মামা ছাড়া দুনিয়া আন্ধার

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৪০ এএম, ২৬ জুন ২০১৯

মামা-ভাগ্নে যেখানে, আপদ এখন সেখানেও। জোর না থাকায় ভাগ্নের সঙ্গে মামাও নিখোঁজ হয়ে গেছেন। প্রবাসে ফেরৎ যাওয়ার পথে নিখোঁজ বা গুম হয়ে গেছেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার দেবরামপুরের প্রবাসী মামা মোহাম্মদ আতিক উল্যাহ। সঙ্গে ভাগ্নে মোহাম্মদ হুজাইফা তাহমিদও। এ নিয়ে দাগনভূঞা থানা ও ঢাকার খিলগাঁও থানায় আলাদা জিডি হয়েছে।

আতিক উল্যাহ ধনবান প্রবাসী। কিন্ত ক্ষমতাবান নন। প্রায় ১৫ বছর ধরে থাকেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। আবুধাবিতে ব্যবসা করেন। থাকেন সপরিবারে। গত রমজানের কয়েক দিন আগে এসেছিলেন ফেনীর গ্রামের বাড়িতে। ছিলেন বোনের পরিবারের সঙ্গে দাগনভূঞার উত্তর চণ্ডীপুরে। ভাগ্নে তাহমিদ স্থানীয় একটি মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র। ১৩ জুন দুপুরে আতিক উল্যাহ আবুধাবি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। সঙ্গে নেন ভাগ্নে তাহমিদকে।

তাদের ঢাকায় এক দিন থাকার কথা। পরদিন আতিক উল্যাহ আবুধাবি চলে যাওয়ার পর বাড়ি চলে আসবে ভাগ্নে তাহমিদ। কথাবার্তা ছিল এরকমই। বাড়ি থেকে বের হয়ে তারা ফেনীতে স্টার লাইন পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। এরপর থেকেই মামা-ভাগ্নে দু’জনেই নিখোঁজ। বন্ধ হয়ে যায় দুজনের সঙ্গে থাকা দুটি মুঠোফোনও। ঢাকা ও এলাকার সম্ভাব্য সব আত্মীয়স্বজনের কাছে খোঁজ করেও তাদের কোনো হদিস মেলেনি। আতিক উল্যাহ আবুধাবিতেও যাননি।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ টাইপের ক্ষমতাধর মামা থাকলে এই ভাগ্নে এবং মামা দুজনই এতোদিনে উদ্ধার পেতে পারতেন। আরো বেশি জুরি মামা থাকলে হয় তো তাদের কেউ নিখোঁজই হতেন না। ভাগ্নে সৌরভকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে সোহেল তাজ ছুটে আসেন দেশে। নেমে পড়েন ভাগ্নেকে উদ্ধারের চেষ্টায়। তোলপাড় শেষে কামিয়াবিও হন। একটা পর্যায়ে নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ভাগ্নেকে ফিরে পান সাবেক এই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এ ঘটনায় তিনি স্বজন গুম হলে কেমন লাগে সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যমকে।

রাজনৈতিক অসন্তুষ্টি ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে সোহেল তাজ রাজনীতিতে বিরতি দিয়েছেন অনেকদিন হয়। মাঝেমধ্যে নানা অসংগতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। ফেসবুকে তিনি বেশ সাড়া ফেলছেন মাঝেমধ্যে। এর বিপরীতে তাকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। তার সমালোচনা কটূক্তিতে গিয়েও ঠেকছে। সোহেল তাজের সমালোচনা করতে গিয়ে তার বাবা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নেতা তাজউদ্দিনকেও রেহাই দেয়া হচ্ছে না। যেন তারা কতো অপরাধী?

কেউ রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকলে কোনো বিষয়ে তার মতামতও দিতে পারবেন না? কেমন ব্যাপার এটা? তা-ও আবার তাদের ব্যক্তিগত জীবনে একটা কঠিন সময়ে। প্রিয় স্বজন নিখোঁজ থাকার সময়ে? এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে গাজীপুর-কাপাসিয়া অঞ্চলে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাজমুলের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে।

এসব ঘটনা থেকে সোহেল তাজ ধরনের মামাদের জন্য কিছু বার্তা রয়েছে। কিছু প্রশ্নও করা যায় তাকে। তার জোর আরো বেশি হলে বা মন্ত্রীত্ব থাকলে তার ভাগ্নেটা হয়তো অপহৃতই হতো না। সেটাও নিশ্চয়ই বুঝেছেন তিনি। মন্ত্রীত্বে থাকার সময় কি একবারও বলেছিলেন, গুম বা তুলে নিয়ে মায়ের বুক খালি করা ভারী অন্যায়?

আজ অন্যের ভাগ্নে গুম করা হচ্ছে, একদিন নিজের ভাগ্নেও গুমের শিকার হতে পারে? হয়তো মনে হয়নি। বা এভাবে ভাবার অবকাশ হয়নি। মন্ত্রীত্বে বহাল থাকতে না বুঝলেও সাবেক হওয়ার পর যে একজন সোহেল তাজ তা বুঝেছেন এটাই বা কম কিসে?

আমপাবলিক কী বুঝলো? মামার জোর। মামার আভিধানিক অর্থ মায়ের ভাই। আর প্রায়োগিক অর্থে মুরুব্বির জোর, খুঁটির জোর, প্রভাবশালী ব্যক্তির ভরসা। মামা –ভাগ্নে যেখানে আপদ নাই সেখানে- এটা শুধু প্রবাদ বা বাতকে বাত নয়। মামা থাকলে অনেক প্রাপ্তি। অনেক মুশকিল আছান। কিন্তু নামকাওয়াস্তের কমজুরি মামায় তা হয় না। যার হালনাগাদ উদাহরণ ফেনীর মামা-ভাগ্নে।

সরকার বা প্রশাসনের হাই লেভেলে হাই ভোল্টেজের মামা না থাকলে সিদ্ধিলাভ হয় না। হলে তো দেশে আরও যেসব মানুষকে তুলে নেয়া হয়েছে তারাও জীবন ফিরে পেতেন। তাদেরও নিশ্চয় মামা আছে। কিন্তু, ওই মামাদের জোর সোহেল তাজের মতো হাই ভোল্টেজ নয়। কাজেই সব মামার নিখোঁজ ভাগ্নেরা ফিরে আসবে-সেটা আশা করতে ভালো লাগলেও বাস্তবতা ভিন্ন।

দেশে ঠুনকা মামার সংখ্যা অনেক। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারীদের মামা নামে ডাকার একটি সংস্কৃতি চালু হয়েছে। ঝালমুরিঅলা, ফুচকাঅলা, রিক্সাঅলা-ফেরিঅলাদেরও মামা বলে ডাকে এই প্রজন্ম। চাঁদকেও তো মামা ডাকা হয়। চাঁদ কি এই ডাকে সাড়া দেয়?

বাঘ মামা, সিংহ মামাও আছে। আবার মামাবাড়ির আবদার বলেও একটা কথা বেশ চালু। তবে, মামার ইংরেজি নিয়ে একটু গ্যাঞ্জাম আছে। মামার ইংরেজি আংকেল। কিন্তু আংকেল দিয়ে জেঠা, খালু, ফুফা, মা-বাবার বন্ধু সবাইকেই বোঝায়। মামা ছাড়া জন্মালে ক্ষতি নেই। তবে, জীবনে মামা জোগাতে না পারলে পদে পদে বিপদ। সঙ্গে বোনাস হিসেবে আপদ। সেই মামাহীনদের কী হবে? সৌরভের মামা সোহেল তাজ গুম হয়ে যাওয়া অন্যদেরও মামা হবেন? তাদেরও উদ্ধার করে বোনের কোলে ফিরিয়ে দিতে ব্যস্ত হবেন এভাবে?

সৌরভের মা, সোহেল তাজের বোন স্বাধীন বাংলাদেশের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের মেয়ে সৈয়দা ইয়াসমিনের আবেগঘন মন্তব্য এ ক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয়। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ছেলে সৌরভকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আনন্দে ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এ ছাড়া তার আর কিছু চাওয়া নেই। সন্তান গুম হওয়া অন্য মায়েদের ভাষাও এমনই।

গুম বিষয়ে ঘটনাচক্রে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বোধে তারতম্য এলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপলব্ধিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি-না হালনাগাদ তথ্য নেই। এর আগে তিনি বলেছিলেন, দেশে গুম বলে কিছু নেই। গুম বলে কোনো শব্দ নেই। কেউ গুম হয়েছে এমনটিও জানা নেই। যারা গুম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা আসলে বিভিন্ন কারণে আত্মগোপনে রয়েছে, কেউ কেউ ব্যক্তিগত কারণে গা ঢাকা দিয়েও থাকে... এমনই দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেছিলেন আসাদুজ্জামান কামাল। স্বজনহারা কি তবে মিথ্যাবাদী? গুম না হওয়ার পরও তারা কান্নার অ্যাকটিং করছেন? গুম হওয়া ব্যক্তির লাশের আব্দার করাও তো তবে ভারী অন্যায়ের।

রাজনীতি করলে জেল-জুলুমের শিকার হওয়ার একটা সিলসিলা সেই ব্রিটিশ, পাক-ভারত জমানা থেকেই চলে আসছে। সময়ে সময়ে তা কারো কারো সইতেই হয়। যারা আজ ভোগে, তারাও অতীতে তা করেছেন বা ভবিষ্যতে করবেন। এমনটি হয়েই আসছে। কিন্তু তাই বলে একেবারে খাড়ার মধ্যে অস্বীকারের এমন কারবার?

গুম, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া এবং বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকা ব্যক্তির তালিকা ছোট্ট নয়। বিশাল। অভিশপ্ত গুম অনেকেরই ঘুম কেড়ে নিয়েছে। গুমের শিকার হওয়াদের স্বজনরা বুকে পাথর চেপে আছেন। বয়ে বেড়াচ্ছেন অসহ্য যন্ত্রণা। যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বামী হারানো কোন স্ত্রী, যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন পিতাহারা কোন সন্তান, কিংবা পুত্রহারা কোন পিতা। সোহেল তাজের বোন, সৌরভের মা যা ভুগেছেন মাত্র ৯দিন।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

এইচআর/জেআইএম

গুম, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া এবং বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকা ব্যক্তির তালিকা ছোট্ট নয়। বিশাল। অভিশপ্ত গুম অনেকেরই ঘুম কেড়ে নিয়েছে। গুমের শিকার হওয়াদের স্বজনরা বুকে পাথর চেপে আছেন। বয়ে বেড়াচ্ছেন অসহ্য যন্ত্রণা। যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বামী হারানো কোন স্ত্রী, যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন পিতাহারা কোন সন্তান, কিংবা পুত্রহারা কোন পিতা। সোহেল তাজের বোন, সৌরভের মা যা ভুগেছেন মাত্র ৯দিন।

আপনার মতামত লিখুন :