পুলিশ যখন জনগণের প্রতিপক্ষ
বুমেরাংয়ে বিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বুমেরাং শব্দটির মানে খুঁজতে চায় না ক্ষমতালোভী রাজনীতি। এ ধারার রাজনীতির পরিচালকদের কাছে ‘দূরদর্শিতা’ শব্দটিও অচেনা বা এসব শব্দ আমলে রাখতে চান না। তাদের একটিই আদর্শ ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও।’ তবে এসব নগদ নারায়ণে সংকট থাকে। ভবিষ্যতের পুঁজি থাকে না বলে হঠাৎ নগদের ধন ফুরিয়ে গেলে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে পথে দাঁড়াতে হয়। অর্থাৎ মুহূর্তে স্বর্গপতন। আমাদের দেশের ক্ষমতাবিলাসী (বা লোভী) রাজনীতিকগণ যেদিন থেকে আচরণে ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তখন থেকে গণশক্তির পরোয়া করছেন না। তার বদলে পেশীশক্তিকে সকল ক্ষমতার উৎস বিবেচনা করছেন। এ ধারার রাজনৈতিক শক্তির হাতে রাষ্ট্রের সকল সংগঠন বিকলাঙ্গ হয়ে যায়।
আমাদের দুর্ভাগ্য এ ধরনের শক্তির হাত থেকে আমরা শত শত বছর ধরেও রেহাই পাইনি। ঔপনিবেশিক আমলে পুলিশ হয়তো বিপন্নের আশ্রয় হতে পারতো। তবে স্বাধীনতা প্রত্যাশী বিপ্লবীদের দমন করতে এরাও উগ্র হয়ে ওঠে। ফলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ঘুষ দুর্নীতি জায়গা করে নিতে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটিতে। পাকিস্তানি শাসনযুগে বাঙালির আন্দোলন দমন করার জন্য পুলিশকে ঠেঙ্গারে বাহিনী বানানো হতে থাকে। ‘পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা’ প্রবাদগুলোতো এমনি এমনি তৈরি হয়নি। সরকার জনগণের না হলে পুলিশও জনগণের হতে পারে না। সরকার যখন নিজেকে নিরাপদ রাখতে পুলিশকে ব্যবহার করে তখন জনগণ অনিরাপদ হয়। সরকারি ছত্রছায়ায় পুলিশ হয়ে ওঠে দুর্দমনীয়। ‘দুর্দমনীয়’ শব্দটি ইতিবাচক অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারতো। কিন্তু তা হবার নয়। সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করতে হলে এ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি সরকারকেও ছাড় দিতে হয়। ফলে অন্যায় দুর্নীতি গ্রাস করে।
দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে হাঁটা। সমুদ্রসীমা আর ছিটমহল সংকটের সমাধানের পথে এগিয়ে নেয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একেবারেই দৃষ্টিসীমার মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় একটি ঐতিহ্যবাহী দল যদি গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে পারতো তবে সম্ভাবনার দরজা আরো বেশি খুলে যেতো।
বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও নেতৃত্বের দুর্বলতা ও আদর্শহীনতার কারণে বিএনপি আজ বিপন্ন দশায় পৌঁছে গেছে। গণতন্ত্রের জন্য এটি মোটেও শুভলক্ষণ নয়। দেশের উন্নয়নকে প্রাধান্য না দিয়ে, গণমানুষের ইচ্ছের কথা পড়তে না পারলে শেষ বেলায় এসে একটি রাজনৈতিক দল আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। নানা অরাজকতা সৃষ্টি করে টিকতে চায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সে চেষ্টা করেও তেমন সুবিধা আদায় করতে পারেনি বিএনপি। এসব কারণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের যে আত্মপ্রসাদ লাভ করার সুযোগ আছে আমাদের তেমন মনে হয় না। এর বড় কারণ দলটির নেতৃবর্গ গণতন্ত্র চর্চা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে আসতে পারেনি। দলীয় বৃত্ত ভেঙ্গে জনগণের দলে পরিণত হতে পারেনি। সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে খুব মনোযোগী তেমন মনে হয় না। এ কারণে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সুতো সরকারের হাতে নেই। এ অবস্থা সরকারের ভেতরের দৃঢ়তা শিথিল করে দেয়।
গণতন্ত্রের চর্চা থাকলে রাষ্ট্রযন্ত্রের বা রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মবিশ্বাস প্রবল থাকে। না হলে এর ওর ওপর ভরসা করতে হয়। এ কারণেই দলীয় সরকারগুলো সকলেই ক্ষমতায় থেকে মসনদ অটুট রাখতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে পুলিশকে ব্যবহার করতে থাকে। এতে করে এ বাহিনীর সদস্যদের অসাধু হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। দুর্নীতির ঘোড়া প্রকাশ্য পথে ছুটিয়ে দেয়। এ কারণে এতো যে গ্রেফতার বাণিজ্য, সড়ক পথে চাঁদাবাজি, নির্যাতন করে অর্থ আদায়ের সংবাদ প্রকাশিত হয় তার জন্য কি তেমন শাসন রয়েছে? তাই অসহায়ভাবে বলতেই হবে কুইনাইন সারাবে কে?
পুরো সিস্টেমের সংস্কার না করে কোনো ঘটনা অঘটনে মিডিয়ায় তোলপাড় হলে ‘বাটে’ পড়ে বরখাস্ত হন দু’একজন চুনোপুঁটি। বহাল তবিয়তে থেকে যান ক্রীড়ানকরা। রাজধানীতে যারা গাড়ি ব্যবহার করেন তাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে ট্রাফিক সার্জনদের মাস্তানির। সব প্রচার পায় না বলে আলোড়ন ওঠে না। গত ৯ মে রাতের অমানবিকতা হয়তো হজম হয়ে যেতো যদি ভুল বুতামে চাপ না পড়তো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক রাকিব আহমেদকে আমি খুব কাছে থেকে চিনি। ভদ্র ও বিনয়ী ছেলে। সবচেয়ে বড় কথা বাবা-মা কে নিয়ে ট্রেন ধরার জন্য যাচ্ছেন। যদি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন জাতীয় কোনো অপরাধ করেই থাকেন আইন অনুযায়ী প্রতিবিধানের ব্যবস্থা তো আছেই। ট্রাফিক সার্জনের সে পথে হাঁটার দায়িত্ব ছিল। তারপরও ভদ্রতা, সভ্যতা মানবিকতা এসবের প্রশ্নতো থাকেই। ক্ষোভ বিরাগ সৃষ্টি হলেও বাবা-মায়ের সামনে সন্তানের সম্মান রক্ষা করার বিষয়টিতো পুলিশ প্রশিক্ষণে থাকা উচিত ছিল। দেয়ার মতো ব্যক্তিগত পরিচয় থাকুক বা না থাকুক প্রকাশ্যে কাউকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করার অধিকার তো পুলিশকে কেউ দেয়নি। এসব ঘটনা কিন্তু প্রতিদিন পুলিশকে জনগণের প্রতিপক্ষ করে তুলছে।
১০ মে ডিএমপি কার্যালয়ের কাছে অপ্রীতিকর ঘটনা কি এড়ানো যেতো না? ছাত্র ইউনিয়ন যে দাবি নিয়ে এগিয়ে গেছে তাতে তো এমনিতেই পুলিশের লজ্জিত থাকার কথা। প্রকাশ্যে অভিজিত রায় খুন হন, পয়লা বৈশাখে চোরাগোপ্তা নয়, প্রকাশ্যে দীর্ঘ সময় ধরে নারী লাঞ্ছিত হয় অথচ নানা স্তরে নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়া পুলিশ দীর্ঘ ২৬ দিনেও অপরাধীদের টিকি ছুঁতে পারে না। কোনো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে আশ্বস্ত হতে না পেরে বিচার প্রার্থী তরুণরা যদি ডিএমপি কমিশনারের মুখ থেকে আশ্বাসের বাণী শুনতে চায় তাহলে অন্যায় কী! ডিএমপি কমিশনারের আশ্বাস দেয়ার মতো মুখ যদি না থাকে তবে হাইকোর্টের সামনেইতো থামিয়ে দেয়া যেতো। প্রতিনিধি নিয়ে যাওয়া যেতো কমিশনারের কাছে। যেমনটি হয়ে থাকে।
প্রতিরোধ শিথিল রেখে যেতেও দেয়া হলো আবার অন্যায়ের প্রতিবিধান চাওয়া এদেশেরই প্রতিবাদী তরুণদের লাঠিপেটা করা হলো। নারী লাঞ্ছনার বিচার চাইতে এসে পুলিশের হাতে নারী লাঞ্ছিত হলেন। কিন্তু আমাদের মনে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এ অনভিপ্রেত পরিস্থিতি কি এড়ানো যেতো না? ডিএমপি কমিশনার একটু দেখা দিয়ে দু`একটি আশ্বাসের কথা বললে পুলিশ আইনে কি কোনো সংকট হতো?
আমরা বিষয়গুলো নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারকে ভাবতে বলবো। অযথা সংকট তৈরি করার রহস্য কী? অপেশাদারিত্ব? নৈতিক স্খলন? না-কি পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার? পুলিশকে জনগণের প্রতিপক্ষ করে ফেলার ফলাফল কারো জন্যই ভালো হবার নয়।
লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বিএ/আরআইপি