ক্ষতিপূরণে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চায় উন্নয়নশীল দেশ, সুখবর অনিশ্চিত

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মিশর, শার্ম আল শেখ থেকে
প্রকাশিত: ০৯:৫২ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০২২
মিশরে চলছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন

মিশরে চলছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৭)। এই সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশের জন্য এখনো কোনো সুখবর নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাস ও বিবেচনার বুলিই এসেছে। এতে সন্তুষ্ট নয় উন্নয়নশীল দেশগুলো।

সম্মেলনে কোনো সুখবর না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রিডে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া মিথেন গ্যাস কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগেও শামিল হয়েছে ঢাকা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের প্যাভিলিয়নে দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরির সঙ্গে বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আমাদের লস অ্যান্ড ডেমেজ এজেন্ডায় তোলায় আমি তাকে (জন কেরি) ধন্যবাদ দিয়েছি। তিনি চেয়েছিলেন, আমরা যেন বৈশ্বিক মিথেন অঙ্গীকারে যুক্ত হই।আমরা রাজি হয়েছি, মিথেনের পরিমাণ কমাতে হবে। কিন্তু এর কারণে ক্ষতি হবে আমাদের কৃষি ও প্রাণিসম্পদের। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সাহায্য দরকার। এ ক্ষেতে বাংলাদেশের কী ধরনের সহায়তা দরকার তা জানতে চেয়েছেন জন কেরি।

মিথেন অঙ্গীকারের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৪৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মোমেন বলেন, এ ক্ষেত্রে আমি সমাধান পেয়েছি। তিনি আমাদের কৃষি জোটে যুক্ত হওয়ার জন্য বলেছেন। আমরা যুক্ত হয়েছি। তারা আমাদের দেশে পাওয়ার গ্রিডে সহযোগিতা করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি প্রকল্পের কথা জানান। সেটা হলো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় উঁচু বাধ করা। তিনি বলেন, এর আগে জন কেরিকে একটা প্রকল্পের কথা বলেছিলাম, দুর্যোগপ্রবণ ৪৩২ কিলোমিটার এলাকায় বাধ উঁচু ও চওড়া করা। যুক্তরাষ্ট্র একটি কারিগরি দল পাঠিয়েছিল। তারা এখন এটা যাচাই করছে।

বিশ্বের ৮০ শতাংশ কার্বন উন্নত ২০টি দেশ নিঃসরণ করছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বে যত কার্বন নির্গমন হয়, তার মধ্যে ৩৫ শতাংশ করে কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া অন্যতম।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে রাখতে প্রকল্প নিয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশও যুক্ত হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

jagonews24

বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বুধবার জাগো নিউজকে বলেন, ক্লাইমেট ফাইন্যান্স (জলবায়ু অর্থায়ন), মেটিগেশন (নিরসন), কাভার ডিসিশন (নিয়ন্ত্রণকরণ সিদ্ধান্ত) ও লস অ্যান্ড ডেমেজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই চারটির জন্য সমন্বয়কারী হিসেবে যারা দায়িত্বে রয়েছেন আমরা তাদের প্রধানদের সঙ্গে সমঝোতা করবো। লস অ্যান্ড ডেজেমের বিষয়টি এজেন্ডায় উঠলেও এখন পর্যন্ত এটির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নীতিগতভাবেও তারা নেয়নি মেনে। তারা শুধু বলছে আমরা দেখবো।

তবে এলডিসির পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের একটি ঘোষণা চাওয়া হয়েছে বলে জানান সাবের হোসেন। তিনি বলেন, এই কপে একটি স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট তহবিল গঠন করার ঘোষণা দিতে হবে। আগামী বছর এর রূপরেখা, গঠন, অর্থায়ন ও পরিচালনা নির্ধারণের সময় নিতে পারি। বুধবার আমরা দুজন প্রেসিডেন্সির সঙ্গে বৈঠক করে সেটি জানিয়ে দিয়েছি। এ বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশ ও জি সেভেনের (জাপানসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাত দেশের সংঘ) অবস্থান অভিন্ন। আমরা দুটি সংঘ একই দাবিতে অটল।

এবার কোন কোন বিষয়ে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের সমঝোতা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। তহবিলের ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। আমরা অনেক বুলেট পয়েন্ট পেয়েছি। সেটি দিয়ে চূড়ান্ত কিছু বোঝায় না। এলডিসি গ্রুপের মাধ্যমে আমরা আমাদের কথাগুলো বলছি। গ্লাসগোর অর্জন ১ দশমিক ৫ শতাংশ তাপমাত্রা চূড়ান্ত করতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

আগামী ১৮ অক্টোবর কপ আসর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সম্মেলন টেনে এক বা দুদিন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয় বলে জানান সাবের হোসেন চৌধুরী।

এটি সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কৌশল হিসেবে চেষ্টা করা হয়ে থাকে বলে মনে করেন বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এই সভাপতি।

তিনি বলেন, এ সময়ের মধ্যে অনেকে চলে যায়। সবার উপস্থিতি না থাকায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। এবার এটি যেন না হয় সেই চেষ্টা থাকবে আমাদের।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, মেয়রদের সংগঠন (সি-৪০) সভায় জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু ইনস্যুরেন্স গঠনের দাবি তোলা হয়েছে। সেখানে আমি শস্যবিমা করার দাবি তুলেছি। আমার সঙ্গে অনেকে একমত হয়েছেন।

সম্মেলনে যুক্ত হওয়া পরিবেশবিদ ফারান কবির জাগো নিউজকে বলেন, লস অ্যান্ড ডেমেজের বিষয়টি একমত হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলো এ নিয়ে কোনো ঘোষণা দিচ্ছে না। কৌশল হিসেবে তারা এটি পিছিয়ে নিতে চায়। এটি পিছিয়ে গেলে তা অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে এই কপে একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আদায় করে নিতে হবে।

তিনি বলেন, গ্লাসগো চুক্তি অনুযায়ী ১ দশমিক ৫ তাপমাত্রা আনতে হলে ধনী দেশগুলোকে কয়লা, ডিজেল ও পেট্রোল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সেটির বিষয়ে তাদের কাছে পরিষ্কার ঘোষণা আদায় করতে হবে। এসব ন্যায্য দাবি আদায়ে এলডিসির সদস্য মিলে চাপ দিলে কিছু একটা অর্জন হবে। নতুবা আগের মতো এবার প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছু মিলবে না।

এমএইচএম/জেডএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।