ভারত নির্ভরতা : প্রসঙ্গ চিকিৎসা সেবা

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:১৪ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

কথায় কথায় আমরা ভারতের নানা সমালোচনা করি, কিন্তু ভারতের উপর আমরা অনেক বিষয়ে এখনো মুখাপেক্ষী সেটা দৃশ্যমান। সেটা নিয়ে আমাদের কোনো লজ্জা শরম নেই। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। যখন এই ঘোষণা প্রকাশ পায় তখন বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজারে আগুন লাগে, তারপর থেকে প্রতিদিনই বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। এক সময় কুরবানির গরুর জন্য আমরা ভারতের মুখাপেক্ষী ছিলাম। সেই নির্ভরতা গত ক’বছরে কাটিয়ে উঠছি। ভারতীয় গরু কুরবানির জন্য মানুষ কিনতে চায় না এখন। এমনকি ভারতীয় পেঁয়াজও বাংলাদেশিদের পছন্দ নয়, তাদের পছন্দ দেশি পেঁয়াজ। কিন্তু ভারতীয় পেঁয়াজ বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে।

ভারতীয়রা বাংলাদেশিদেরকে খোঁটা দেওয়া নিয়ে গত সপ্তাহ লিখতে গিয়ে কলকাতায় বাংলাদেশিদের কেনাকাটা সম্পর্কে লিখেছিলাম। ভারতীয়দের আরেক খোঁটার বিষয় বাংলাদেশিদের ভারতে চিকিৎসা সেবা নিতে যাওয়া। বিদেশি ভ্রমণকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা যেমন ভারতে প্রথম স্থান দখল করে আছে, তেমনি চিকিৎসার জন্য বিদেশি হিসেবে ভারতে শীর্ষস্থানে বাংলাদেশিরাই। লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রতিবছর সেখানে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর ভেলোর, মাদ্রাজ; তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদ; কর্ণাটকের ব্যাঙ্গালোর এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় তারা চিকিৎসার জন্য ছোটেন। ভিসা জটিলতা কমে যাওয়ায় অনেকে এখন অল্পস্বল্প রোগের জন্যও শিলিগুড়ি কিংবা আগরতলায় চলে যান ডাক্তার দেখাতে।

কেন এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে চিকিৎসার জন্য যান? সেটা কি আর্থিক সঙ্গতি বেড়ে যাওয়ায় নাকি জীবনের প্রয়োজনে, চিকিৎসার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে যান! আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতে চিকিৎসার জন্য কখনো যাইনি। লাগাতার ওষুধ না খেয়ে গ্যাস্টিক কমাতে চাই আমি। এর জন্য একবার যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও চিকিৎসার জন্য আলাদা ভিসা নিতে হয়, সেই বিরক্তির কারণে যাওয়া হয়নি। অবশ্য পরে ভারত সরকার সেই নিয়ম-রীতি প্রত্যাহার করেছে। কারণ দেখা গেল যে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশি রোগীরা টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, আবার কলকাতার হাসপাতালগুলো আইনের কড়াকড়িতে তেমন বাংলাদেশি রোগী পাচ্ছিল না। সেই প্রেক্ষিতে ভারত সরকার বছরখানেক আগে মেডিকেল ভিসার এই আইন প্রত্যাহার করেছে। এখন যে কোনো টুরিস্ট ভারত গিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে পারে।

বাংলাদেশি রোগীদের মধ্যে যারা ভারতে চিকিৎসা নেন তারা নির্দ্বিধায় বলেন যে, তারা ভারতীয় চিকিৎসকদের কাছে যতটা চিকিৎসা পান তার চেয়ে বেশি পান সান্ত্বনা, দিক-নির্দেশনা। ভারতীয় ডাক্তাররা রোগীকে সান্ত্বনা দিতে পারেন এবং ভালো ব্যবহার করেন। যেটি বাংলাদেশি ডাক্তারদের কাছে তারা পান না বলে অভিযোগ। আরেকটা অভিযোগ, এখানকার ডাক্তাররা মনোযোগ সহকারে রোগী দেখেন না। সেটি সরকারি হাসপাতাল হোক আর বেসরকারি হাসপাতাল হোক- সর্বত্র একই চিত্র। সার্বিকভাবে বলতে গেলে বাংলাদেশি রোগীদের মধ্যে যারা ভারতে চিকিৎসা নেন, তাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা ব্যয় কম না হলেও চিকিৎসাসেবা কয়েকগুণ ভালো। হাসপাতালগুলো পরিচ্ছন্ন। বাংলাদেশে তা কল্পনাও করা যায় না। সরকারি হোক আর বেসরকারি হোক- এখানকার হাসপাতাল অপরিচ্ছন্ন থাকে।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা রোগী দেখার জন্য সময় করে রাউন্ডে যাবেন, সেটা এখানে বিরল। সরকারি হাসপাতালগুলোর এই বেহাল অবস্থা কখনোই কাটবে না। কারণ বাংলাদেশের সিস্টেমের মধ্যে গলদ রয়েছে। এখানে ডাক্তাররা স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা। তারা বরাবরই ধরে নিয়েছেন যে মেধা এবং পরিশ্রমে ছাত্রজীবনে তারা সবার থেকে সেরা প্রমাণ দিয়ে এসেছেন। তারাও একটা ক্যাডার। সুতরাং তাদের কেন অন্যেরা নিয়ন্ত্রণ করবে! বাংলাদেশি সিস্টেমে ডাক্তারদের অবহেলা দেখার জন্য আছে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হাসপাতালগুলো পরিচালনার জন্য প্রশাসন অগ্রাধিকার পেলেও বাংলাদেশ এটিও মানা হয় না। এখানে সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি থাকেন এমপি-মন্ত্রীরা। সরকারি হাসপাতালগুলো বা বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দুরবস্থার দেখার কথা সিভিল সার্জনের। কিন্তু সিভিল সার্জন কয়টি হাসপাতাল এবং কয়টি ক্লিনিক দেখেছেন বা দেখেন সেটা তো এই কোভিডকালে আমরা আরো ভালো করে দেখলাম। করোনা চিকিৎসা দেওয়ার মতো অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা-সুবিধা ডাক্তার না থাকলেও ভুয়া হাসপাতালগুলোকে করোনা চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

হাসপাতালগুলোর অনিয়ম দেখার কথা সিভিল সার্জনের। তিনি যদি না পারেন তখন উনি পুলিশ-র‌্যাব আরো যারা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন, তাদের সহযোগিতা নেবেন। সিভিল সার্জন সাহেবরা অকেজো হয়ে আছেন বলেই এখন যখন কোনো ম্যাজিস্ট্রেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে অভিযান চালান, সেটা নিয়ে বিতর্ক করছেন। আবার চিকিৎসা ক্যাডারের লোকদের, এমনকি হাসপাতালগুলো থেকেও অভিযান নিয়ে আপত্তি আছে। তারা বলছে, হুটহাট করে ম্যাজিস্ট্রেট চলে আসেন, তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেন না। যথাযথ জবাব দিতে পারেন না। এখন কথা হচ্ছে সিভিল সার্জন সাহেব যদি এই হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো নিয়মিত ভিজিট করতেন, অনিয়ম দূর করতেন- তাহলে তো অভিযোগ নিয়ে কাউকে র‌্যাব বা পুলিশের দ্বারস্থ হতে হতো না।

বাংলাদেশি ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগ সেটা আগেই বলেছি। তারা সুচিকিৎসা দিতে পারেন না। তারা এই উপলব্ধি করেন না যে তাদের হাতে ওই রোগীর পরিজনেরা তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তুলে দিয়েছেন। তাদের হাতে ভালো হবে এই আশায়। কিন্তু তারা অনেকে জানতেই পারেন না কী ট্রিটমেন্ট ডাক্তাররা দিচ্ছেন। ফলে ডাক্তার এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে এখানে অসন্তোষ চলমান ঘটনা। যেটা বাংলাদেশি রোগীদের ভাষ্যমতে বিদেশে তারা দেখেন না। বিদেশে নার্স বা ডাক্তাররা এরকম আত্মীয়-স্বজন উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে, খোঁজ নিলে- যথাযথভাবে তাদেরকে স্যাটিসফাই করেন। সান্ত্বনা দেন, পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশি চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অন্তরায় হচ্ছে মেডিকেল রিপোর্ট। ভারতে চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে বাংলাদেশ থেকে মহাউন্নত হয় তা নয়, কিন্তু বাংলাদেশের মতো অহরহ পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া হয় না। বাংলাদেশে অনেক বায়োকেমিস্ট দেখেন না, কী রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে তার নামে। কিন্তু রিপোর্টে তাদের সিল, নাম থাকে। ভারতীয় ডাক্তাররাও বলেন যে, বাংলাদেশে বিভিন্ন রোগীর মেডিকেল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যে রোগ নির্ণয় করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তার উল্টো হয়েছে। মোটকথা এখানকার ডায়াগনোসিস বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। অভিজ্ঞ লোকের অভাব আছে এই সেক্টরে।

বাংলাদেশি রোগীরা ভারতে না যাওয়ার কারণে নিঃসন্দেহে ভারতীয় হাসপাতালগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের রোগীরাও কিন্তু এখন চিকিৎসা নিতে পারছে না লকডাউনের কারণে। ফলে শুধু বাংলাদেশি রোগী বঞ্চিত হচ্ছে বলে তারা ভাতে মরে যাচ্ছে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের বিভিন্ন হসপিটালে সেবা-যত্ন আলাদাভাবে দিতে অনেক জায়গায় বাংলাদেশ ডেস্ক আছে। ওই সমস্ত ডেস্কগুলোতে যারা চাকরি করতো সাময়িকভাবে হয়তো তারা চাকরিচ্যুত হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি যে সবকিছুই আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বাংলাদেশিরা আবার কলকাতায় বাজার করতে যাবে। মাদ্রাজে চিকিৎসা নিতে যাবে। তবে কবে যাবে সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বোধহয় আমরা কেউই বলতে পারি না। ভারত দু’দেশের যাত্রীদের জন্য একান্ত বিমানসেবা চালু করতে অনুরোধ করলেও সেটা চালু হতেও সময় লাগবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশে চিকিৎসাখাতে বিনিয়োগ কম নেই। অনেক বিশেষায়িত হাসপাতালও গড়ে উঠেছে, কিন্তু চিকিৎসা সেবার মান বাড়বে কবে! রোগীরা কবে আস্থা ফিরে পাবে বাংলাদেশের হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ডাক্তার-নার্সদের উপর। বাংলাদেশ কবে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিদেশি মুখাপেক্ষী না থেকে আত্মনির্ভর হবে!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]