বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত : নতুন সময়ে নতুন ভাবনা

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
ডা. বিএম আতিকুজ্জামান ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
প্রকাশিত: ১০:৩৫ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

জনস্বাস্থ্য নীতি, জ্ঞান বিস্তার এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা— এই তিনটি বিষয়ের প্রতি আমার গভীর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। আমার চিকিৎসক জীবন শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এরপর আফ্রিকার ছোট দেশ জাম্বিয়া, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকল্যাণমুখী অঙ্গরাজ্য নিউ ইয়র্ক এবং গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাদী অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা রূপ কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে।

তবে আমার শিকড় বাংলাদেশেই। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সবসময় জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তর, চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন এবং তরুণ চিকিৎসকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসকদের অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম Planetary Health Academia-এর মাধ্যমে আমরা সংগঠিতভাবে জ্ঞান বিনিময় ও নীতিগত আলোচনায় অংশ নিচ্ছি।

সম্প্রতি নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা স্বাস্থ্যখাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে স্বাস্থ্যশিক্ষা, চিকিৎসা সেবা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কয়েকটি অনুভূতি ও প্রত্যাশা তুলে ধরতে চাই।

বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা কোথায়?

আজকের বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে—
Evidence-Based Medicine (প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি
গ্লোবাল ডেটা শেয়ারিং ও সহযোগিতা
এই পরিবর্তনের স্রোতে অনেক দেশ দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশও সম্ভাবনাময়, কিন্তু নানান কারণে আমরা পিছিয়ে আছি। অতীতের ভুল নিয়ে আলোচনা না করে এখন সামনে এগোনোর সময়।
সঠিক নেতৃত্বের প্রয়োজন
স্বাস্থ্যখাতে নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে’ বসানো— এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।
নেতৃত্ব এমন হওয়া উচিত—
যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং সমগ্র জনগণের জন্য কাজ করবে।
যা সব চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীকে সমানভাবে মূল্য দেবে।
যা নীতিকে ব্যক্তির ওপরে স্থান দেবে।
রাজনীতি স্বাস্থ্যনীতিকে প্রভাবিত করবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু জাতীয় স্বাস্থ্য দর্শন ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকা উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে বহু সময় নেতৃত্ব রাজনৈতিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারাবাহিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করেছে।
স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতা
স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ স্বায়ত্তশাসন প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরকার—
স্বচ্ছতা
জবাবদিহিতা
মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে শক্ত নীতিমালা, মানদণ্ড ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে মানের বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসক তৈরির মান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
আমরা বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক তৈরি করছি। এটি একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ।
আমাদের লক্ষ হওয়া উচিত—
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা
গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণ
দক্ষতা ও নৈতিকতার ওপর জোর
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম চিকিৎসক তৈরি
একই সঙ্গে এই চিকিৎসকদের দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না—মান নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক নেতৃত্ব, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রবাসী চিকিৎসকদের সম্পৃক্ততা—এই কয়েকটি স্তম্ভের ওপর ভর করেই আমরা একটি আধুনিক, মানবিক ও বৈশ্বিক মানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে বিশ্বাস করি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসকদের ভূমিকা
আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসক কাজ করছেন—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের নানা দেশে। তারা শুধু রোগীর সেবা দিচ্ছেন না; তারা গবেষণা করছেন, স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছেন।
এই বিশাল অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানভান্ডার বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। আমাদের উচিত একটি কাঠামোবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যার মাধ্যমে—
প্রবাসী চিকিৎসকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা যাবে।
অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যাবে।
যৌথ গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল সহযোগিতা গড়ে তোলা যাবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা যাবে।
বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত এই প্রজন্মের চিকিৎসকদের সম্পৃক্ত না করে আমরা আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব না। তারা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ নন; বরং সঠিক পরিকল্পনায় তারা হতে পারেন ‘ব্রেইন গেইন’।
স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা
স্বাস্থ্যসেবার মূল শক্তি হলো স্বাস্থ্যকর্মী।
তাদের জন্য প্রয়োজন—
নিরাপদ কর্মপরিবেশ
পেশাগত মর্যাদা
ন্যায্য পারিশ্রমিক
স্পষ্ট জবাবদিহিতা কাঠামো
জবাবদিহিতা মানে শাস্তি নয়; এটি মানোন্নয়নের প্রক্রিয়া।
ডেটাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা
একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হলো তথ্য।
আমাদের জরুরি প্রয়োজন—
জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটাবেস
রোগভিত্তিক রেজিস্ট্রি
ডিজিটাল হাসপাতাল রেকর্ড
গবেষণার জন্য উন্মুক্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার
ডেটা ছাড়া পরিকল্পনা অন্ধকারে তীর ছোড়ার মতো।
এখনই শুরু করতে হবে
‘আগামীকাল করবো’—এই মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে।
আমরা হয়তো দেরি করে ফেলেছি, কিন্তু আর দেরি করার সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্যখাত কেবল একটি সেবা খাত নয়; এটি একটি জাতির মানবসম্পদের ভিত্তি। সুস্থ জনগণ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক নেতৃত্ব, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রবাসী চিকিৎসকদের সম্পৃক্ততা—এই কয়েকটি স্তম্ভের ওপর ভর করেই আমরা একটি আধুনিক, মানবিক ও বৈশ্বিক মানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।

আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে বিশ্বাস করি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
সময় এখনই।

লেখক: আমেরিকার অরলান্ডো প্রবাসী চিকিৎসক।

এইচআর/এমএফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।