চোরাচালান বন্ধে কঠোর আইন চায় বিজিবি
বীরত্ব ও ঐতিহ্যের গৌরবমণ্ডিত এক সুশৃঙ্খল আধা-সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, নারী ও শিশু এবং মাদক পাচার প্রতিরোধসহ অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে এই বাহিনী।
সম্প্রতি জাগো নিউজের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত চোরাচালানীদের ধরতে পারে বিজিবি। এর বাইরে অভিযান চালানোর এখতিয়ার তাদের নাই।’
বিজিবি মহাপরিচালকের মতে, চোরাচালান বন্ধে দরকার ফাঁসির মতো কঠোর আইন। তাহলে চোরাচালানীদের তৎপরতা অনেকটাই কমে যেতো। সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে ২য় পর্ব।
জাগো নিউজ : চোরাকারবারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাবশালীদের যোগসাজশ রয়েছে। এটা কিভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব?
আজিজ আহমেদ : সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত যদি চোরাকারবারী থাকে বিজিবি তাদের ধরতে পারে। এর বাইরে এখতিয়ার নাই। তাদের ধরতে বিজিবি অন্য বাহিনীকে জানায়, তথ্য দেয়। আমরা প্রচুর চোরাকারবারী ধরি। জেলে পাঠাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য জামিনে তারা বেড়িয়ে যায়। আমরা আবারো ধরি, তারা ফের ছাড়া পায়। এভাবেই চলছে।
এসব বন্ধে কঠিন আইন দরকার। মাদক নিয়ে ধরা পড়লে মৃত্যুদণ্ড দেয়া দরকার। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকংয়ে মাদক নিয়ে ধরা পড়লে ফাঁসি দিয়ে দেয়। এর জন্য কঠিন আইন ও এর সঠিক প্রয়োগও থাকতে হবে।
আমার মনে হয় মাদকের মামলা দেখার জন্য স্পেশাল কোর্টও থাকা উচিত। দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি ঘটবে। তাহলে দেখবেন অনেকটাই এই অপকর্ম কমে যাবে।
জাগো নিউজ : চোরাচালান বন্ধে কি ধরণের পদক্ষেপ দরকার? জনবল, ইক্যুইমেন্ট, কাঁটাতার… ?
আজিজ আহমেদ : জনবল যে অনেক কম তা না। আমাদের যেমন কাঁটাতারের বেড়া নাই। পৃথিবীর অনেক দেশেই রাস্তা রয়েছে টহল দেয়ার জন্য, আমাদের তা নেই। মিয়ানমার তাদের সীমান্তের ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশে রাস্তা ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। ভারতের কাঁটাতারের বেড়া ৮০ শতাংশ, রাস্তা রয়েছে পুরো সীমান্তে। কিন্তু আমাদের ১ শতাংশও কাঁটাতারের বেড়া ও রাস্তা নাই। আমাদের কিছুই নাই।
তবে বর্তমান সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একনেকে পাশও হয়েছে। টেকনাফ থেকে ২০০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রজেক্ট পাশ হলে আশা করছি খুব দ্রুত বাজেটও পেয়ে যাবো। আমরা অন্যান্য ফরমালিটিজের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। ব্যয়বহুল হওয়ায় পর্যায়ক্রমে সব হবে। সরকার আন্তরিক।
জাগো নিউজ : বিওপি, রাস্তা এবং কাঁটাতারের বেড়া দিলেন, কিন্তু জনবল পর্যাপ্ত না থাকলে নজরদারি তো সম্ভব হবে না।
আজিজ আহমেদ : আমাদের জনবল আছে ৫২ হাজারের উপরে। একই মাপের সীমানার নজরদারির জন্য আমাদের যেখানে একটি ব্যাটালিয়ন সেখানে বিএসএফ এর ৩টি ব্যাটালিয়ন। আমাদের তিনগুণ। আমাদের তো অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে হয়। আমি তো তিনগুণ চাইতে পারি না। আমরা আরও ৬টি ব্যাটালিয়ন চেয়ে প্রপোজাল পাঠিয়েছি। হয়ে গেলে আমাদের অনেক সুবিধা হবে। পেট্রলিং বাড়বে। বিওপির মাঝখানের ব্যবধান কমবে। ফ্রিকোয়েন্সি বাড়বে।
জাগো নিউজ : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিভিন্ন সময় নির্বাচন, হরতাল কিংবা নিরাপত্তার ইস্যুতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এতে করে সীমান্তে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় কিনা?
আজিজ আহমেদ : আমার যা লোকবল আছে তার ৭০/৭৫ শতাংশ হলেই সীমান্ত পাহারা হয়ে যায়। আর ২০/২৫ শতাংশ ছুটি, ট্রেনিং, অ্যাডমিন জব এসব। ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার লোক তো সব সময় ছুটিতেই থাকেন। সব মিলিয়ে কোনো সময় ৪/৫ হাজারের বেশি বিজিবি মোতায়েন করতে হয়। সর্বোচ্চ হয়েছে ৭ হাজার। ৩ থেকে ৫ হাজার লোকের জন্য সীমান্তে হাত দিতে হয় না। রিজার্ভেই থাকে আড়াই থেকে ৩ হাজার। অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে যারা আছেন তারা হলেই হয়ে যায়। খুব বেশি সমস্যা হলে ৩/৪ দিন ছুটি বন্ধ করে দিলেই হয়ে যাচ্ছে। শুধু মাত্র যেখানে বিজিবি ছাড়া হবে না বলে অথরিটি মনে করেন, আমরা সেখানে মোতায়েন করি।
জাগো নিউজ : প্রযুক্তিগত দক্ষতায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর তুলনায় বিজিবি পিছিয়ে রয়েছে কিনা?
আজিজ আহমেদ : আমার মনে হয় না পিছিয়ে আছি। মিয়ানমারের তুলনায় আমরা অনেক এগিয়ে রয়েছি। ভারতের তুলনায়ও অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিতে আমরা পিছিয়ে নেই। তবে সুযোগ সুবিধায় ভারতের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছি। সুযোগ-সুবিধা বলতে কাঁটাতারের বেড়া, রাস্তা, যোগাযোগ সবই উন্নত ওদের। এটাও আমাদের রিকভারের চেষ্টা চলছে।
জাগো নিউজ : বিজিবি’র ডিজি হিসেবে নিজেকে সফল মনে করেন কিনা?
আজিজ আহমেদ : সফলতা-ব্যর্থতা আপেক্ষিক বিষয়। আমি তিন বছরের অধিককাল ধরে দায়িত্বে। নিজের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। মেন্টালি সেটিসফাইড (মানসিকভাবে সন্তুষ্ট)। কে, কিভাবে আমাকে মূল্যায়ন করলো তা তাদের বিষয়। আমি আমার কাজে সন্তুষ্ট। আমি মহান আল্লাহ ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।
জাগো নিউজ : ভবিষ্যতে বিজিবিকে বাহিনী হিসেবে কোন জায়গায় দেখতে চান?
আজিজ আহমেদ : আমি সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। সারা জীবন সেনাবাহিনীতে কাজ করেছি। ডিজি হিসেবে দায়িত্বে আসার আগে মাত্র দেড় বছর আমি বিজিবিতে দায়িত্ব পালন করেছি।
সেনাবাহিনী একটি কমপ্লিট ডিসিপ্লিন সামরিক বাহিনী। যুদ্ধ রণকৌশলে সেনাবাহিনী দক্ষ। বিজিবিও ডিসিপ্লিন সীমান্ত রক্ষা বাহিনী। আমি দেখেছি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিজিবি যথেষ্ট দক্ষ। বিজিবিকে দায়িত্ব দিয়ে আপনি যেকোনো কাজ করতে পারেন। প্রত্যেকটা সদস্য দক্ষ। ভেরি ক্যাপাবল। আশা করছি বিজিবি আরও ভাল অবস্থানে যাবে। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে জনগণের কাছে আস্থার প্রতীক হবে।
জাগো নিউজ : জাগো নিউজকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
আজিজ আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ। জাগো নিউজের উত্তোরত্তর সফলতা কামনা করছি।
উল্লেখ্য, মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ ৮ম বিএমএ দীর্ঘ মেয়াদী কোর্সের অধীনে ১৯৮৩ সালের ১০ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশনপ্রাপ্ত হন।
চাকরি জীবনে তিনি পাবর্ত্য চট্টগ্রামে জিএসও-৩ (অপারেশন), পদাতিক ব্রিগেডের মেজর, সেনাসদর প্রশিক্ষণ পরিদফতরের গ্রেড-২ এবং সেনাসদর, বেতন ও ভাতা পরিদফতরের গ্রেড-১ স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া তিনি একটি আর্টিলারি ইউনিট, একটি বিজিবি ব্যাটালিয়ন, বিজিবির একটি সেক্টর, স্বতন্ত্র এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেডসহ মোট দুইটি আর্টিলারি ব্রিগেড এবং একটি পদাতিক ডিভিশন দক্ষতার সঙ্গে কমান্ড করেন।
পাশাপাশি দীর্ঘদিন স্কুল অব আর্টিলারি এবং স্কুল অব মিলিটারি ইনেটলিজেন্স এর প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আজিজ আহমেদ রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৭৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৮০ সালে রাজধানীর কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজি হতে টেক্সটাইল টেকনোলজি সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএ (পাস), ১৯৯৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার অব ডিফেন্স স্টাডিজ ও ২০০৮ সালে এমএসসি (টেকনিক্যাল) এবং ২০০৮ সালে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন বাংলাদেশ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীনে ১৯৯৫-৯৬ সালে ইরাক ও কুয়েতে পর্যবেক্ষক এবং ২০০৫-০৬ সালে সুদানে জাতিসংঘ মিশনে ফোর্স কমান্ডারের সামরিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
তার স্ত্রী বেগম দিলশাদ নাহার আজিজ একজন গৃহিণী। তিন পুত্র সন্তানের জনক জেনারেল আজিজের প্রিয় খেলা গল্ফ। অবসরে তিনি বই পড়েন।
জেইউ/এমএমজেড/একে/পিআর