বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: তারুণ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

মাহবুব আলম
মাহবুব আলম মাহবুব আলম
প্রকাশিত: ১০:৫০ এএম, ১০ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ আজ এক জটিল দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে প্রবৃদ্ধির আশাবাদী পরিসংখ্যান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি; অন্যদিকে বিস্তৃত তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। উন্নয়নের গল্প যত উঁচুস্বরে বলা হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে আরেকটি নীরব সংকট—চাকরির অভাব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ বেকার। সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ হলেও তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় তিনগুণ—১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে তা ৯.৬৫ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, মোট বেকারের প্রায় ৭৮–৭৯ শতাংশই তরুণ। এদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত; প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী।

এই বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, নাকি কেবল সংখ্যাগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ?

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: সম্ভাবনা না ঝুঁকি?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। কিন্তু এই সুবিধা তখনই কার্যকর হয়, যখন অর্থনীতি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। অন্যথায় এই একই তরুণশক্তি বেকারত্ব, হতাশা এবং সামাজিক অস্থিরতার উৎসে পরিণত হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে শিল্পায়নের মাধ্যমে তাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করেছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম গত দুই দশকে ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এনে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

বাংলাদেশও তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে একটি সফল মডেল দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভর করে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়—এটি এখন সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা।

শিক্ষিত বেকারত্ব: অদৃশ্য সংকট

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব এখন একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ৯ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট কর্মহীন। এর প্রধান কারণ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ—অথবা ঝুঁকি। তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে, আবার সবচেয়ে বড় চাপেও পরিণত হতে পারে। পার্থক্যটা নির্ভর করছে একটি বিষয়ের ওপর—প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে। বিনিয়োগ, দক্ষতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে উন্নয়নের বর্তমান গতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। আর যদি তা করা যায়, তাহলে এই তারুণ্যই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

দেশে ১৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বের হলেও তাদের দক্ষতা শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ জনশক্তির জন্য বিদেশের দিকে ঝুঁকছে—যা একটি স্পষ্ট নীতিগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা বাড়ছে না—এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে অকার্যকর করে তুলছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ অর্ধেকের কাছাকাছি তরুণ কার্যত কর্মহীন থেকে গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন।

বিনিয়োগ: স্থবিরতার ফাঁদ

অর্থনীতির সহজ সূত্র—বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়েনি। কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা শিল্প সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির অন্তত ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ এই সীমার কাছাকাছি থাকলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন আরও বৈচিত্র্যময় ও শ্রমঘন বিনিয়োগ।

অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে এখনও ঘাটতি রয়েছে। নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই খাত কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

নির্বাচনের পর নতুন সরকার কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিয়োগনির্ভর শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—এই প্রতিশ্রুতি কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে নীতিগত বিলম্বের সুযোগ খুব সীমিত। কর্মসংস্থান সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

এসএমই ও উদ্যোক্তা: অবহেলিত শক্তি

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বিশ্বব্যাপী এই খাত মোট কর্মসংস্থানের ৬০–৭০ শতাংশ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশেও একই সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু নীতিগত সহায়তার অভাবে এটি পূর্ণতা পাচ্ছে না।

লাইসেন্স, ঋণপ্রাপ্তি, করব্যবস্থা—সবখানেই জটিলতা ছোট উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়লেও তা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।

ডিজিটাল অর্থনীতি: নতুন দিগন্ত

ডিজিটাল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, আউটসোর্সিং—এসব খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।

তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তি শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যথায় এই খাতও সীমিত গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকবে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি: ভারসাম্যের চাবিকাঠি

বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনও কৃষিনির্ভর। কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এতে শহরমুখী চাপ কমবে এবং উন্নয়নে ভারসাম্য আসবে।

করণীয়: নীতিগত সংস্কারের সময় এখনই

বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ অপরিহার্য—

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা
কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় জোর দেওয়া
উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রণোদনা বৃদ্ধি
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ জোরদার
আঞ্চলিক শিল্পায়ন বিস্তৃত করা

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ—অথবা ঝুঁকি। তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে, আবার সবচেয়ে বড় চাপেও পরিণত হতে পারে। পার্থক্যটা নির্ভর করছে একটি বিষয়ের ওপর—প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে।
বিনিয়োগ, দক্ষতা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে উন্নয়নের বর্তমান গতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। আর যদি তা করা যায়, তাহলে এই তারুণ্যই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও যোগাযোগবিদ।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।