কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট
১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে বাজেট অধিবেশন। এই অধিবেশনেই পাশ হবে ২০১৫-২০১৬ এর জাতীয় বাজেট। কেমন হবে এই বাজেট? কেমন বরাদ্দ থাকবে কৃষিখাতে? কেমন প্রত্যাশা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের? এনিয়ে ‘কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট’ প্রস্তাবনায় ওঠে এসেছে কৃষকদের প্রস্তাব, দাবি ও চাহিদার কথা। এসব নিয়েই জাগো নিউজে লিখেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। সাত পর্বের ধারাবাহিক লেখায় আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব।
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আসন্ন জাতীয় বাজেট (২০১৫-২০১৬)-এ কৃষির যে দিকগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন -
১. ঋণগ্রস্ত ও সর্বস্বান্ত কৃষকের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ
গত তিন বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে উৎপাদন মৌসুমে ফসল বাজারজাত করতে না পারায় কঠিন সংকটের মুখে পড়েছে কৃষক। তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফসল আবাদ করলেও ফলন মৌসুমে পড়েছে চরম দুর্দশায়। অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ব্যাংকের আইনী জটিলতায় পড়েছেন। ঋণের জন্য প্রায় ২ লাখ কৃষকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রয় ১০ হাজার কৃষকের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে। যারা গ্রেফতারের ভয়ে পলাতক রয়েছেন।
কৃষি ঋণের বিপরীতে কৃষকদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা না করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এর আগে যেসব মামলা হয়েছে, তা রি-শিডিউল করে কৃষকদের মামলা থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এটি সরকারের আন্তরিক একটি উদ্যোগ। এর পাশাপাশি ঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত কৃষকের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে স্বাভাবিক কৃষিকাজে সহায়তা করা প্রয়োজন। তাছাড়া ঋণ যেমন তারা শোধ করতে পারবেন না, একইভাবে শক্তি ও ক্ষমতা থাকা পরও কৃষিতে তারা কোনোই অবদান না রাখতে পারলে সম্ভাবনা থাকলেও খাদ্য নিরাপত্তায় সাফল্য ধরে রাখতে সমর্থ হবো না আমরা।
২. কৃষিপণ্যের নতুন বাণিজ্যকৌশল নিতে হবে
উচ্চমূল্যের ফল, মশলা ফসলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন মৌসুমে দেদারছে আমদানি করা হচ্ছে। এতে দেশের মধ্যেই অসম এক বাজার প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন কৃষক। উচ্চমূল্যের ফল-ফসল আবাদ করে গত দশ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক ব্যাপক সাফল্যের নজির গড়লেও গত তিন-চার বছরে অধিকাংশ পণ্যেরই ন্যায্য মূল্য পাননি। এ অবস্থা থেকে কৃষককে বাঁচাতে কৃষিপণ্যের আমদানি নীতিমালায় পরিবর্তন আনার দাবি ১০০ ভাগ কৃষকের। তারা বলছেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদনের ভরা মৌসুমে কিছুদিন এলসি বন্ধ রাখার।
৩. সমন্বিতভাবে নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নিতে হবে
দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর নাব্যতা হারিয়ে গেছে। নদীকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা ও কৃষি আবাদ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও খাল খনন করা প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি হাওর বাওড় দখলমুক্ত করতে হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস্যগুলোকে সচল করতে না পারলে কৃষি আবাদ কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের অধিকাংশ এলাকা শুষ্ক মৌসুমে মরুকরণ প্রক্রিয়ার শিকার হচ্ছে, বর্ষা মৌসুমে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। একইভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকার অভ্যন্তরীণ খালগুলো দীর্ঘদিন সংস্কার না করার কারণে কৃষি আবাদ পড়েছে প্রতিবন্ধকতার মুখে। এক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে যৌথভাবে নদী খননসহ অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. কার্যকর কৃষি সমবায় গড়ে তোলার দাবি
দেশে কার্যকর ও রাজনীতিমুক্ত কৃষক সংগঠন যেমন এখনও গড়ে ওঠেনি, একইভাবে গড়ে ওঠেনি কৃষি সমবায়। কৃষকের প্রাত্যহিক সংকট নিরসনের স্বার্থে শক্তিশালী কৃষি সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এদেশে সমবায়ের অতীত সাফল্য রয়েছে। কিন্তু এখন কৃষিক্ষেত্রে কার্যকর ও শক্তিশালী সমবায়ের অস্তিত্ব নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি কৃষি সমবায় অবকাঠামো গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে দেশের সমবায় অধিদপ্তরকে যেমন কার্যকর ও সচল করা সম্ভব, একইভাবে কৃষির কাঙ্খিত উন্নয়ন করা সম্ভব। এই একটি সমবায় অবকাঠামোর আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তর পরিচালিত আইপিএম, আইসিএম ক্লাব আরো কার্যকরভাবে গড়ে তুলে তা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
৫. শস্যবীমা ব্যবস্থা
পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি ও দুর্যোগ ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে কৃষক বহুদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছে শস্যবীমা ব্যবস্থা প্রবর্তনের। বিষয়টি একাধিকবার সরকারের কাছে তুলে ধরার পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে সরকারের সুবিবেচনার আশ্বাস দেন। সে প্রেক্ষাপটে সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক একটি প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে বলে শোনা যায়। কিন্তু কার্যত এখনও শস্য বীমা বা ক্রপ ইন্সুরেন্স বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে কৃষিতে তিন ধরনের বীমা ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকরভাবে চালু রয়েছে। এক. ন্যাশনাল এগ্রিকালচার ইন্স্যুরেন্সস্কিম, দুই. ওয়েদার বেজড ক্রপ ইন্স্যুরেন্স স্কিম এবং তিন. হাইব্রিড ইন্স্যুরেন্স মেকানিজম। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ঝুঁকিকে কেন্দ্র করেই শস্যবীমা ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরকার বিবেচনায় আনবে বলে আশা করছি।
সেই সঙ্গে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা তথা মধ্যস্বত্বভোগী ও মহাজনী শোষণ থেকে কৃষকদেরকে রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং সুইজারল্যান্ডের আর্থিক সহযোগিতায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত কর্মসূচি শস্য গুদাম ঋণ প্রকল্প (শগুঋপ)-এর কার্যক্রম দেশব্যাপী স¤প্রসারিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
৬. মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও জৈব কৃষি
জৈব কৃষির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চফলনশীল ফসল আবাদ করতে গিয়ে কৃষক বছরের পর বছর মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে মাটির জৈব উপাদান যেমন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একইভাবে কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশে বছর প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে, যার আনুমানিক দাম ৫০ হাজার কোটি টাকা। সরকার নিষিদ্ধ ৫০টিরও অধিক কীটনাশক এখনও বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ভেজাল কীটনাশকেও বাজার ছেয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো সরকারের কার্যকর দৃষ্টিতে আনতে হবে। কীটনাশক আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে সেক্স ফেরোমেন ট্রাপের মতো জৈব পদ্ধতি ব্যবহার সম্প্রসারণের সুবিধার্থে, এসব জৈব কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সরকারিভাবেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সারাদেশে কৃষক পর্যায়ে কেঁচো কম্পোস্টের মাধ্যমে জৈব সার উৎপাদনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকবারি সংস্থা এক্ষেত্রে কৃষকদেরকে সহযোগিতা করছে। এ ব্যাপারে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশব্যাপী একটি বিশেষ ও অগ্রাধিকার প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। যার মধ্য দিয়ে প্রত্যেক কৃষক বাড়িতে বাড়িতে জৈব সারের উৎপাদন ও এর যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে কৃষককে সচেতন করে তোলা সম্ভব। কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে গ্রামীণ নারীরা জৈব সার (কেঁচো কম্পোস্ট) উৎপাদনের জন্য সরকারের বিশেষ ঋণ ও অনুদান সহায়তা চেয়েছেন। বিষয়টি বিবেচনায় আনার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
৭. কৃষিপণ্যের মূল্য কমিশন গঠন : প্রধান প্রধান কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণ
প্রধান প্রধান কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন কৃষক। পৃথিবীর অনেক দেশেই কৃষিপণ্যের মূল্য কমিশন রয়েছে। রয়েছে সকল কৃষিপণ্যের সঙ্গে উৎপাদকের লাভ নিশ্চিত করে তা বাজারজাত করণের ব্যবস্থা। আমাদের দেশে শুধু ধান চাল ও গমের সরকারি সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য পাট, আলু, ভূট্টা, মশলা ও ডালজাতীয় ফসলের একটি বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই মূল্য আমদানি পণ্যের সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের কৃষকদের সঠিকমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তার আলোকে নির্ধারণ করতে হবে। যাতে কোনোভাবেই পণ্যের আমদানির কারণে দেশীয় পণ্য মার না খায়।
৮. পাটসহ বিভিন্ন ফসলের বীজের ক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে
পাটের জীন নকশা আবিস্কৃত হওয়ার পর দেশের কৃষক পাট নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেও ৯০ ভাগ পাটবীজের জন্য আমরা আমদানি নির্ভর হয়ে উঠেছি। সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় পাটবীজের ব্যাপক ব্যবহার। এটি আমাদের সামগ্রিক কৃষি পরিকল্পনা ও উন্নয়নে বড় ধরনের ব্যর্থতা সূচিত হচ্ছে। বেসরকারি কোম্পানির বীজ বিক্রি ও সরবরাহে কঠোর মনিটরিং-এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি কোম্পানির বীজ ব্যবহার করে প্রতি বছর কৃষক প্রতারিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকছে। বেসরকারি কোম্পানির বীজ বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে হবে। যত্রতত্র বীজ উৎপাদন ও প্যাকেটজাত করে বাজারজাতকরণ বন্ধ করতে হবে।
বিএডিসির চুক্তিভিত্তিক বীজ উৎপাদকরা সরকারের পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে লোকসান গুনছেন ও বীজ উৎপাদনে হতাশ হয়ে পড়ছেন।
৯. বিদ্যুৎচালিত সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে হবে : বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০% রেয়াত সরাসরি কৃষকের একাউন্টে প্রদান করতে হবে
ডিজেলের বর্ধিত মূল্যের কারণে দেশের সকল এলাকায় বোরো মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজেল পাম্পের মালিকরা ইচ্ছেমত তাদের সেচকর নির্ধারণ করায় কৃষকের জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মরার ওপর খাড়ার ঘা। বাড়তি মূল্যের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন ব্যয়ে পুষিয়ে উঠতে না পেরে কৃষক স্কীমের আওতায় বোরো চাষ থেকে বিরত থেকেছে। অনেক এলাকায় কৃষক অন্য ফসলে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ এলাকার কৃষকের দাবি বিদ্যুতায়নের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদ্যুৎচালিত পাম্পে সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারিত করার। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলের ওপর কৃষকের বিশেষ সহায়তা কখনোই কৃষক পান না, পান পাম্প মালিকরা। এক্ষেত্রে অর্থ সহায়তা সরাসরি তাদের ব্যাংক একাউন্টে প্রদানের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন কৃষক।
১০. সার কারখানা স্থাপনের দাবি
সারের উপর বছরের পর বছর ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। অথচ ভর্তুকির অর্থে এক বা একাধিক সার কারখানা স্থাপন করে সারের প্রশ্নে বিদেশ নির্ভরতা কমানো সম্ভব। সারকে কেন্দ্র করে বিশাল একটি বাণিজ্য কাঠামোর বিস্তার ঘটেছে। যার কারণে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানোর মতো প্রযুক্তিগুলো সম্প্রসারিত হচ্ছে না। আসন্ন জাতীয় বাজেটে নতুন একটি ইউরিয়া কারখানা স্থাপনের জন্য সরকারের পরিকল্পনা দাবি করছি। চলবে....
এইচআর/এমএস