকে ব্যবস্থা নেওয়া আরম্ভ করেছি। আমরা তদন্ত কমিটি করেছি এবং এরই মধ্যে তাদের চিহ্নিত করেছি। দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক যে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা–ও নেওয়া হবে।

এদিকে সহপাঠীর মৃত্যুর ঘটনার বিচার দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে অবরোধ তুলে নিয়েছেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার বিচার না হলে আগামী রোববার থেকে আবারও রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

পান্থপথের ঘটনা তদন্তেও কমিটি

পান্থপথে আহসান কবির খানকে চাপা দেওয়া গাড়ির চালকের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ সিটির মতো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও চালকের সংকট রয়েছে। ক্লিনার-পিয়নদের দিয়ে গাড়ি চালানো হয়। রয়েছে বহিরাগত চালকও। বৈধ চালকরা তাদের গাড়ির চাবি অন্যদের দিয়ে দেন। তারা তেল চুরি করে নিজের পরিবার চালান। এর সঙ্গে করপোরেশনের পরিবহন বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাও জড়িত রয়েছেন। বৈধ চালক নিয়োগেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে কোনো তদারকিও নেই।

এ বিষয়ে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর এসএম শরিফ-উল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া নিহতের পরিবারের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা করা হবে।’

যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেখানে এসএম শরিফ-উল ইসলাম ছাড়া আছেন মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) মো. মিজানুর রহমান ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আবুল হাসনাত মো. আশরাফুল আলম। এ ঘটনার সরেজমিনে তদন্ত করে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিল করবে কমিটি।

এমএমএ/এমকেআর/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]