দীক্ষা যখন কল্যাণমন্ত্রে, ব্রত যখন জনকল্যাণ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:২৪ পিএম, ০২ আগস্ট ২০২০

এম. নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের জন্য আগস্ট মাসটি মোটেও সুখের নয়। ১৯৭৫ সালের এই মাসে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাকাণ্ড দেশের উদারনৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাসম্ভব হয়নি এদেশের সচেতন জনমানুষের কারণেই। আর সেইঘটনার মাত্র ছয় বছরের মাথায় দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে যিনি ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন, তিনি তো আর কেউ নন, আমাদেরই অগ্রজা; জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা।

২০০৯ সাল থেকে তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল, বিশ্বের বিস্ময়। বিশ্ব যখন কাঁপছে করোনা আতঙ্কে, তখন তিনি সামনে থেকে বিপর্যয় রোধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।কোভিড-১৯ প্রতিরোধে নিয়েছেন সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েও সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করেছেন। তাঁর দৃষ্টি যে সমাজের সর্বস্তরে, তা নতুন করে প্রমাণিত হলো ছোট্ট একটি খবরে। খবরটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আবার যথেষ্ট গুরুত্ব রাখে। খবরটি কী, তা জানা যাক আগে। গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরে বলা হচ্ছে, “বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের চারটি গ্রাম জামশেদপুর, ধলীপাড়া, মাখরগাঁও ও আমতৈল মিলে ‘বৃহত্তর আমতৈল’গ্রাম নামে পরিচিত। সেখানে প্রতিবন্ধিতার হার সিলেটের সামগ্রিক হারের দ্বিগুণের বেশি।” এই রামপাশা ইউনিয়নের ৪৬১ জন প্রতিবন্ধীর জন্য জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং প্রতি পরিবারকে একটি লুঙ্গি ও একটি শাড়ি দিতে ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ঈদে প্রধানমন্ত্রীর উপহার নতুন কিছু নয়। গত ঈদুল ফিতরেও কোভিড-১৯ মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তখন সেই উপহার যাঁরা পাননি, তাদের হাতে সেই অর্থ পৌঁছাতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যে খবরটি নিয়ে আমরা কথা বলতে চাইছি, সেটা হচ্ছে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল ও আশপাশের গ্রামের ৪৬১ প্রতিবন্ধীদের খবর প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পর তিনি তাদের জন্য উপহার পাঠিয়েছেন। কিন্তু খবরের নেপথ্যে রয়েছে আরেকটি খবর। আর সেই খবরটি হচ্ছে, এক ইউনিয়নে চার শতাধিক প্রতিবন্ধী থাকার খবরটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনেন তাঁরই ছোটবোন শেখ রেহানা। নেপথ্যের এই খবরটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা থাকেন লন্ডনে। অথচ কী আশ্চর্য বড়বোনের মতো তাঁর দৃষ্টিও সবসময় দেশের দিকে নিবদ্ধ। চিরায়ত কল্যাণী শেখ রেহানার বৈশিষ্ট্য এটাই। মঞ্চে পাদপ্রদীপের আলো যেখানে পড়ে সে জায়গাটি জ্বলজ্বল করে। পাশেই অন্ধকার। সেই অন্ধকারেও এমন কেউ কেউ থাকেন, যাঁদের আলোয় মঞ্চ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সাদা চোখে সে আলোর বিচ্ছুরণ দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। তেমনই একজন মানুষ শেখ রেহানা, আড়ালচারিতা যাঁর বৈশিষ্ট্য। যে পরিবারে তাঁর জন্ম, সেখানে তাঁর ওপরও আলো পড়ার কথা। কিন্তু নিজেকে সে আলো থেকে সযত্নে শুধু নয়, সচেতনভাবেই সরিয়ে রেখেছেন তিনি। কিন্তু কেন? কারণ তাঁকে, যেন এক অন্তর্গত মানুষ হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, বড় বোন শেখ হাসিনার রাজনীতিতে যোগদান, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণতো তাঁকেও সমানভাবে আলোড়িত করবে- এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে রাজনীতির পথটিই তিনি বেছে নিতে দ্বিধা করবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সরল সমীকরণটি তিনি বিবেচনায় না এনে বেছে নিলেন আটপৌরে গার্হস্থ্য জীবন।

আপাতত এ চিত্রটিই উন্মুক্ত সবার সামনে।জগৎ-সংসারে এমন কিছু মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা নিজেদের নিয়ে কখনো উদগ্রীব হননি। আবার পাদপ্রদীপের আলোয় কখনো নিজেদের আলোকিত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আড়াল করে রেখেছেন সব কিছু থেকে। এমন নির্মোহ থাকা সবার জন্য সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাজনৈতিক আবহে যাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁদের পক্ষে নিভৃত জীবন কাটানো একেবারেই অসম্ভব বলেই মনে করা হয়। তবে নিতান্ত সাদামাটা জীবনে যাঁরা অভ্যস্ত, ক্ষমতা তাঁদের মোহভঙ্গের কারণ হতে পারে না কখনো। এমনই এক আড়ালচারী মানুষ শেখ রেহানা। আমরা যদি একটু আলাদা করে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ রেহানার অবদান একেবারে কম তো নয়ই, বরং উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতৃত্বের নেপথ্যে আরো একজনকে পাওয়া যায়, যাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া সাফল্য লাভ ছিল প্রায় অসম্ভব। শেখ রেহানা তেমনই একজন, যিনি সব সময় বড় বোনের পাশে থেকেছেন, তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন। প্রবাসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সব সময় তাঁকেই পেয়েছে কাণ্ডারি হিসেবে। প্রকৃতিই বোধ করি তাঁকে আদর্শ এক মানুষে পরিণত করেছে। অন্যদিকে কল্যাণমন্ত্রে যাঁর দীক্ষা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মানুষেরধর্ম’ যিনি ধারণ করেন হৃদয়ে, জনগণের সেবা যাঁর ব্রত, সেই অমৃতের সন্তান শেখ হাসিনা সামরিকতন্ত্র ও ‘কার্ফিউগণতন্ত্রে’র দেড় দশকের দুঃশাসন এবং গণতন্ত্রের নামে দুই দফায় এক দশকের অপশাসনের মূলোৎপাটন করে যিনি বাংলাদেশকে আজ নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। আজকের বাংলাদেশকে নিয়েতাই উচ্ছ্বসিত সারাবিশ্ব। একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশকে নিয়ে সংশয় ছিল সারা বিশ্বের। সেই অবস্থা থেকে আজকের উত্তরণে যিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি শেখ হাসিনা। আমতৈল গ্রামের বর্তমান প্রতিবন্ধী শিশুদের সুস্থতা এবং ভবিষ্যতে সুস্থ প্রজন্ম নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী সাতটি নির্দেশনা দিয়েছেন।

নির্দেশনাগুলো হচ্ছে:

১. গ্রামের সবপ্রতিবন্ধীর সমস্যা যথাযথভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ প্রতিবন্ধীভাতার আওতায় আনতে হবে।
২. স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাউন্সেলিং করা।
৩. নিজ বাসস্থানসহ আশেপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
৪. খাদ্যের সকল পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে ভিটামিন সাপিমেন্টারি ওষুধ সরবরাহ এবং সুপেয় পানির সুব্যবস্থা করা।
৫. গ্রামটিতে প্রয়োজনীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ সিস্টেম চালু এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে।
৬. প্রতিবন্ধীদের চাহিদা মোতাবেক বহুমাত্রিক শিক্ষাপ্রদানের ব্যবস্থা করে প্রতিবন্ধী স্কুল স্থাপন ও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করা।
৭. চাহিদামাফিক প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ

যেমন: হুইল চেয়ার, ট্রাইসাইকেল, হিয়ারিং ডিভাইস ও দৃষ্টিসহায়ক উপকরণ সরবরাহ করতে হবে।সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের ৪৬১ জনপ্রতিবন্ধীর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর গোচরে এনে শেখ রেহানা আবারও প্রমাণ করলেন, পাদপ্রদীপের আলোয় না এসেও দেশ ও মানুষের কল্যাণে যে অবদান রাখা যায়। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরিত্রের যে বিষয়টি সবার আগে দৃষ্টি কাড়ে তা হচ্ছে তাঁর গভীর প্রত্যয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণে তিনি সব সময় নিবেদিত। গভীর সংকটেও তিনি জনগণের কল্যাণ চিন্তা করেন। কল্যাণমন্ত্রে দীক্ষা যাঁদের, জনকল্যাণকে ব্রত করেই তাঁরা পথ চলবেন, এটাই স্বাভাবিক।

লেখক: সভাপতি, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক।

এইচআর/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]