ভোট আল্লাহপাকের আমানত

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৪৪ এএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভোট দেশের প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর এই ভোট বিশেষ এক আমানত স্বরূপ। তাই এ পবিত্র আমানতের হেফাজত করা প্রত্যেকের জন্য আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে আবশ্যকীয় দায়িত্ব।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আমানতসমূহ এর যোগ্য ব্যক্তিদের ওপর ন্যস্ত করার আদেশ দিচ্ছেন। আর তোমরা যখন শাসন কাজ পরিচালনা কর, তোমরা মানুষের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে শাসন করবে। নিশ্চয় আল্লাহর উপদেশ কতই চমৎকার’ (সুরা আন নেসা, আয়াত: ৫৮)।

শাসন ক্ষমতা বা কর্তৃত্বকে এই আয়াতে জনগণের আমানত বলা হয়েছে। আর এই আমানতের অধিকর্তা হলো জনগণ, কোনো ব্যক্তি, বাদশা বা বংশ বিশেষ নয়।

পবিত্র কুরআন কোনো নির্দিষ্ট বংশের মাধ্যমে দেশ শাসন বা বংশানুক্রমিক শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ সমর্থন করে না বরং এর বিপরীত জনগণের প্রতিনিধি দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকেই অনুমোদন করে।

রাষ্ট্রের প্রধান হবেন নির্বাচিত ব্যক্তি আর সেই পদে নির্বাচনের জন্য সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তিকে ভোট দানের নির্দেশ ইসলামে দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলাম পদের আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করেছে।

যেভাবে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আবু সাঈদ আবদুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘হে আবদুর রহমান ইবনে সামুরা! নেতৃত্ব প্রার্থী হয়ো না। কারণ প্রার্থী না হয়ে নেতৃত্ব প্রাপ্ত হলে তুমি এ ব্যাপারে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। পক্ষান্তরে প্রার্থী হয়ে নেতৃত্ব লাভ করলে তোমার ওপরই যাবতীয় দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে। তুমি কোনো বিষয় শপথ করার পর তার বিপরীতে কল্যাণ লক্ষ্য করলে তখন যেটা ভালো সেটাই করবে এবং শপথের কাফফারা আদায় করবে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

ওপরে বর্ণিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধানগণকে এবং শাসন কার্যে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছে, তারা যেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সাথে নিজেদের কর্তৃত্বের সদ্‌ব্যবহার করেন।

দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা খুব প্রয়োজন।

ভোট যেহেতু আমানত এর জন্য ভোটারদের দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি সর্বোত্তম তার পক্ষে ভোট দেওয়ার শিক্ষাই ইসলাম প্রদান করে। সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া যেমন, অধিক পুণ্যের কাজ, তেমনি অসৎ, অনুপযুক্ত, দুষ্কৃতকারী কোনো ব্যক্তিকে ভোট দেওয়াও শক্ত গুনাহের কাজ।

পবিত্র কুরআনে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াকে যেমন হারাম জ্ঞান করা হয়েছে, তেমনি সত্য সাক্ষ্য দেওয়াকে ওয়াজিব করেছে। ভোট একটা সত্য সাক্ষ্য। আর এ সত্য সাক্ষ্যকে গোপন করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

যারা রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় নেতৃত্বের আমানতের বোঝা বহন করার অধিকতর যোগ্য, তাদের হাতেই এ আমানত অর্পণ করার শিক্ষা ইসলাম আমাদেরকে দেয়।

আমাদেরকে দেখতে হবে যাকে আমরা ভোট দিতে যাচ্ছি তিনি এর যোগ্য কি না বা এই আমানতের ভার বহন করার মত শক্তি তার মাঝে আছে কি না।

এমন যেন না হয়, এ ব্যক্তিকে আমি পছন্দ করি বা অমুক আমার প্রিয়জন তাই তাকে ভোট দিচ্ছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ, ধর্মভীরু ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট প্রদান করা যেমন সওয়াবের কাজ এবং এর সুফল ভোটদাতাও প্রাপ্ত হয়।

আল্লাহতায়ালা শুধু শাসকদেরকেই জবাবদিহি করবেন না যে, তুমি সঠিক কাজ কর নি কেন? বরং ভোটারদেরকেও এই বলে জিজ্ঞেস করা হবে যে, তোমাকে যে ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছিল তুমি তার সঠিক প্রয়োগ কেন কর নি?

যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন হোন তাদের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। তারা জনগণের সাথে শাসক কাজকর্মে নম্রতা অবলম্বন করবে, তাদেরকে ভালোবাসবে, তাদেরকে সদুপদেশ দিবে এবং তাদেরকে প্রতারিত করবে না, কঠোরতা করবে না, তাদের কল্যাণ সাধনে ও প্রয়োজন পূরণে অমনোযোগী হবে না।

তারা যদি জনগণের সুখে দুঃখে, বিপদে-আপদে পাশে এসে দাঁড়ায়, তাহলে তারা যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে, তেমনি প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা হবে সফল।

এ বিষয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘বস্তুত আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দিচ্ছেন। আর তিনি নিষেধ করছেন অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ ও সীমা লঙ্ঘন। আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯০)।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব সম্পর্কে হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে। যেমন হজরত আবু ইয়ালা মাকিল ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত।

তিনি বলেন, আমি মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তার কোনো বান্দাকে প্রজাসাধারণের তত্ত্বাবধায়ক বানাবার পর সে যদি তাদের সাথে প্রতারণা করে থাকে, তবে সে যেদিনই মরুক, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন (বুখারি ও মুসলিম)।

হজরত রাসুলপাক (সা.) জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক করে আরো বলেছেন, ‘তোমরা সাবধান হও! তোমরা প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’ (বুখারি)।

আবার যারা ন্যায়ের সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তাদের জন্য শুভ সংবাদও রয়েছে। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় ন্যায়বিচারকগণ আল্লাহর নিকট নূরের মিম্বরে আসন গ্রহণ করবে, যারা তাদের বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে এবং যে-সব দায়দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত করা হয় সে সব বিষয়ে সুবিচার করে’ (মুসলিম)।

এছাড়া শাসকের আনুগত্যের বিষয়েও ইসলামে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। শাসকের পাপমুক্ত সকল নির্দেশের আনুগত্য করার শিক্ষা আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে দান করেছেন।

আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, আনুগত্য কর রসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদের’ (সুরা আন নেসা, আয়াত: ৫৯)।

হজরত নবি করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের ওপর শাসকের নির্দেশ শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য, চাই তা তার পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাপাচারের আদেশ দেওয়া হয়। পাপাচারের আদেশ দেওয়া হলে তা শ্রবণ করা ও তার আনুগত্য করার কোনো অবকাশ নেই’ (বুখারি ও মুসলিম)।

তাই আমাদেরকে ইমানের সাথে যোগ্য ব্যক্তির কাছে এই আমানতকে হস্তান্তর করতে হবে, যাতে করে আমরা তার আনুগত্য করতে পারি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে তার আমানতকে যথাযথ স্থানে প্রয়োগ করার তাওফিক দান করুন, আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।