যে কারণে নৌখাতের উন্নয়ন অপরিহার্য

আশীষ কুমার দে
আশীষ কুমার দে আশীষ কুমার দে , সিনিয়র সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

 

বাংলাদেশ নদীমাতৃক হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকে এ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। সারা দেশে জালের মতো বিছিয়ে ছিল ছোট-বড় সহস্রাধিক নদ-নদী। তাই যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য সিংহভাগ মানুষ নৌ চলাচল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

অন্যদিকে কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে কৃষককে আবাদিজমিতে সেচসুবিধা দিতে হতো; সেই পানির প্রধান উৎসও ছিল নদীসহ প্রাকৃতিক জলাভূমি। গ্রামীণ জনপদের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের আয়ের একমাত্র পথ ছিল নৌকা চালানো; যাদেরকে আমরা মাঝি-মাল্লা বলে চিনি।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, বাংলাদেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অগ্রগতির সঙ্গে নদ-নদী আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে। নদীসহ প্রাকৃতিক পানিসম্পদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাট-বাজার, বাণিজ্যকেন্দ্র, নানা ধরনের শিল্প ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং চারটি সম্দ্রুবন্দরসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদীবন্দর।

কিন্তু কালের বিবর্তনে দৃশ্যপট আমুল বদলে গেছে। নদীর সংখ্যা কমেছে, বহু নদী হারিয়েছে যৌবন, সংকুচিত হয়েছে নৌপথ ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থা, যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে কংক্রিটের তৈরি পিচঢালা সড়ক।

যান্ত্রিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষের এ যুগে গোটা বিশ্ব যখন একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের বহুমুখি পথ খুঁজছে, তখন বাংলাদেশের অমিত সম্ভবনার এক উর্বর ক্ষেত্র বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও নৌপরিবহন খাত অনাদর, অবহেলা ও চরম উদাসীনতার শিকার। বহুজাতিক অটোমোবাইল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কুপরামর্শ, ১৯৭৫-পরবর্তী সরকারগুলোর (চলতি মেয়াদসহ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন টানা তিন মেয়াদের সরকার বাদে) প্রকৃতিপ্রেমহীনতা, উদাসীনতা রাজনীতিবিদদের অবহেলা এবং শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের কারণে নদী ও নৌ চলাচল ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক নৌখাত বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।

একদিকে বছরের পর বছর ধরে পলি জমে ও মারাত্মক দূষণে নদীগুলো স্রোতহারা হয়ে নৌপথের আয়তন আশংকাজনকহারে কমেছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, পরিবেশবিনাশী প্রকল্প প্রণয়ন এবং ভূমিদস্যুদের করালগ্রাসে অনেক নদী বিলীন হয়ে গেছে।

এরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ধারাবাহিকতায় কমেছে হাওর-বাওড় ও বিলসহ উন্মুক্ত জলাভূমির আয়তন। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। একই কারণে সকল ধরনের নৌযানের সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ নৌখাতের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে বাধ্য হচ্ছে।

তাই বলে কী নদ-নদী রক্ষাসহ নৌখাতের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে? এর উত্তর হলো ‘না’; ফুরিয়ে যায়নি এবং যাবেও না কোনোদিন। এতো প্রতিকূলতার মধ্যে আশার কথা যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও জাতীয় অর্থনীতি থেকে নৌপরিবহন খাত এখনো হারিয়ে যায়নি। চলতি শতকের প্রথমদিকে বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীন নৌ চলাচল ব্যবস্থার ওপর এখনও বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল।

অভ্যন্তরীণ নৌপথে এখনও নিয়মিত ৩০ শতাংশ যাত্রী চলাচল করে। আর ২০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গত দেড় দশকে নৌপরিবহন খাতের ওপর নির্ভরশীলতা আরো বেড়েছে। কিন্ত পরিতাপের বিষয়, সড়কখাতের তুলনায় নৌখাত আনুপাতিকহারে সরকারি আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

নদ-নদী প্রকৃতির দান। তাই নৌপথ তৈরিতে আবাদি কিংবা বসতি জমি অথবা কোনো স্থাপনা ধ্বংস করতে হয় না। নৌপথে যাতায়াত আরামদায়ক, ব্যয়সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সড়কপথের তুলনায় নৌপথে ব্যয় আরো কম।

বৈদেশিক পণ্য আমদানি কিংবা দেশিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথ এখনও প্রধান মাধ্যম। সারা দেশে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌপথ। আর এই যোগাযোগের সহজতর মাধ্যমকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র শর্ত হচ্ছে নদ-নদী রক্ষা ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

নদী রক্ষা না হলে নৌপথ বিলুপ্ত হবে, নৌ চলাচল ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে, প্রাকৃতিক মৎস্য আহরণ কমে গিয়ে জেলে মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এবং নৌযানের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে মাঝি-মাল্লারা বেকার হবে। একইসঙ্গে কৃষিতে সেচসুবিধার ক্ষেত্রে দেখা দেবে পানিসংকট, নদ-নদীবিধৌত জনপদগুলোর সবুজ বৃক্ষরাজি ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকবে।

এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর; যার আঘাত জাতীয় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্থ করবে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলার জন্য নৌখাতের সামগ্রিক উন্নয়ন অপরিহার্য।

তবে, সোনালী অতীতকে হারালেও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও সুযোগ একেবারে হাতছাড়া হয়ে যায়নি। টানা তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের দলীয় ইশতেহারে বিলুপ্ত ও বেদখল হওয়া নদ-নদী পুনরুদ্ধার, খনন ও নিয়মিত পলি অপসারণের মাধ্যমে নৌপথকে সচল রাখাসহ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই ইশতেহারের আলোকে নৌখাতের উন্নয়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন; যার ধারাবাহিকতা এখনও চলমান রয়েছে। নদী খননের উদ্দেশে গত ১০ বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএর জন্য আমদানি করা হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ড্রেজার এবং সহায়ক জলযানসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

এসব ড্রেজারের সাহায্যে নদী খনন ও পলি অপসারণ কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রসঙ্গত, নেদারল্যান্ডের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ১৯৬৫-৬৭ সালের জরিপ অনুযায়ী আমাদের অভ্যন্তরীণ নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৫,১৪০ কিলোমিটার; যা কমে চলতি শতকের প্রথমদিকে শেষে এসে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৫,৯৬৮ কিলোমিটারে।

আমদানি করা ড্রেজারগুলো দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ বিলুপ্ত নৌপথের প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার করেছে। এছাড়া নৌ চলাচল ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আরো বেশিকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার; যা সীমিত পরিসরে বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়। এসব উন্নয়নমূলক কাজের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে নৌখাতের সামগ্রিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী।

এইচআর/এমএস

‘বৈদেশিক পণ্য আমদানি কিংবা দেশিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অভ্যন্তরীণ নৌপথ এখনও প্রধান মাধ্যম। সারা দেশে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌপথ।’

আপনার মতামত লিখুন :