বাংলাদেশের সুশীল সমাজ ও বিদ্যুৎ বিতর্ক
মোনায়েম সরকার :
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কল্যাণে বাংলা সাহিত্যে অশেষ সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘কৃষ্ণ কান্তের উইলে’ সুমতি-কুমতি নামে দুটি কল্পিত চরিত্র ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের সুমতি-কুমতি দ্বন্দ্ব যে একদিন বাংলাদেশের রাজনীতি অঙ্গনেও প্রবেশ করবে এ কথা যদি সাহিত্য সম্রাট বুঝতে পারতেন, তাহলে হয়তো আমরা আরো অনেক তথ্য ও ত্ত্ত্বপূর্ণ আলোচনা পেতাম বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ থেকে। যা হোক, বাংলাদেশে সুমতি ও কুমতির দ্বন্দ্বের স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্যই এই লেখার সূচনা। আশা করি বাংলাদেশের সুমতি-কুমতি উভয় শ্রেণির পাঠকই দরদ দিয়ে এই লেখার মমার্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ইতিহাসের নানা বাঁকে ভূ-লুণ্ঠিত হতে থাকে স্বাধীনতার আদর্শ ও উদ্দেশ্য। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি একাধিকবার জবর দখল করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, যার ফলে বারবার এদেশে দেখা দেয় সুমতি ও কুমতির প্রকাশ্য বা গুপ্ত দ্বন্দ্ব। পৃথিবীতে সম্ভবত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ- যেখানে স্বাধীনতাবিরোধী, দেশদ্রোহীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং মন্ত্রী হয়ে দেশ শাসনের ভার গ্রহণ করে। এমন কলঙ্কজনক ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্বে আর কোনো দেশে ঘটেছে বলে অন্তত আমার জানা নেই, যার ফলে স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে একশ্রেণির লোকের উদ্ভব ঘটেছে যারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির সব কিছুতেই শুধু নেতিবাচক উদ্দেশ্য খুঁজে পায়। এই নেতিবাচক কুমতি মানুষগুলোকে যদি স্বাধীনতার পক্ষের সুমতির মানুষগুলো প্রশ্ন করে, তাহলে আমরা কি করবো? এর জবাবে এই দেশবিরোধী কুমতিরা হয়তো বলবে, ‘তোমরা কিও করতে পারবে না।’ এই যদি হয় দেশের সার্বিক অবস্থা তাহলে বুঝতেই হবে দেশের বারোটা বাজতে আর বেশি বাকি নেই। কিন্তু আমার কথা হলো বাংলাদেশের মানুষের বোধোদয় হতে শুরু করেছে।
এখন আর তারা কোনো কিছু বিবেচনা না করে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বা বর্ণচোরা রাজনীতিবিদদের কথাকে নির্দ্বিধায় মেনে নেয় না। এখন বাংলার জনগণ অনেক সচেতন হয়ে গেছে। তাদের চোখ-কান খুলে গেছে। তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রসারে চতুর্দিকে আজ লেগেছে বদলে যাওয়ার হাওয়া। এখন মানুষ বিনা বিচারে সত্যকেও মেনে নিতে নারাজ। এমন একটি যুক্তিবাদী সমাজ বহুদিন ধরেই কামনা করেছিল বাংলাদেশ। আজ তার বাস্তবায়ন দেখে অনেকেই তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলছেন। দেশে যত সুমতিসম্পন্ন সৎ নাগরিকের সংখ্যা বাড়বে দেশ ততই এগিয়ে যাবে, কমে যাবে সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ বা ধর্মীয় উগ্রবাদ।
তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সমস্যার অভাব নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন সবসমস্যার টেকসই ও সম্মানজনক সমাধানের। ইতোমধ্যে তিনি বহুক্ষেত্রেই সাফল্য দেখিয়েছেন এবং বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য শেখ হাসিনার এই সম্মান অত্যন্ত গৌরবের ও অহংকারের বিষয়। জানি না নেতিবাচক মানসিকতার মানুষগুলো এই মর্যাদাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন।
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ। আধুনিক যুগে বিদ্যুতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই আজ বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে শহরে যেখানে পাঁচ কাঠা জমিতে একটা পরিবার থাকতো এখন সেখানে বহুতল ভবন করে ১০টা বা ১০০টা পরিবার থাকে। সুতরাং আগের ১টা পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যত সহজ ছিল এখন ১০টা বা ১০০টা পরিবারের চাহিদা মেটানো মোটেই সহজ কাজ নয়। আগে একটা পরিবারের বিনোদনের মাধ্যম ছিল একটা টিভি। এখন পরিবারের প্রতিটি সদস্যই ব্যবহার করে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস।
মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার প্রতিটি মানুষের জীবনকে আজ এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে এগুলো ছাড়া আধুনিক জীবন যেন অকল্পনীয় হয়ে উঠেছে। ক্রমবর্ধমান বিলাসী জীবনের চাহিদা মেটাতে এখন শুধু আর আমাদের জলবিদ্যুৎ কিংবা সৌর বিদ্যুতের কথা ভাবলেই চলবে না। আমাদের নিতে হবে আরও বড় বড় পদক্ষেপ। সরকার উদ্যোগ নিয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার। অবশ্য অনেক বছর আগে থেকেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছিল সরকার। রূপপুরে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে। নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে অর্থনীতিসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায়। কিন্তু এতেও দেখা দিয়েছে সুমতি-কুমতির সেই বঙ্কিমীয় দ্বন্দ্ব।
যারা সুমতির পক্ষে তারা বলছে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এবং জনসাধারণকে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা দিতে গেলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকল্প নেই। দেশে যত বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হবে ততই বেগবান হবে দেশের অগ্রগতি। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশকে যদি বিদ্যুৎ সেবা দিতে সত্যিই সরকারের সদিচ্ছা থাকে তাহলে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো যেভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে, আমাদের দেশেও তাই করা উচিত। কিন্তু যারা নেতিবাচক মানসিকতার মানুষ তথা বর্তমান সরকারের উন্নয়নের গতি দেখে যারা শঙ্কিত, আতঙ্কিত তারা বলছেন অন্য কথা। এই কুমতিরা পরিবেশ-পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে, বিদেশিরা আমাদের সম্পদ নিয়ে যাবে ইত্যাদি উল্টাপাল্টা বলে ডান-বামের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি বাতিলের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা উপলব্ধিহীন এমন নয়, তারাও বুঝতে পারছে ছোট্ট এই দেশের কোটি কোটি মানুষকে বিদ্যুৎ সেবার আওতায় আনতে গেলে আজ বাংলাদেশকে অবশ্যই পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা ওই রকমই কোনো বৃহত্তর প্রকল্পের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএন, এসকাপ) এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অন্তর্ভুক্তির একটি প্রতিবেদনে জানান, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অন্তত ৬২ কোটি মানুষ বিদ্যুতের আওতায় আসেনি। আবার শহর ও গ্রামে বিদ্যুৎ সেবা নিয়েও বৈষম্য আছে। যেমন বাংলাদেশে শহরের ৯০ শতাংশের মতো মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে, যা অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সমান। তবে গ্রামের মাত্র ৪৫ শতাংশের মতো মানুষ বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে। গ্রামের মানুষদের বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। (প্রথম আলো, ১৫ মে, ২০১৫)। যারা মনে করেন গ্রামকে অন্ধকারে রেখে শুধু শহর আলোকিত করলেই দেশ এগিয়ে যাবে তারা আসলে বোকার স্বর্গেই বসবাস করছে। গ্রামীণ অর্থনীতিই আমাদের দেশের প্রধান শক্তি। সুতরাং সেই অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সবল করার জন্যই আমাদের এমন সব চিন্তা-ভাবনা করা জরুরি যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকটিও বিদ্যুৎ সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের সমস্যার চেয়েও আরো বড় সমস্যা হলো সুশীল সমাজের সমস্যা। এই সুশীল সমাজ শুধু এটা করা যাবে না, সেটা করা যাবে না- এই রকম, ‘না, না’ নিয়ে ব্যস্ত, তাদের দৃষ্টিতে গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস তুললে দেশের ক্ষতি হবে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে অর্থ ব্যয় হবে, সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে পরিবেশ নষ্ট হবে, কয়লা খনি থেকে কয়লা তুললে মাটি অনুর্বর হওয়াসহ ভূমিধ্বস হবে। এতসব বাধ্যবাধকতা মেনে কি দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব? এরা ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলে ঠিকই কিন্তু দেখা যায় এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজেরাই ঘুষ দেয়, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি কেনে, আয়কর ফাঁকি দেয়, এদের প্রায় প্রত্যেকের গায়েই আছে উৎকট দুর্গন্ধ। একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে- এই সুশীলদের ইনকামের সাথে খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা-বিলাস-ভ্রমণে আকাশ-পাতাল ফারাক। এরা কিভাবে চলে, কার টাকায় চলে- এসব মানুষ আজ জানতে চায়। মাঝে মাঝে সুশীলদের ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যে সব গোপন তথ্য বেরিয়ে আসছে তাতে দেশের মানুষ হতবাক হয়ে গেছে। আসলে আজ আর কারো বুঝতে বাকি নেই। সুশীলরা বাইরে এক জিনিস, ভেতরে ভেতরে একেবারে অন্য জিনিস। এরা সব সময়ই মুখোশ পরে থাকে, এরা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। এরা দেশের খায়, দেশের পরে কিন্তু কাজ করে বিদেশিদের।
কবি কামিনী রায় বলেছিলেন, ‘করিতে পারি না কাজ / সদা ভয় সদা লাজ / সংশয়ে সংকল্প সদা টলে / পাছে লোকে কিছু বলে।’ আজ আমাদের সময় এসেছে নেতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন মানুষগুলোর কথায় কান না দিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে একটি সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। আমাদের সবার উচিত দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো। সুনাগরিক না হলে সুশাসন আশা করা যেমন বৃথা তেমনি সুচিন্তা ছাড়াও মহৎ কাজ অসম্ভব। দেশের কল্যাণে, দশের কল্যাণে, আমরা আমাদের অকারণ নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করে ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিব।
লেখক : কলামিস্ট
এইচআর/এমএস