শৃঙ্খলা চাই, শৃঙ্খল নয়

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১২:৩৯ পিএম, ০১ মার্চ ২০২১

কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি আবার আলোচনায় এসেছে। দাবি উঠেছে আইনটি বাতিলের। অবশ্য ২০১৮ সালে আইনটি প্রণয়নের আগে-পরে সাংবাদিক, সুশীল সমাজ গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবল প্রতিবাদ হয়েছিল। সাংবাদিকদের সবগুলো সংগঠন আইনটি এভাবে প্রণয়ন না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সম্পাদক পরিষদ সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ধারার ব্যাপারে তাদের মতামত দিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তাদের কথা শুনেছেন, কিন্তু আমলে নেননি। সব মহলের প্রতিবাদ সত্ত্বেও আইনটি পাস হয়ে গেছে। তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা আশ্বাস দিয়েছিলেন, আইন মত প্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায় হবে না, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু তারা তাদের আশ্বাস রাখেননি, বরং সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন সাংবাদিকতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ঢালাও অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রবল প্রতিবাদ হয়। প্রতিবাদের মুখে আইনটি বাতিল করে নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। আইন বদল হলেও স্বস্তি মেলেনি। নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢালা হয়েছে শুধু। এখন দেখা যাচ্ছে, মদটা পুরোনো হলেও আগের চেয়ে বেশি কড়া। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিষয়গুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ এই চারটি ধারায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। কৌশলটা ভালো। একসঙ্গে দেখতে যতটা ভয়ঙ্কর লাগে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেলে ততটা লাগবে না। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়ঙ্কর ৩২ ধারা। নতুন আইনের ৩২ ধারাটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মত প্রকাশের বড় বাধা হয়ে আছে। গত দু্ই বছরে বারবার প্রমাণিত হয়েছে এ আইনটি কালো আইন এবং সংবিধান স্বীকৃত মত প্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায়। লেখক মুশতাক আহমেদ জীবন দিয়ে আইনটির ভয়াবহতা আবার চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিল। কারাগারে একজন মানুষের মৃত্যু হতেই পারে। এমনকি মুক্ত থাকলেও তিনি মারা যেতে পারতেন। কিন্তু ৯ মাসে ছয়বার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। যে মামলায় মুশতাক আহমেদ এবং কার্টুনিস্ট কিশোরকে আটকে রাখা হয়েছে; তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের জ্বলন্ত উদাহরণ।

এই যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এত লম্বা লম্বা বক্তৃতা, এত বড় বড় আইন; সংবিধানে কিন্তু অল্প কথায় শর্তসাপেক্ষে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচণা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে, ক. প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং খ. সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার, নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এইটুকু মানলেই তো হয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দরকার হয় না। এখন একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে, সংবিধান বড় না ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বড়? মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে কিন্তু যা ইচ্ছা তাই বলা নয়। সংবিধানেও শর্তসাপেক্ষেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

নানা কৌশলে, নানা আইনে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা হয় বটে। তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে আমি একেবারে হতাশ নই, আবার উৎফুল্লও নই। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে যে সিনিয়র সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় প্রশ্ন না করে দলীয় কর্মীর মতো প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেন, সেটা তো প্রধানমন্ত্রীর দায় নয়। বর্তমান সরকার অনেকটাই একতরফা। সংসদে বিরোধী দল গৃহপালিত, রাজপথে বিরোধী দল নেই। এ অবস্থায় গণমাধ্যমই গণমানুষের মত প্রকাশের একমাত্র খোলা জানালা। প্রতিদিন রাতের টক শো হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র চর্চার একমাত্র উপায়। এখন এই খোলা জানালা কতটা খোলা থাকবে, কতটা মুক্ত হাওয়া আসতে পারবে; তা যতটা সরকারের ওপর তারচেয়ে বেশি নির্ভর করছে গণমাধ্যমের ওপরও। বাংলাদেশের গণমাধ্যম কী পুরোপুরি স্বাধীন? এই প্রশ্নের উত্তর, না। বাস্তবতা হলো সরকার যতটা আশা করে, গণমাধ্যম তারচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত। আসলে গণমাধ্যমে একধরনের স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ আছে, আছে দলীয় আনুগত্য প্রমাণের প্রতিযোগিতায়। এই স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণের দায় তো সরকারের নয়, গণমাধ্যমের। সরকার তো এতে আনন্দিত হওয়ার কথা। তারা নিশ্চয়ই সাংবাদিকদের ডেকে সরকারের বিরোধিতা করার পরামর্শ দেবে না। স্বাধীনতাটা সাংবাদিকদের আদায় করে নিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়তে হবে। সেখানেই আমাদের সীমাবদ্ধতা। আমরা যেন নিয়ন্ত্রিতই থাকতে চাই।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে কিন্তু শুধু সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার নয়। মতপ্রকাশের অধিকার সবারই আছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে দেশের যে কোনো নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। আর এখন সাংবাদিকতার ধারণা এবং ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিটিজের জার্নালিজমের ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। সবার হাতেই এখন ক্যামেরা। সবাই কোনো না কোনোভাবে তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। গণমাধ্যম তো স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রিত, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের গ্যাড়াকলে ফেলে যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে তো সরকারের পোয়াবারো। আমরা রাজনীতি নিয়ে কোনো নিউজ করবো না, কোনো নিউজ শেয়ার করবো না, কোনো স্ট্যাটাস দেবো না, কোনো স্ট্যাটাসে মন্তব্য করবো না, লাইক দেবো না। ব্যস, তাহলেই সব ফকফকা। ফেসবুক হবে ফুল-ফল, লতাপাতাময়। আমরা কুমির চাষের সম্ভাবনা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ স্ট্যাটাস দেবো। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবো। তাহলেই আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে না। কেউ গ্রেপ্তার হবে না, কেউ কারাগারে মারাও যাবে না।

এই যে সবার হাতে হাতে ক্যামেরা, ফেসবুক, ইউটিউব। এই যে সবাই সাংবাদিক বনে যাচ্ছেন, তথ্য প্রচার করছেন। এই প্রবণতটা কিন্তু বিপদজনক। মূলধারার গণমাধ্যম যতই সরকারের অনুগত হোক, তাদের কিন্তু দায়িত্বশীলতা আছে। বস্তুনিষ্ঠতা এবং কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতেই হয়। কিন্তু ফেসবুক যেন আমাদের যেমন ইচ্ছা লেখার কবিতার খাতা। কারো মত আমার সাথে মিলুক না মিলুক, তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানেই যা ইচ্ছা তাই লেখা নয়। অন্তত সংবিধান মেনে আমার মত যেন, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচণা’ না দেয় তা নিশ্চিত করাটা জরুরি। কিন্তু আমরা কিছুই মানতে চাই না। রাজনীতিবিদরা যেমন সরকার আর রাষ্ট্রের পার্থক্য গুলিয়ে ফেলে। আমরাও তেমনি লেখার সময় কোনো কিছু মাথায় রাখি না। ইন্টারনেটের বিশাল জগতে কত রকমের ফাঁদ পাতা আছে, তার ইয়ত্তা নেই। বিশেষ করে নারীদের কতরকম ভাবে হেনস্থা করা হয় তার কোনো লেখাজোকা নেই। প্রধানমন্ত্রী শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে ঠিকই বলেছেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা যেহেতু করেছি। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটাও আমাদেরই।‘আমি তার সাথে ষোলোআনা একমত। ইন্টারনেটে নানা ধরনের হেনস্থা থেকে মানুষকে বাঁচাতে, বিশেষ করে নারীদের রক্ষা করতে; ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা অনলাইন থেকে মানুষকে বাঁচাতে, হলুদ সাংবাদিকতার কবল থেকে সাধারন মানুষের মান-সম্মান রক্ষা করতে একটা আইনী সুরক্ষা থাকা দরকার। কিন্তু ঘটেছে উল্টো ঘটনা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হয়ে উঠেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করার প্রধান হাতিয়ার। মানুষকে বাঁচানোর বদলে হয়রানি করছে বেশি। কোনো আইনী সুরক্ষা না থাকলে, ভার্চুয়াল জগতে মানুষের হয়রানি, অপরাধ বাড়তেই থাকবে। সমস্যাটা হলো আপনি ছুরি কিনেছেন অপারেশন করবেন বলে, কিন্তু সেই ছুরি যখন ব্যবহৃত হয় ছিনতাইয়ের কাজে; তখন আপনার মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হয়। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা স্বর্গ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে কোনো একটা কিছু করি; কিন্তু স্বর্গটা আর পাই না, পড়ে থাকে উপসর্গগুলো। যে আইন হওয়ার কথা রক্ষাকবচ, সেটাই হয়ে গেল মতপ্রকাশের গলার ফাঁস।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগ হচ্ছে বেশি। ইউটিউবে ওয়াজের নামে যা প্রচার হচ্ছে, তাতে প্রতিদিন ডিজিটাল আইনের সুরক্ষা দরকার। কিন্তু কোনো ওয়াজের বিরুদ্ধে কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ দেখিনি। অপপ্রয়োগ হয়, সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনো সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। সরবার যে আইন করেছিল জনগণের সুরক্ষা এবং নিজেদের ভাবিমূর্তি রক্ষায়; সেটাই এখন হয়েছে জনগণের কণ্ঠরোধ এবং সরকার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আমরা শৃঙ্খলা চাই বটে, কিন্তু শৃঙ্খল চাই না মোটেই।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে সরকার যে ভয়ের আবহ তৈরি করতে চাচ্ছে, ভিন্নমতকে দমন করতে চাচ্ছে; এই ডিজিটাল বাংলাদেশে সেটা আর সম্ভব নয়। সত্য চেপে রাখার চেষ্টা নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই জনগণের কাছে যেতে হবে। ভয় দেখিয়ে যে জয় করা যায় না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে সাধারণে যে ধারণা হয়েছে, তাতে এই আইনটির দায় বয়ে বেরানোর আর কোনো মানে হয় না। অবিলম্বে এই আইনটি বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি।

এইচআর/জেআইএম

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা আশ্বাস দিয়েছিলেন, আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায় হবে না, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু তারা তাদের আশ্বাস রাখেননি, বরং সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]