স্যালাইনের সংকট ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

ড. মো.শফিকুল ইসলাম
ড. মো.শফিকুল ইসলাম ড. মো.শফিকুল ইসলাম , সাবেক সভাপতি-শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০৯:৩৪ এএম, ০১ অক্টোবর ২০২৩

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এক আতঙ্কের নাম। এ বছর ইতোমধ্যে সাড়ে ৮শরও বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আমাদের দেশে মারা গেছেন। প্রায় দুই লাখ মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিজের ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন এরচেয়েও ৬ গুণ বেশি রোগী। ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের প্রধান চিকিৎসা হিসেবে আইভি ফ্লুইড বা স্যালাইন হওয়ায় এর চাহিদা বেড়েছে অনেকগুণ, যা অতীতের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। এমনকি শিশুদের টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে। যে স্যালাইন ৮০ টাকায় পাওয়া যেত তা এখন বাজারে ৪০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। ডেঙ্গুর কারণে দেশে হঠাৎ করে স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ গুণ।

কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেক আগেই থেকেই পরিকল্পনা নেওয়া উচিত ছিল। যদিও এ সংকট নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ ইতিমধ্যে সরকার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। সেজন্য স্যালাইন আমদানির লাইন চলমান রাখতে হবে। এরই সাথে সাথে আমাদের সরকারি ওষুধ প্রতিষ্ঠানকে আরও বেশি স্যালাইন উৎপাদন করার জন্য জোর তাগিদ দিতে হবে। অর্থাৎ সহজেই এই সংকট থেকে উত্তরণ হওয়া সম্ভব হবে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ভারত থেকে ৫৩ হাজার ব্যাগ স্যালাইন দেশে এসেছে। সংকট মোকাবিলায় আমদানি করা স্যালাইন বড় ভূমিকা রাখবে ও কম মূল্যে তা কিনতে পারবেন রোগীরা। সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ডেঙ্গুর কারণে মানুষ জীবন নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এই সংকটে আমরা দিন দিন হতাশ হচ্ছে। আর এ হতাশা এবং দুশ্চিন্তা থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ভূমিকা রাখতে পারে সিটি করপোরেশনের বা পৌরসভার মেয়ররা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই মেয়র এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অন্য জেলার মেয়ররা কি করছেন সেটা নিয়ে মানুষের কাছে নানা রকমের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের পদক্ষেপ যথেষ্ট মনে হচ্ছে না।

গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শুনতে পাই তাদের নিয়ে নানা সমালোচনা। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ডেঙ্গু প্রতি বছর হানা দেয়। সেজন্য আমাদের কি করণীয় তা ভাবা উচিত। যেসব মাসে মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়,সে সময় স্যালাইনের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অনেক পূর্বে নির্দেশনা দিতে হবে। ডেঙ্গুতে বাংলাদেশ এক কঠিন সময় অতিবাহিত করছে। কখন এই ডেঙ্গু সমাপ্তি হবে এটা নিয়ে মানুষ চিন্তিত। তারপরও ডেঙ্গু থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য সরকার প্রধান নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন।

তিনি বিভিন্ন খাতে নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন-যেমন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নানা রকম তৎপরতা। এর মধ্যে ওষুধ ছিটানো, সরকারি অফিসের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল, বিনামূল্যে অ্যারোসল বিতরণ, তারকাদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান করে জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয় বলে অনেকেই মনে করেন। কেন মেয়ররা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। এটা বড় প্রশ্ন।

তবে চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কমিউনিটি ক্লিনিকও গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসা সেবায় ভালো কাজ করছে। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক মডেল তৈরির জন্য জাতিসংঘ স্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করেছে ব্রাউন ইউনিভার্সিটি, যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী দিনরাত দেশের মানুষের সেবা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। যদি তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর মতো তৎপর থাকতো তাহলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হতো। তাঁদের মধ্যে রয়েছে নানাবিধ অব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীনতা, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত পেয়েছে। সেজন্য সরকারকে দ্রুত আরও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; যাতে ভবিষ্যতে মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ না করেন। এজন্য চিকিৎসা সেবা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু রাজধানী নয়, স্যালাইনের সংকট দেখা যাচ্ছে জেলা সদর হাসপাতালেও। ডেঙ্গুর প্রকোপ হলেও শুরুর দিকে স্যালাইন দিতে সক্ষম হলেও কয়েকদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না সরকারের এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। ফলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো থেকে বেশি দামে কিনে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এ বিষয়টি মানে-স্যালাইন সংকট, এটা কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না বা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না সেই বিষয়ে সরকার থেকে তদারকি বা তদন্ত হওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডেঙ্গু এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এতদিন রাজধানীতে ডেঙ্গু থাকলেও এখন তা গ্রামেও ছড়িয়েছে। ফলে অতীতের তুলনায় স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে অনেক বেশি, যা পূরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে সরকারিভাবে স্যালাইন উৎপাদন বাড়াতে হবে। এতে চাহিদা যেমন পূরণ হবে, সাশ্রয় হবে সরকারি অর্থ এবং বাড়বে দেশের সক্ষমতা।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের মতো আরও অনেক হাসপাতালকে দায়িত্ব দিতে হবে যেন ডেঙ্গু রোগী পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা পায়। জনসাধারণের ভূমিকাও সর্বদা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা সাধারণত সচেতন নই। পরিবেশ দূষণ করি, ড্রেনে পলিথিন এবং অন্যান্য আবর্জনা ফেলে ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করি। অতীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার কারণ ছিল দীর্ঘকালীন বর্ষা ও গরম, সচেতনার অভাব, পরিকল্পনার অভাব, একই কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, জরিপের ফলাফল আমলে না নেওয়া, কারিগরি ও সক্ষমতার অভাব ইত্যাদি অন্যতম।

অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু চিকিৎসার নামে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। ভুয়া বিলের মাধ্যমে অবৈধ মুনাফা করছে হাসপাতালগুলো। এছাড়া মুমূর্ষু রোগী নিয়ে স্বজনরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। তবে চাহিদার তুলনায় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা কম থাকায় ৯০ শতাংশ রোগী বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন। এ অসহায়ত্ব পুঁজি করে বেসরকারি হাসপাতালের মালিক ও একশ্রেণির অসাধু চিকিৎসক রীতিমতো গলাকাটা ব্যবসা করছে। আইসিইউ ব্যয় মেটাতে গিয়ে রোগীর স্বজনের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা এবং মনিটরিং জরুরি দরকার।

এই অসাধু ও প্রতারক লোকেরা কীভাবে ব্যবসা করে তা নিয়ে সমাজে নানা কথা চলমান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়ে নাগরিক সমাজে নেতিবাচক মন্তব্য রয়েছে এবং এদের কার্যক্রম মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি বলে মনে করি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। যাতে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা না থাকে। যারা চিকিৎসা ব্যবস্থায় সংযুক্ত থেকেও প্রতারণার সঙ্গে যেভাবেই জড়িত থাকুক না কেন সবাইকে চিহ্নিত করে বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেক অব্যবস্থাপনা হলো দেশে ১৫ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে যার মধ্যে প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ চলছে অবৈধভাবে। এর মানে সেগুলোর বৈধ লাইসেন্স নেই। যাদের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, তাদের ওপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা তেমন চোখে পড়ছে না।

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে কয়েকটি কমিটি গঠন করা জরুরি। আমার বিশ্বাস, এ কমিটি স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি শনাক্ত করে বিচারের ব্যবস্থা করবে, যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। দুর্নীতিতে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি এক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক,হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

এইচআর/ফারুক/এমএস

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে কয়েকটি কমিটি গঠন করা জরুরি। আমার বিশ্বাস, এ কমিটি স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি শনাক্ত করে বিচারের ব্যবস্থা করবে, যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। দুর্নীতিতে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি এক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।