সব কিছু ভেঙে পড়ছে কেন!

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:২৩ এএম, ১৫ আগস্ট ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক পক্ষকাল দেশে ছিলেন না। কত গুজব আর কত অস্থিরতা যে এই ক’টা দিন জাতি পার করল হিসাব নেই। গুজব এমন যে প্রধানমন্ত্রীকেও রেহাই দেয়নি। বলা যায় প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সামাজিক অস্থিরতা এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই মন্ত্রিসভার চলবে এটাই নিয়ম কিন্তু আমাদের সরকার ব্যবস্থা কতটা প্রধানমন্ত্রী নির্ভর সেটাও দেখা গেল এই ঘটনায়।

ডেঙ্গু মশার আক্রমণে বেশ কিছু লোক মরেছে এবং হাসপাতালগুলোর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীতে ভরে আছে। এক মেয়র এটাকে গুজব বলে চালাতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দেখে নিজেই নাজেহাল হয়ে গেছেন। তারা বিষয়টিকে গোপন করতে চেয়েছিলেন অথচ বিষয়টা জনস্বাস্থ্যের ব্যাপার আর এটি মহামারির আকার নিয়েছে। তাকে ঢেকে রাখার আর কোনো উপায় ছিল না। অনভিজ্ঞ লোক চেয়ারে বসলে এমন অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে। বোঝে না যে তাতে নিজের, দলের, সাধারণ মানুষের অবস্থা- সব কিছুই খারাপ অবস্থায় গিয়ে পৌঁছে, যেটি কারও জন্যই মঙ্গলজনক হয় না।

এক মেয়র নিজেই বলে ফেলেছেন ওষুধে মশা মরে না। আরেক মেয়র বলেছেন আমরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে রয়েছি। সিন্ডিকেটের নকল ওষুধে মশা মরে না। পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ রূপ নিল তখন মেয়রদের মুখ দিয়ে প্রকৃত সত্য বের হয়ে গেল। ন্যূনতম সততা ছাড়া একটা প্রতিষ্ঠান চলে কীভাবে! তেল বিক্রি, পার্টস বিক্রি থেকে আরম্ভ করে এমন কোনো আইটেম নেই যা বেচা বিক্রি হয় না। এগুলো সিন্ডিকেট করে অবাধে চলতে দিলে এমনিভাবে সিটি কর্পোরেশন অকার্যকর হয়ে যাবে। সিটি কর্পোরেশনে ঘুষ খায় না এমন কর্মকর্তা পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার।

এক গুজব রটনা হলো পদ্মা সেতুতে নরবলি দিতে হবে। বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিমদের বসবাস বেশি। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও হিন্দু ধর্মে বলির ব্যবস্থা আছে। আর বড় বড় স্থাপনা নির্মাণের সময় নরবলির প্রয়োজন হয় এমন একটা ধারণা প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষের রয়েছে। ফলে গুজবটা গতি পেয়েছে। ছেলেধরা বলে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এই গুজবে। উত্তর পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তসলিমা বেগম রেনু নামের এক মাকে উন্মত্ত লোকেরা ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারার ঘটনা সারা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকলে এটা হতো না। সরকার যথাসময়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় এটি গতি পেয়েছিল। আবার রেণুর ঘটনায় যখন সরকার তৎপর হয়েছে, ঘটনাও কমে আসছে।

কে কাকে কোনখানে ধর্ষণ করবে তা আগাম সংবাদ নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে থাকার কথা না। সুতরাং তাদের পক্ষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। অথচ গত কিছুদিন ধরে ধর্ষণের ঘটনা অব্যাহতভাবে চলছে। এমনকি থানা হাজতে ওসি আর তার সাঙ্গাতরা মিলে নিরপরাধ মহিলাকে ধর্ষণ করেছে এমন ঘটনাও ঘটেছে। খুলনা জিআরপি থানা হাজতে তিন সন্তানের জননীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে হালকা দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই।

ধর্ষণের সঙ্গে এখন নতুন এক উপসর্গ দেখা দিয়েছে যে ধর্ষণের পর মহিলাকে হত্যা করা। কোথাও কোথাও ধর্ষণ/বলাৎকার করে গলা কাটাও হয়েছে। মসজিদে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মহিলা ক্যাডেট মাদরাসায়ও ধর্ষণের ঘটনা চলছে। ওইসব মাদরাসার কয়েকজন কথিত অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যে যেখানে পারছে মাদরাসা খুলে ক্যাডেট মাদরাসার নামে ব্যবসায় নেমেছে। এই সব প্রতিষ্ঠান কারা চালাচ্ছে, কী শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, কী হচ্ছে এর অভ্যন্তরে- যেন দেখার কেউ নেই। শুধু কোনো অঘটন প্রমাণ পেলেই জনসম্মুখে আসছে। আর যারা এটা দেখার দায়িত্ব তারা ‘এই করব সেই করব’ বলে বাণী দিচ্ছেন।

দেশে ২৫ জেলায় বন্যা হয়েছে। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি। ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকে বলেছেন ফসল নষ্ট হওয়ার তিন লাখ টন খাদ্য ঘাটতি হবে। গত দুই মাসে ধর্ষণ, গুজব, ডেঙ্গু, বন্যা- এসব পরিস্থিতিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে সরকার। এ পরিস্থিতির উদ্ভব হলো কেন? এর নির্মূলের উপায় কী? দেশেতো বিরোধীপক্ষের কোনো মিছিল মিটিং নেই। সরকার একতরফাভাবে দেশ চালাচ্ছে। এরপর ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলো কেন!

আমরা দেখছি যে সমস্ত অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সমাজকর্মীরা করত। এতদিন তারাই সমাজটাকে নিয়ন্ত্রণ করত। স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মার্কা দেয়ায় তাদের মূল উৎপাটন হয়েছে। এখন সমাজে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই এখন সমাজে সর্বেসর্বা। তাতে করে রাজনৈতিক সংঘাত স্থানীয় পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। যে কারণে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মীদের গলাকাটা লাশের সংখ্যা বেড়ে গেছে।

আবার দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন উপজেলায় যারা এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তারা নিজ নিজ উপজেলায় আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে উদাসীন। বরং নিজের বিরোধীপক্ষকে খতম করতে গিয়ে তারা নিজেরাই আইনশৃঙ্খলা মানছেন না। ক্ষেত্রবিশেষ তিনি আর এমপি-ওসি-এসপি মিলে এলাকায় যা ইচ্ছে তাই করছেন। আগে এমপির কথা ওসি শুনত, এখন দেখি অনেক এমপি চলেন ওসির পরামর্শে। এমপির এলাকা চালাচ্ছে থানার ওসিরা। থানার দালালি করছে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতারা। সরকারি নানা ভূঁইফোঁড় সংগঠনের নেতারা থানাকে হাত করে চালাচ্ছে মাদক ব্যবসা।

গ্রামপর্যায়ে সমাজব্যবস্থা যেমন বদলে গেছে তেমনি সরকারি দলে কমে গেছে ত্যাগীদের মূল্যায়ন। প্রধানমন্ত্রী তার টানা তৃতীয় যাত্রায় নতুন নতুন লোকদের মন্ত্রী করেছেন। এত কঁচিকাচার মেলায় একটা শক্তিশালী মন্ত্রিসভার অনুপস্থিতি চোখে পড়ছে। সরকারি কর্মচারীরা অন্যায় করতে করতে এখন তাদের ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি লোপ পেয়েছে। সুতরাং বলতে হবে দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চাইলে খুবই কঠিন ভূমিকায় সরকারকে অবতীর্ণ হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী কিছু অভিজ্ঞ শক্তিশালী লোকজন নিয়ে নতুন করে মন্ত্রিসভা সাজাতে পারেন। আমি জানি না মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদকে কোন কারণে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়া হলো। তাদের পারফরমেন্স নিয়ে তো প্রশ্ন আসেনি। চৌদ্দ দলের রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুকে বাদ দেয়া কতটুকু কাজের কাজ হয়েছে মূল্যায়ন দরকার। নেতা হিসেবে এদের প্রতি দেশের মানুষের সমীহ রয়েছে। এদের কথাকে দেশের মানুষ গুরুত্ব দেয়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব গুরুতর কোনো অপরাধ না থাকলে অভিজ্ঞ লোকদের গুরুত্ব দিতে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দেশ পরিচালনার স্টাইল এক কেন্দ্রিকতা দিকে। প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই মন্ত্রিসভার চলবে এটাই নিয়ম কিন্তু মন্ত্রীদের মাঝে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে যাতে করে মন্ত্রীরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। সব মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে তো মন্ত্রীরা অকার্যকর হয়ে যাবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় মাওলানা আজাদ, জগজীবন রাম, মোরারজি দেশাই, মহাবীর ত্যাগী, রফি আহমেদ কিদোয়াই প্রমুখ বারবার মন্ত্রিসভায় থাকতেন কারণ অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। সর্বোপরি এরাই ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রবর্তী নেতা। সমগ্র ভারতের ওপর এদের প্রভাব ছিল। নেহরুর সঙ্গে এরা সব মিল সব বিষয়ে একমত ছিলেন তা নয়। একসঙ্গে দেশ চালাতে হলে ছোটখাটো বিরোধকে উপেক্ষা করতে হয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

বিএ/জেআইএম