১৭ রমজানের তাৎপর্য ও মহানবির হৃদয় নিংড়ানো দোয়া

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:২৮ এএম, ০৬ মার্চ ২০২৬

পবিত্র মাহে রমজানের ১৭ রমজান ইসলামের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যময় দিন। আজ রমজানের ১৭ রোজা আমরা অতিবাহিত করছি। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হিজরি দ্বিতীয় সালের এই ১৭ রমজানে।

বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয় নিংড়ানো দোয়ার কল্যাণে এ যুদ্ধে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা যুদ্ধ করিয়ে মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেছিলেন।

কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাকের প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, যারা তাকে ডাকে তিনি তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। কিন্তু যারা আমার ইবাদত সম্বন্ধে অহংকার করে, তারা নিশ্চয় লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (সুরা মোমেন, আয়াত: ৬০)।

এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ রয়েছে, ‘অথবা কে উদ্বিগ্নচিত্ত ব্যক্তির দোয়া শোনেন যখন সে তার কাছে দোয়া করে এবং তার কষ্ট দূর করে দেন এবং তোমাদের পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করে দেন? আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো উপাস্য আছে? তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করো’ (সুরা নামল, আয়াত: ৬২)।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয় নিংড়ানো দোয়া সেদিন আল্লাহতায়ালা কবুল করে নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধবাদীদের বিশাল সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।

একদিকে আল্লাহর প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি। তারা প্রায় নিরস্ত্র। অপর পক্ষে অবিশ্বাসীদের নেতা আবু জাহেলের নেতৃত্বে এক হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্যের সুসজ্জিত বাহিনী। এ যুদ্ধে মানুষের ধারণাপ্রসূত সব ধরনের চিন্তা ও উপলব্ধির বাইরে গিয়ে আল্লাহতায়ালা অস্ত্রশস্ত্রহীন ইমানদারের অতিক্ষুদ্র দলটিকে বিজয় দান করেন, আলহামদুলিল্লাহ।

এ যুদ্ধে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদেরকে সাহায্য করেছিলেন তার ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা। বোখারি শরিফের হাদিস মোতাবেক, যুদ্ধের শেষে সাহাবিদের মধ্য থেকে কেউ কেউ সাক্ষী দিয়েছেন, আমরা সাদা পোশাক পরিহিত কিছু ব্যক্তিকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে দেখেছি। তাদেরকে আমরা যুদ্ধের আগে কখনো দেখিনি, এমনকি যুদ্ধের পরও দেখিনি। কেবল মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়ার বরকতেই এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয় লাভ করেছিলেন।

বদর যুদ্ধ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে বদর নামক প্রান্তরে সংঘটিত হয়। ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বদর যুদ্ধের বিজয় ছিল একটি ঐতিহাসিক বিজয়। তাই ইতিহাসে বদর যুদ্ধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য।

বদরের প্রান্তরের যে স্থানটিতে মুসলমানেরা অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখানে সূর্যের তেজ সরাসরি তাদের মুখের ওপর পতিত হয়। কিন্তু কাফেরদের মুখে দিনের বেলায় সূর্যের আলো পড়ে না। মুসলমানেরা যেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবেন, সেখানে বালুময় মাটি যা যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। অপর দিকে কাফেররা যেখানে অবস্থান নিয়েছিল, সেখানে মাটি শক্ত এবং যুদ্ধের জন্য স্থানটি উপযুক্ত। কিন্তু অবস্থান নেয়ার ফলে অবশেষে কী হলো?

রমজান মাসের ১৬ তারিখ দিনটি শেষ, মাগরিবের পর তারিখ বদলে গেল, অতঃপর ১৭ রমজান শুরু হলো। সেই রাতে মহানবি (সা.) এবং তার সাথিরা ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। অপর দিকে কাফেররাও তাদের ক্যাম্পে অবস্থান করছিল। ১৭ রমজানের এই বিশেষ রাতে আল্লাহতায়ালার নিকট সিজদায় পড়ে সাহায্য প্রার্থনা করছেন মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

তিনি কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘হে দয়াময় আল্লাহ! আগামীকালের নীতিনির্ধারণী যুদ্ধে তোমার সাহায্য আমাদের অতি প্রয়োজন। এই যুদ্ধে আমরা তোমার সাহায্য ছাড়া বিজয় লাভ করতে পারব না। আর আমরা যদি পরাজিত হই তাহলে তোমাকে সিজদা করার কিংবা তোমার নাম ধরে ডাকার লোক এই পৃথিবীতে আর নাও থাকতে পারে। অতঃপর তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো কী করবে। কারণ, তুমিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মালিক। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যাবো। আমরা আমাদের জীবন তোমার পথে উৎসর্গ করলাম। বিনিময়ে তোমার দ্বিনকে আমরা তোমার জমিনে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তুমি আমাদেরকে বিজয় দান করো। আমরা তোমার কাছে সাহায্য চাই’ (যুরকানি, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১৯ ও ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তোমাদেরকে জবাব দিলেন, আমি তোমাদেরকে এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করব যারা পরপর আসবে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৯৯)।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই দোয়া আল্লাহতায়ালা কবুল করলেন। ওই রাতে মরুভূমিতে প্রবল বৃষ্টি হলো। এই বৃষ্টি মুসলমানদের জন্য কল্যাণে পরিণত হল। কারণ, বৃষ্টির কারণে কাফেরদের যুদ্ধের মাঠের শক্ত মাটি কাদায় ভরে পিচ্ছিল হয়ে গেল। অপর দিকে মুসলমানদের বালুময় যুদ্ধের মাঠ শক্ত হয়ে গেল।

ঐ রাত্রেই আল্লাহতায়ালা তার প্রিয়নবি ও শ্রেষ্ঠনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুভ সংবাদ দিয়ে বললেন, তোমার অমুক অমুক শত্রু মারা যাবে এবং তারা অমুক অমুক জায়গায় মারা পড়বে। ঠিক তা-ই ঘটল। যখন যুদ্ধের সময় ঘনিয়ে এলো, তখন মহানবি (সা.) যে স্থানে বসে বসে প্রার্থনা করতেন সেই স্থান থেকে বের হয়ে এলেন এবং বললেন, শত্রু সেনাদল পর্যুদস্ত হয়ে যাবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পলায়ন করবে। আল্লাহ পাক এমনটিই করেছেন।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একনিষ্ঠ এবং প্রাণপ্রিয় সাহাবিরা এ যুদ্ধের পূর্বে এই কসমই খেয়েছিলেন যে, আমরা আপনার ডানে যুদ্ধ করব, আপনার বামে যুদ্ধ করব, আপনার সামনে যুদ্ধ করব, আপনার পিছনে যুদ্ধ করব এবং হে আল্লাহর রসুল! যে দুশমন আপনার ক্ষতি সাধন করতে এসেছে তারা আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আমাদের লাশের ওপর দিয়ে যাবে। হে আল্লাহর রসুল! যুদ্ধ তো একটা মামলি ব্যাপার। এখান থেকে কিছু দূরেই সমুদ্র, আপনি যদি হুকুম দেন যে, তোমরা তোমাদের ঘোড়া নিয়ে সেই সমুদ্রে ঝাঁপ দাও, তাহলে আমরা তৎক্ষণাৎ ঘোড়াসহ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব’ (ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১২)।

এ যুদ্ধে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদেরকে সাহায্য করেছিলেন তার ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা। বোখারি শরিফের হাদিস মোতাবেক, যুদ্ধের শেষে সাহাবিদের মধ্য থেকে কেউ কেউ সাক্ষী দিয়েছেন, আমরা সাদা পোশাক পরিহিত কিছু ব্যক্তিকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে দেখেছি। তাদেরকে আমরা যুদ্ধের আগে কখনো দেখিনি, এমনকি যুদ্ধের পরও দেখিনি। কেবল মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়ার বরকতেই এ যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয় লাভ করেছিলেন।

বিশ্বের বর্তমান অবস্থা খুবই ভয়াবহ, বিশ্ব যেনো আজ দ্রুত গতিতে এক ভয়াবহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে আজ আমাদের সবাইকে হৃদয় নিংড়ানো দোয়ার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

 তাই আসুন, আল্লাহপাকের দরবারে পবিত্র হৃদয় নিয়ে বিনয়ের সাথে এই দোয়া করি, হে দয়াময়! বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধাবস্থা চলছে তা থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করো আর জাতি, ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী সবাইকে তুমি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করো।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ। [email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।