আমাদের মানসিক উচ্চতা কি বাড়বে?

হাসান হামিদ
হাসান হামিদ হাসান হামিদ , কথাসাহিত্যিক ও গবেষক।
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ এএম, ১৬ মে ২০২৬

বাংলাদেশ এখন যেন এক অদ্ভুত ঋতুর ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। বাইরে রোদ আছে, ভেতরে কুয়াশা। শহরে আলো আছে, কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কে অন্ধকার। চারদিকে এত শব্দ, এত বক্তৃতা, এত মতামত, এত প্রতিক্রিয়া; তবু মনে হয়, গভীর চিন্তার জায়গাগুলো ক্রমশ জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে। যেন সভ্যতার কেন্দ্রস্থলে বসে আমরা ধীরে ধীরে বর্বরতার দিকে হাঁটছি, আর হাঁটতে হাঁটতে নিজেদেরই আধুনিক বলে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এই সমাজে এখন মানুষ আগের চেয়ে বেশি কথা বলে, কিন্তু কম চিন্তা করে। বেশি দেখে, কিন্তু কম উপলব্ধি করে। বেশি জানে, কিন্তু কম বোঝে। তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে, অথচ প্রজ্ঞার দুর্ভিক্ষ নেমেছে। যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ এসে জমা হয়েছে এই ভূখণ্ডে, কিন্তু একটি নির্মল বাক্য জন্ম নেওয়ার মতো নীরবতা আর অবশিষ্ট নেই।

সভ্যতার ইতিহাসে রুচির মৃত্যু কখনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ধীরে ধীরে ঘটে। যেমন একটি নদী একদিনে মরে না; প্রথমে তার জল কমে, তারপর স্রোত স্তিমিত হয়, তারপর কচুরিপানা জমে, তারপর একদিন দেখা যায়, নদীর বুকের উপর মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। সংস্কৃতির মৃত্যুও তেমন। প্রথমে মানুষ গভীর সাহিত্য পড়া বন্ধ করে। তারপর কঠিন চিন্তাকে ভয় পেতে শুরু করে। তারপর শিল্পকে কেবল বিনোদন ভাবে। তারপর একসময় এসে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন সমাজ আর উৎকর্ষ চিনতেই পারে না। বাংলাদেশ আজ সেই বিপজ্জনক পর্যায়ের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে এগোব, সেতু বানাব, অর্থনীতি বাড়াব, শহর উঁচু করব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের মানসিক উচ্চতা কি বাড়বে? আমরা কি কেবল তথ্যসমৃদ্ধ মানুষ হব, নাকি প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষও হব? কারণ সভ্যতার প্রকৃত মাপ রাস্তার দৈর্ঘ্যে নয়, মানুষের চিন্তার গভীরতায় নির্ধারিত হয়। একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে মহান হয়, যখন সে কেবল বাঁচতে শেখে না, সুন্দরভাবে বাঁচতেও শেখে।

একসময় এই ভূখণ্ডে বই ছিল আত্মার আশ্রয়। মফস্বলের লাইব্রেরিগুলোয় সন্ধ্যার পর বাতি জ্বলত, তরুণেরা কবিতা নিয়ে তর্ক করত, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে দর্শন নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক হতো, নাটকের দল রাতভর মহড়া দিত, গানের আসরে মানুষ চোখ বন্ধ করে শুনত। এখনো এসব পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু তাদের চারপাশে এমন এক কোলাহল তৈরি হয়েছে, যেখানে গভীরতা টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ সমাজের রুচি কখনো স্থির থাকে না; এটি পরিবেশের সঙ্গে বদলায়।

মানুষের মানসিক ভূগোলও প্রকৃতির মতোই বিবর্তিত হয়। যে সমাজে জ্ঞানের জন্য সামাজিক সম্মান থাকে, সেখানে চিন্তাবিদ জন্মায়। যে সমাজে শিল্পকে প্রয়োজন মনে করা হয়, সেখানে শিল্পী টিকে থাকে। আর যে সমাজে জনপ্রিয়তাই একমাত্র মুদ্রা হয়ে ওঠে, সেখানে প্রতিভা ধীরে ধীরে আত্মহত্যা করে।

বাংলাদেশে এখন সেই আত্মহত্যা নীরবে চলছে। এখানে প্রতিভাবান মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে না; তারা নিজেদের ছোট করে ফেলছে। তারা বুঝে গেছে, গভীরতা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। ফলে তারা নিজেদের ভাষা সরল করছে, চিন্তা হালকা করছে, বক্তব্যকে বিনোদনে পরিণত করছে। কারণ এই সমাজ দীর্ঘ মনোযোগ চায় না। এখানে মানুষ একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়তে ভয় পায়, কিন্তু তিন ঘণ্টার রাজনৈতিক চিৎকার শুনতে ক্লান্ত হয় না। এখানে বইয়ের দোকানে ভিড় কমে, কিন্তু তুচ্ছ উত্তেজনার ভিডিও কোটি মানুষ দেখে। এখানে একজন গবেষকের নাম কেউ জানে না, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে নাটক সৃষ্টি করতে পারা লোকেরা রাতারাতি নায়ক হয়ে ওঠে। এ যেন এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক জঙ্গল, যেখানে গভীর বৃক্ষ বাঁচতে পারে না, কিন্তু আগাছা বিস্ময়কর দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়, কিন্তু এটি পরিবর্তনের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের মন এখন অ্যালগরিদমের হাতে বন্দি। আগে মানুষ বই খুলত; এখন স্ক্রিন খুলে। আগে মানুষ একটি বাক্যের ভেতরে ঢুকত; এখন একটি স্ক্রল থেকে আরেকটি স্ক্রলে চলে যায়। মনোযোগের স্থায়িত্ব এত কমে গেছে যে, মানুষ আর নীরবতার সঙ্গে বসে থাকতে পারে না। সে সবসময় উত্তেজনা চায়, শব্দ চায়, প্রতিক্রিয়া চায়।

এই তাড়াহুড়োর যুগে গভীর চিন্তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। কারণ চিন্তা ধীর। সাহিত্য ধীর। দর্শন ধীর। শিল্প ধীর। অথচ বাজার চায় দ্রুততা। অ্যালগরিদম চায় উত্তেজনা। ফলে মানুষের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এমনভাবে গঠিত হচ্ছে, যেখানে জটিলতা অসহ্য লাগে, আর সরল স্লোগান স্বস্তি দেয়। এ কারণেই এখন পৃথিবীজুড়ে “মতামত” বাড়ছে, কিন্তু “চিন্তা” কমছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব আরও তীব্র, কারণ এখানে শিক্ষাব্যবস্থা বহুদিন ধরেই মানুষকে স্বাধীন চিন্তার বদলে আনুগত্য শেখাচ্ছে।

আমাদের বিদ্যালয়গুলো শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখায় না; শেখায় উত্তর মুখস্থ করতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক সময় জ্ঞানের চেয়ে ডিগ্রির কারখানায় পরিণত হয়। ছাত্ররা শেখে কীভাবে চাকরি পেতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে পৃথিবীকে বুঝতে হয়। ফলে সমাজে তৈরি হয় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা, কিন্তু তৈরি হয় না মননশীল মানুষ। এ যেন বিশাল এক গ্রন্থাগার, যেখানে হাজার হাজার বই সাজানো আছে, কিন্তু কেউ পড়তে জানে না।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, আমরা এখন জ্ঞানকে আর মানবিক মহিমা হিসেবে দেখি না; দেখি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে। সাহিত্য পড়ে কী হবে? দর্শন পড়ে চাকরি মেলে? ইতিহাস জানলে বেতন বাড়ে? এই প্রশ্নগুলোই প্রমাণ করে, সমাজ তার আত্মাকে বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। কারণ সভ্যতা কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের নাম নয়। মানুষ যদি কেবল আয় বাড়ানোর যন্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে সে উন্নত প্রাণী হতে পারে, কিন্তু উন্নত সভ্যতা গড়তে পারে না।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভেতরে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। একসময় মধ্যবিত্ত ছিল সংস্কৃতির বাহক। তাদের ঘরে বই থাকত, গান থাকত, বিতর্ক থাকত, সংবাদপত্র নিয়ে উত্তেজনা থাকত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্ক্রিন। পরিবারগুলো একই ঘরে বসে থাকে, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। শিশুরা গল্প শোনে না; ভিডিও দেখে। তারা কবিতার ছন্দ নয়, নোটিফিকেশনের শব্দে বড় হয়। ফলে একটি জাতির কল্পনাশক্তি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। আর কল্পনাশক্তি শুকিয়ে গেলে সমাজ নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। কারণ সাহিত্য মানুষকে কেবল ভাষা দেয় না; সহানুভূতিও দেয়। দর্শন মানুষকে কেবল যুক্তি শেখায় না; বিনয়ও শেখায়। শিল্প মানুষকে কেবল সৌন্দর্য দেখায় না; জটিলতা বুঝতেও শেখায়। যখন এসব অনুপস্থিত থাকে, তখন মানুষ ক্রমশ সরল, আক্রমণাত্মক এবং উগ্র হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জনপরিসরে এখন সেই উগ্র সরলীকরণের বিস্তার দেখা যায়। এখানে জটিল সমস্যার সরল সমাধান খুব জনপ্রিয়। গভীর বিশ্লেষণের চেয়ে নাটকীয় বক্তৃতা বেশি গ্রহণযোগ্য। মানুষ এখন এমন নেতাকে পছন্দ করে, যিনি চিন্তা করতে বাধ্য করেন না; বরং উত্তেজিত করেন। কারণ উত্তেজনা চিন্তার চেয়ে সহজ।

এই সহজতার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বামন করে দেয়। একটি সমাজ যখন দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের সঙ্গে বসবাস করে, তখন তার চোখের উচ্চতাও নিচে নেমে যায়। তখন সে আর মহত্ত্ব বুঝতে পারে না। যেমন বহুদিন অন্ধকারে থাকলে চোখ আলো সহ্য করতে পারে না, তেমনি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের পর একটি সমাজ উৎকর্ষকে অস্বস্তিকর মনে করতে শুরু করে।

বাংলাদেশে আজকাল অনেক সময় দেখা যায়, যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে, তাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, তাকেই সবচেয়ে সফল মনে করা হয়। যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি আবেগ সৃষ্টি করতে পারে, তাকেই সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাবা হয়। অথচ ইতিহাসের বড় চিন্তাবিদেরা প্রায়ই নীরব ছিলেন। গভীর মানুষরা সাধারণত ধীরে কথা বলেন। কারণ তারা জানেন, সত্যের ভেতরে নাটক কম থাকে। কিন্তু আমাদের সমাজ এখন নাটকপ্রিয়। ফলে জ্ঞানের জায়গা দখল করছে প্রদর্শন। চিন্তার জায়গা দখল করছে ব্র্যান্ডিং।

ব্যক্তিত্বের জায়গা দখল করছে পাবলিক ইমেজ। এমনকি ধর্মও এই প্রদর্শনের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত নয়। আধ্যাত্মিকতার জায়গায় এসেছে প্রকাশ্য ধার্মিকতা। নৈতিকতার জায়গায় এসেছে পরিচয়। ফলে মানুষ ধর্মকে আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে নয়, বরং সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজনীতিতেও একই অবস্থা। আদর্শের জায়গা নিয়েছে ব্যক্তিপূজা। নীতির জায়গা নিয়েছে স্লোগান। যুক্তির জায়গা নিয়েছে আনুগত্য। ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরে গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে।

ভাষার মধ্যেও এই অবক্ষয় স্পষ্ট। বাংলা ভাষা একসময় ছিল আবেগ, দর্শন ও সৌন্দর্যের বিস্ময়কর আধার। এখন ভাষা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। মানুষ দীর্ঘ বাক্য এড়িয়ে চলে। জটিল ভাবনা প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করে। শব্দভাণ্ডার ছোট হয়ে যাচ্ছে। ভাষা যখন দরিদ্র হয়, তখন চিন্তাও দরিদ্র হয়ে যায়। কারণ মানুষ ভাষার মাধ্যমেই পৃথিবীকে বোঝে। একসময় বাঙালি জাতি তার সাহিত্য নিয়ে গর্ব করত। এখন অনেকেই সাহিত্যকে “অপ্রয়োজনীয়” ভাবতে শুরু করেছে। অথচ যে জাতি সাহিত্য হারায়, সে জাতি ধীরে ধীরে নিজের আত্মজীবনী হারায়। কারণ সাহিত্য কেবল গল্প নয়; এটি একটি জাতির স্মৃতি, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের ভাণ্ডার। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় সম্ভবত এই যে, আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে আর সংকট বলে মনে করছি না। বরং সেটিকেই স্বাভাবিক ভেবে নিয়েছি। নিম্নমানের বিনোদন, অগভীর বক্তৃতা, ফাঁপা বুদ্ধিবৃত্তি; সবকিছুকে আমরা “চলছে তো” বলে মেনে নিচ্ছি। এই গ্রহণই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ কোনো সভ্যতা তখনই পতনের দিকে যায়, যখন সে আর উৎকর্ষ দাবি করে না।

রোমান সাম্রাজ্য একদিনে পতন হয়নি। তাদের পতনের আগে জনজীবনে প্রদর্শন বেড়েছিল, গভীরতা কমেছিল, রাজনীতি নাটকে পরিণত হয়েছিল, আর জনতার মন জয় করার জন্য শাসকেরা রুটি ও বিনোদনের আয়োজন করেছিল। ইতিহাসের প্রায় সব পতনশীল সভ্যতার ভেতরেই এই লক্ষণগুলো দেখা যায়। যখন মানুষ চিন্তার বদলে কেবল উত্তেজনা চায়, তখন সভ্যতা ভেতর থেকে পচতে শুরু করে। বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটছে?

প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবু আশার কারণ আছে। কারণ মানুষের ইতিহাস কেবল পতনের ইতিহাস নয়; পুনর্জাগরণের ইতিহাসও। ইউরোপ একসময় অন্ধকার যুগ পার করেছে। বহু সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে গেছে, আবার সেখান থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু ফিরে আসার জন্য প্রথমে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। যে সমাজ নিজের অসুখ চিনতে পারে না, সে কখনো সুস্থ হয় না।

আমাদের প্রয়োজন নতুন করে রুচির রাজনীতি গড়ে তোলা। এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে গভীর সাহিত্যকে সম্মান করা হবে, গবেষককে গুরুত্ব দেওয়া হবে, শিল্পীকে কেবল বিনোদনকর্মী হিসেবে দেখা হবে না। পরিবারে বই ফিরতে হবে। শিশুদের মুখস্থ বিদ্যার বদলে কল্পনাশক্তি শেখাতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে জ্ঞানের স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিণত করতে হবে। গণমাধ্যমকে কেবল দর্শকসংখ্যার জন্য নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ববোধ থেকেও কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সমাজকে আবার নীরবতার মূল্য বুঝতে হবে। কারণ মহান চিন্তা কোলাহলের মধ্যে জন্মায় না। একটি কবিতা লিখতে যেমন নিঃসঙ্গতা লাগে, তেমনি একটি সভ্যতা নির্মাণ করতেও লাগে গভীর মনোযোগ।

বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে এগোব, সেতু বানাব, অর্থনীতি বাড়াব, শহর উঁচু করব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের মানসিক উচ্চতা কি বাড়বে? আমরা কি কেবল তথ্যসমৃদ্ধ মানুষ হব, নাকি প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষও হব? কারণ সভ্যতার প্রকৃত মাপ রাস্তার দৈর্ঘ্যে নয়, মানুষের চিন্তার গভীরতায় নির্ধারিত হয়। একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে মহান হয়, যখন সে কেবল বাঁচতে শেখে না, সুন্দরভাবে বাঁচতেও শেখে। আর সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য রুচি প্রয়োজন। প্রজ্ঞা প্রয়োজন। নীরবতা প্রয়োজন। সাহিত্য প্রয়োজন। শিল্প প্রয়োজন। প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা ভিড়ের শব্দের ভেতর থেকেও সত্যের ক্ষীণ শব্দ শুনতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নে; আমরা কি কোলাহলের জাতি হয়ে থাকব, নাকি আবার চিন্তার জাতিতে পরিণত হব।

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।