পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি : প্রয়োজন দ্রুততর সমাধান

মোহাম্মদ রাহীম উদ্দিন
মোহাম্মদ রাহীম উদ্দিন মোহাম্মদ রাহীম উদ্দিন
প্রকাশিত: ১০:০৮ এএম, ১০ আগস্ট ২০১৮

 

গত কয়েক বছরে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম গতিশীল উন্নতি দেখা গেছে বাংলাদেশে। ২০০৬ সাল থেকে উন্নতির মুখ দেখতে থাকে বাংলাদেশ। এরপর থেকে বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২.৫ করে বাড়তে থাকে প্রতি বছর।

নারীদের শিক্ষাদান এবং তাদের সোচ্চার করে তোলাতে শিশুস্বাস্থ্য এবং শিক্ষার উন্নতি হয়েছে আগের তুলনায় কয়েকগুণ। বাংলাদেশের এ উন্নতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্য। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শ্রমিকদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বারকয়েক। যদিও এখনো শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য আরও উপযুক্ত আইন প্রণয়ন জরুরি।

বর্তমানে যে আইন আছে তা নতুন কর্মসংস্থান এবং শিল্প ক্ষেত্রে উন্নতির যথেষ্ট কাজে এসেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই ৭৫৫টি পোশাক কারখানার সংস্কারকাজ শেষ করতে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ না করলে কারখানাগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে দেশীয় সক্ষমতায় ‘রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন’ বা ‘সংস্কারকাজ সমন্বয় সেলে’র (আরসিসি) কাজ শুরু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোট ‘অ্যাকর্ড’ ও ‘অ্যালায়েন্সে’র মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। কারখানা সংস্কার তদারকিতে তাদের আরও ছয় মাস সময় দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, রানা প্লাজা বিপর্যয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল ৷ চালু হয়েছিল ‘‘অ্যাকর্ড”, ‘‘অ্যালায়েন্স” এবং ‘‘টেক্সটাইলস পার্টনারশিপ” এর মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের গার্মেন্টস ওয়ার্কারদের কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা। তথ্যমতে, পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪৫ লক্ষ শ্রমিক অত্যন্ত পরিশ্রম করে দেশ এবং শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করে আসছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও শিল্প উন্নতির লক্ষ্যে ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করে চলেছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নতুন করে নির্ধারণের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি মাসিক ১৬ হাজার টাকার পরিবর্তে ২০% বৃদ্ধিতে অর্থ্যাৎ ৬ হাজার ৩৬০ টাকা দিতে রাজি হয় মালিকপক্ষ। সর্বশেষ মজুরি বোর্ডের তৃতীয় সভায় গত ১৬ জুলাই ২০১৮ এ প্রস্তাব করেন গার্মেন্টস মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।

এদিকে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে যখন ব্যবধান বিস্তর তখন বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার ভূঁইয়া ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব দেন। বর্তমানে একজন নতুন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা। তবে শামসুন্নাহার ভূইয়ার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে থাকা শ্রমিক সংগঠনগুলো। ফলে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়।

এদিকে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ চূড়ান্ত করতে হবে, যা আগামী ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে মজুরির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম । যদিও বোর্ডকে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার জন্য সরকারের বেঁধে দেওয়া ছয় মাস সময় আগামী ১৮ আগস্ট শেষ হচ্ছে। বাকি কাজ শেষ করার জন্য মজুরি বোর্ড শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে আরও তিন মাস সময় বাড়ানোর আবেদন করবে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, গার্মেন্টস শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলনের পর মজুরি বোর্ড ২০১৩ সালে পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৩০০ টাকা ঘোষণা করে যেখানে দাবী ছিল ন্যূনতম মজুরি ৮০০০ টাকার। সর্বশেষ ২০১৩ সালে যে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হয়েছিল ৫৩০০ টাকা; যাতে খাদ্য ভাতা হচ্ছে ৬৫০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ১২০০ টাকা, যাতায়ত ভাড়া ২৫০ টাকা, মেডিকেল ২০০ টাকা, বেসিক ৩০০০ টাকা।

দেশে এইখাতের শ্রমিকদের জন্য ১৯৮৪ সালে প্রথম মজুরি ঘোষণা করা হয়। ওই সময় শ্রমিকদের ন্যূনতম মোট মজুরি ছিল ৬৩০ টাকা। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ৯৩০ টাকা, ২০০৬ সালে ১ হাজার ৬৬২ টাকা, ২০১০ সালে ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। ‘ট্রেডিং ইকোনমিক্স’এর ২০১৮ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মার্কিন ডলারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন দেখানো হয়েছে ৬৩.২৬ ডলার। যেখানে কানাডার ২৬১৭ ডলার, ফ্রান্সের ১৮৩০ ডলার, জার্মানির ২৫৯১ ডলার, যুক্তরাজ্যের ২৬১৯ ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের ১৭৪০ ডলার এবং জাপানের ১৮৭০ ডলার।

আইএলও ১০০ ডলারের নিচে বেতন যেই যেই দেশের তার একটি তথ্য দিয়েছে যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর সিএনএন একটা তথ্য প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল আমেরিকাতে তৈরি একটা ডেনিম শার্টের মজুরি পড়ে ৭.৪৭ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০০ টাকা।

অন্যদিকে বাংলাদেশে তৈরি শার্টটির মজুরি পড়ে দশমিক ২২ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮ টাকা। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের মজুরি কাঠামোকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে ২০০৬ সালে দেখিয়েছিলেন বাংলাদেশে উৎপাদিত একটি গার্মেন্টস পণ্য ইউরোপে বা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০০ ডলার বিক্রি হলে কারখানার মালিক পান ১৫ – ২০ ডলার, উৎপাদিত রাষ্ট্র ২৫ – ৩০ ডলার এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠান ৫০ – ৬০ ডলার পেয়ে থাকে। উৎপাদনকারী শ্রমিকের ভাগে পড়ে মাত্র ১ ডলার।

শ্রমিকদের বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতে পোশাক শিল্পে শ্রমিক মজুরি পুনঃনির্ধারণের দাবির যৌক্তিকতা আছে বৈকি।

লক্ষ্য রাখতে হবে এখাতে কোন উপায়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে বাংলাদেশে এই শিল্পের বর্তমান সুনাম নষ্ট করার পিছনে কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া যাবে না। এমনও হতে পারে বাংলাদেশে এই শিল্পের বর্তমান প্রতিষ্ঠিত অবস্থান নষ্ট করে এই বাজারকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিয়ে ভিয়েতনাম, ভারত, শ্রীলঙ্গাসহ অন্যান্য দেশে প্রতিষ্ঠিত করার সুদূর প্রসারি চিন্তার কাজ করতে পারে কোন বিদেশী চক্র।

বাংলাদেশ বর্তমানে ২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের গার্মেন্টস রপ্তানি করে থাকে। সরকার সেটাকে ২০২১ সাল – অর্থাৎ দেশের পঞ্চাশতম বার্ষিকীর মধ্যে ৫০ বিলিয়নে দাঁড় করাতে চান। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে এক হয়ে কাজ কাজ করতে হবে।

যাদের ঘর্মাক্ত শ্রমের বিনিময়ে আজ আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের স্বীকৃতি অর্জন করতে পেরেছি তাদের শ্রমের মূল্য ও জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রধান। আর তা করতে হবে তাদের মজুরি বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। পোশাক শিল্পে কর্মরত এই বিশাল (৪৫ লাখ) শ্রমিকগোষ্ঠীকে হতাশায় রেখে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। হতাশা ও অনিশ্চয়তা শ্রমিকের উৎপাদক্ষমতা কমিয়ে দেয়, নষ্ট করে দেয় শ্রমশক্তি। তাই যতদ্রুত সম্ভব শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাস্তবসম্মত উপায়ে যৌক্তিক ভিত্তিতে পুনঃনির্ধারণ করে শ্রমরোষ বন্ধ করে তাদের উৎপাদমুখী করতে হবে।

mrahim04@hotmail.com

এইচআর/এমএস

‘যাদের ঘর্মাক্ত শ্রমের বিনিময়ে আজ আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের স্বীকৃতি অর্জন করতে পেরেছি তাদের শ্রমের মূল্য ও জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রধান। আর তা করতে হবে তাদের মজুরি বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। পোশাক শিল্পে কর্মরত এই বিশাল (৪৫ লাখ) শ্রমিকগোষ্ঠীকে হতাশায় রেখে ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।’

আপনার মতামত লিখুন :