সুযোগ না সতর্কতা: এই সময়ে টাকা কোথায় রাখা লাভজনক?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে অনেক বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং চাকরিজীবীর মনে এখন একটি বড় প্রশ্ন— এই সময়ে কি বিনিয়োগ করা উচিত, নাকি ক্যাশ ধরে রাখা ভালো? এই প্রশ্নের সরল কোনো একক উত্তর নেই। কারণ অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ বা বাজারের অস্থিরতার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির আর্থিক অবস্থা, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, বিনিয়োগের সময়সীমা এবং লক্ষ্য—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবুও ইতিহাস, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধরনের সময়ে সাধারণত একটি Balanced Strategy সবচেয়ে কার্যকর হয়—অর্থাৎ পুরোপুরি ক্যাশে থাকা নয়, আবার অন্ধভাবে সব টাকা বিনিয়োগ করাও নয়।
প্রথমে বুঝতে হবে কেন এই ধরনের সময়ে ক্যাশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের সময় সাধারণত বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়, ব্যবসা ও বিনিয়োগে ধীরগতি দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ সম্পদ বা নগদ অর্থের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর মূল কারণ হলো ক্যাশ বা নগদ অর্থ সবচেয়ে বেশি লিকুইড বা তরল সম্পদ—যা প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করা যায়। যদি হঠাৎ করে ব্যবসায় ক্ষতি হয়, চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয় বা জরুরি কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন ক্যাশই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে।
ব্যক্তিগত অর্থনীতিতে একটি প্রচলিত নিয়ম হলো—কমপক্ষে ৩ থেকে ৬ মাসের জীবনযাত্রার খরচের সমপরিমাণ জরুরি তহবিল ক্যাশ হিসেবে রাখা উচিত। অনেক আর্থিক পরিকল্পনাকারী আবার অনিশ্চিত সময় বা অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে এই পরিমাণ আরও বাড়িয়ে ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত রাখার পরামর্শ দেন। কারণ এই সময়গুলোতে আয় কমে যেতে পারে, ব্যবসার নগদ প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং হঠাৎ ব্যয় বাড়তে পারে। তাই সম্পূর্ণ বিনিয়োগে চলে গেলে অনেক সময় সংকটের সময় সেই বিনিয়োগ বিক্রি করতে হয় ক্ষতির মধ্যে।
কারও যদি স্থিতিশীল আয় থাকে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের লক্ষ্য থাকে এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। আবার কারও যদি আয় অনিশ্চিত হয় বা নিকট ভবিষ্যতে বড় ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে বেশি ক্যাশ রাখা নিরাপদ হতে পারে। তাই এক কথায় বলা যায়—এই সময়ে সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো ক্যাশ এবং বিনিয়োগের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
তবে এর মানে এই নয় যে পুরো টাকা ক্যাশে রেখে দেওয়া উচিত। কারণ ক্যাশেরও একটি বড় সমস্যা আছে—মুদ্রাস্ফীতি। যদি মূল্যস্ফীতি বেশি হয়, তাহলে নগদ অর্থের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনো দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ হয়, তাহলে এক বছরের মধ্যে আপনার হাতে থাকা টাকার প্রকৃত মূল্য প্রায় ৮ শতাংশ কমে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থ ক্যাশে রেখে দিলে প্রকৃত সম্পদ বৃদ্ধি না হয়ে বরং কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই কারণেই অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, “Cash is safety in the short term, but investment is growth in the long term.”
ইতিহাসও একই ধরনের শিক্ষা দেয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় প্রথম দিকে বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেলেও কয়েক বছরের মধ্যে অনেক বিনিয়োগ বাজার আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজার সূচক S&P 500-কে ধরা যায়। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে ২০২০ সালের মার্চ মাসে সূচকটি প্রায় ৩০ শতাংশ পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে তা আবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। এই উদাহরণটি দেখায় যে যারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন, তারা অনেক সময় সংকটের মধ্যেও ভালো রিটার্ন পেতে পারেন।
এই কারণে অনেক বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলের কথা বলেন—যাকে বলা হয় Diversification বা বিনিয়োগ বৈচিত্র্য। অর্থাৎ পুরো টাকা একটি জায়গায় না রেখে বিভিন্ন ধরনের সম্পদে ভাগ করে রাখা। উদাহরণ হিসেবে কেউ তার মোট সঞ্চয়ের একটি অংশ ক্যাশ বা স্বল্পমেয়াদি সঞ্চয়ে রাখতে পারেন, একটি অংশ নিরাপদ সম্পদ যেমন স্বর্ণ বা সরকারি বন্ডে রাখতে পারেন, এবং বাকি অংশ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ যেমন শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন। এতে বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা হলেও পুরো পোর্টফোলিও একসাথে ঝুঁকির মুখে পড়ে না।
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে একটি বিষয় প্রায় সব সময় দেখা যায়—সংকটের সময় কিছু সম্পদের মূল্য বাড়ে। বিশেষ করে স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে “Safe Haven Asset” হিসেবে ধরা হয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট বা মুদ্রার অস্থিরতার সময় অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে অনেক সময় এই ধরনের সময় স্বর্ণের দাম বাড়তে দেখা যায়। একইভাবে কিছু শক্তিশালী মুদ্রা বা সরকারি বন্ডও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এগুলোও ঝুঁকিমুক্ত নয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সব সময় বেশি লাভ দেয় না।
অন্যদিকে শেয়ারবাজার বা ব্যবসায় বিনিয়োগ সাধারণত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বেশি রিটার্ন দিতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ বা বড় ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বেড়ে যায়। তাই এই সময়ে নতুন বিনিয়োগ করলে অনেক সময় বাজার আরও নিচে নামার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য অনেক বিশেষজ্ঞ “Lump Sum” বিনিয়োগের বদলে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ (Dollar Cost Averaging) করার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ পুরো টাকা একবারে বিনিয়োগ না করে নিয়মিত সময় ধরে ছোট ছোট অংশে বিনিয়োগ করা। এতে বাজারের ওঠানামার প্রভাব কিছুটা কমে যায়।
ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিন্তা প্রযোজ্য। যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের সময় ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ক্যাশ ফ্লো সংকট। বিক্রি কমে যেতে পারে, সরবরাহ ব্যয় বাড়তে পারে, অথবা বাজারে চাহিদা কমে যেতে পারে। তাই এই সময়ে অনেক ব্যবসায়ী বড় বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন এবং নগদ প্রবাহ শক্ত রাখার চেষ্টা করেন। তবে একই সঙ্গে নতুন সুযোগও খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে দেখা গেছে, সংকটের সময়ই অনেক নতুন ব্যবসা বা উদ্ভাবন তৈরি হয়েছে।
চাকরিজীবীদের জন্যও একই ধরনের বাস্তবতা রয়েছে। যদি চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে বড় বিনিয়োগের আগে জরুরি তহবিল তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবার যদি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের লক্ষ্য থাকে—যেমন অবসর পরিকল্পনা—তাহলে বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও নিয়মিত বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া অনেক সময় ভালো ফল দেয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ওঠানামা অনেকটাই সামঞ্জস্য হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অনিশ্চিত সময়ের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হলো Balance বা ভারসাম্য। সম্পূর্ণ ক্যাশে থাকা দীর্ঘমেয়াদে ভালো নয়, আবার সব টাকা বিনিয়োগ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেন—“Keep enough cash for safety, but keep investing for the future.” অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ক্যাশ রাখুন, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগও চালিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কারও যদি স্থিতিশীল আয় থাকে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের লক্ষ্য থাকে এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। আবার কারও যদি আয় অনিশ্চিত হয় বা নিকট ভবিষ্যতে বড় ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে বেশি ক্যাশ রাখা নিরাপদ হতে পারে। তাই এক কথায় বলা যায়—এই সময়ে সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো ক্যাশ এবং বিনিয়োগের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
লেখক: দ্য আর্ট অফ পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অফ কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য সাকসেস ব্লু প্রিন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাব না ইত্যাদি বইয়ের লেখক, ফাইন্যান্স এন্ড বিজনেস মেন্টর।
এইচআর/এএসএম