৫৬ কোটির ট্রাক চালকদের আধুনিক বিশ্রামাগার এখন ‘গরুর খোঁয়াড়’

এম এ মালেক
এম এ মালেক এম এ মালেক , জেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ১১:১৯ এএম, ২০ মার্চ ২০২৬

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের ক্লান্তি দূর ও দুর্ঘটনা রোধে নির্মিত হয়েছিল একটি আধুনিক বিশ্রামাগার। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে আজও চালু হয়নি ৫৬ কোটি টাকার এই বিশাল স্থাপনা। ফলে মহাসড়কের পাশেই অনিরাপদ অবস্থায় বিশ্রাম নিতে হচ্ছে চালকদের, আর অব্যবহৃত পড়ে থাকা এই আধুনিক কমপ্লেক্সটি এখন স্থানীয়দের গরু-ছাগল রাখার স্থানে পরিণত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৯ সালে চার মহাসড়কে চারটি বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সেই প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২১ মে থেকে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫৬ একর জায়গায় নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ওই বছরের ১৫ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। যার ব্যয় ছিল ৪২ কোটি ৮০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। পরবর্তীতে আরও ১৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।

সিরাজগঞ্জ সওজ বিভাগ জানায়, শুরুতে নকশা অনুযায়ী বিশ্রামাগারটি দোতলা করার কথা ছিল। সেটা অনুযায়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ করছিলেন। কিন্তু প্রকল্পের শেষ সময়ে আরও দুই তলা বাড়িয়ে চারতলা করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এটি চালু হলে পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও নিরাপত্তাকর্মীরা বাড়তি দুই তলা ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড, রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড ও মের্সাস সাগর বিল্ডার্স যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছেন।

এদিকে পণ্যবাহী গাড়িচালকদের জন্য পার্কিং সুবিধাসংবলিত বিশ্রামাগার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। বিশ্রামাগার ইজারা বা অপারেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (ওঅ্যান্ডএম) ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। আবার বিভাগীয় পদ্ধতিতেও পরিচালনা করা হতে পারে। ইজারা দেওয়া হলে কম-বেশি তিন বছরের চুক্তি হতে পারে। অপারেটর নিয়োগ দিলে তা হবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রেও তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হব।

সওজ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নির্মিত এই বিশ্রামাগারে পণ্যবাহী চালক ও সহকারীরা নির্ধারিত সেবামূল্য পরিশোধ করে সেবা নিতে পারবেন। সেবা গুলোর মধ্যে রয়েছে ১০০ ট্রাক পার্কিং, দ্বিতল শয়নকক্ষে চালক ও সহকারীর রাত্রিযাপন, গাড়ি পার্কিং, বিনোদন পয়েন্ট, ক্যান্টিন, গোসলখানা, নামাজের জায়গা, প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা কক্ষ, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ, ওয়াশজোন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সবুজায়ন ও নিরাপত্তা, প্রাচীরের মধ্যে সীমিত আকারে খেলার সু-ব্যবস্থা।

রংপুরগামী ট্রাক চালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের যখন ঘুম আসে তখন রাস্তার সাইডে গাড়ি রেখে ঘুমাই। রাস্তার সাইডে রাখলে অনেক সময় মালামাল চুরি ও ডাকাত এসে ধরে। অথচ রাতে যদি বিশ্রামাগারে ঘুমের ব্যবস্থা থাকে তাহলে এমন ঝুঁকি আর থাকবে না। নিরাপদে গাড়ি চালানো যাবে। তার দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্রামাগারটি চালু হলে তারা উপকৃত হবেন।

সিরাজগঞ্জ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সরকারি সহকারী কৌঁসুলি (এপিপি) নাসির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, দিন ও রাতের ক্লান্তি নিয়েই চালকরা গাড়ি চালান, কিন্তু বিশ্রামের জন্য নেই নিরাপদ জায়গা। তাই বাধ্য হয়ে থামেন সড়কের পাশে। ঝুঁকির মুখে পড়ে মালামাল ও যানবাহন।

তিনি বলেন, পরিবহন চালকদের আইনের কর্মঘণ্টা একদমই মানা হয় না। যার ফলে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে শারীরিক ক্লান্তি, যেমন-ঘুম আসা, অবসন্নতার কারণে। সে জন্য বিশ্রামাগার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। তবে কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যানবাহন মালিকদের এবং সরকারকে সেটি মনিটর করতে হবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাগর বিল্ডার্সের নির্বাহী পরিচালক বাপ্পি সমদ্দার জাগো নিউজকে বলেন, করোনার কারণে দু-দফায় কয়েক মাস প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। তবুও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে কয়েকবার ডিজাইন পরিবর্তন হওয়ায় সাবস্টেশন ভবন নির্মাণও কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল।

মেসার্স সাগর বিল্ডার্সের প্রকল্প ম্যানেজার শফিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্রামাগারের মূল কাজ নির্দিষ্ট সময়েই সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বর্ধিত করার পর কিছু কাজ বাকি ছিল। সেগুলোও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমরান ফারহান সুমেল জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের দেশে এই প্রকল্পটি প্রথম। ফলে এটির লিজ ও কীভাবে আমরা চালাবো সেটা নিয়ে একটু কনফিউশন আছে। এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করা যায়, দ্রুত সময়ের মধ্যেই বিশ্রামাগারটি চালু করা হবে।

এম এ মালেক/কেএইচকে/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।