এ শহর আমার নয়


প্রকাশিত: ০৫:৩৫ এএম, ২৫ মে ২০১৫

ঢাকা না-কি বাসযোগ্যতার বিবেচনায় বিশ্বের দ্বিতীয় অযোগ্যতম শহর। কিন্তু তবুও এই ঢাকাই আমার প্রিয়। শেষ জীবনে গ্রামে ফিরে যাওয়ার একটা আকাঙ্খা আছে বটে। কিন্তু কোনোদিনই এই ঢাকা ছেড়ে, এই বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবিনি, এখনো ভাবছি না। কিন্তু মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয়ে যায়, যখন দেখি কিছু লোক শহরটাকে বাস-অযোগ্যতায় দ্বিতীয় থেকে প্রথম করার চেষ্টা করেন।

সেদিন পত্রিকায় একটা সংবাদ দেখে চমকে উঠলাম, আঁতকে উঠলাম, ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে। গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত সাড়ে ৯টায় এই ঢাকায়, এই ব্যস্ত নগরীতে কুড়িল বাসস্ট্যান্ড থেকে এক গারো মেয়েকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয় পাঁচ তরুণ। তারপর মাইক্রোবাসটি দেড়ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে এই ঢাকায়, আমাদের এই প্রিয় ঢাকায়, যানজটে স্থবির এই ঢাকায় ঘুরে ঘুরে পাঁচ পশু মিলে সেই আদিবাসী তরুণীতে ধর্ষণ করেছে। এরপর উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডে মেয়েটিকে নামিয়ে দিয়ে যায়। ভয়ে-আতঙ্কে-অবিশ্বাসে আমি থমকে যাই। এই ব্যস্ত ঢাকায় সাড়ে ৯টা মানে সন্ধ্যা। যেখানে যানজটে মধ্যরাত পর্যন্ত স্থবির থাকে ঢাকা। প্রায়শই দেখি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশ গাড়ি তল্লাশি করছে। এরকম অবস্থায় দেড়ঘণ্টা ধরে ঢাকার রাস্তায় একটি ছাই রঙা মাইক্রোবাস ঘুরলো, আর সেই গাড়িতে রচিত হলো মানবতার কলঙ্ক, পুলিশ কী করলো? পুলিশ যা করার তাই করেছে।

মেয়েটি প্রথমে বাসায় গেছে। তারপর স্বজনদের নিয়ে গেছে তুরাগ থানায়। কারণ তার বাসা তুরাগ থানা এলাকায়। থানা বলে দিয়েছে, এটি তাদের এলাকায় নয়। পরে মেয়েটি যায় গুলশান থানায়। সেখানে তাকে দীর্ঘসময় বসিয়ে রেখে ফিরিয়ে দেয়া হয়। বলা হয়েছে, এটি তাদের এলাকার নয়। এরপর মেয়েটি গেছে ভাটারা থানায়। সেখানেও মেয়েটিকে অন্তত চারঘণ্টা বসিয়ে রেখে মামলা নেয়া হয়েছে। তার মানে রাত সাড়ে ৯টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত মেয়েটিকে কাটাতে হয়েছে ভয়ঙ্কর এক কালো সময়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এ ধরনের ক্ষেত্রে থানায়-হাসপাতালে আরেক দফা মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সবাই রসিয়ে রসিয়ে ঘটনার বিবরণ শুনতে চায়। যতোদূর খবর পাওয়া যাচ্ছে, ওই আদিবাসী মেয়েটির ক্ষেত্রেও পুনরাবৃত্তি ঘটেছে একই ঘটনার। শারীরিক নির্যাতনের ধকল হয়তো কাটিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু সব মিলিয়ে মানসিক ধকলটা বয়ে বেরাতে হয় সারাজীবন।

প্রকৃতির সন্তান আমার এই আদিবাসী বোনটি ঢাকায় এসেছিলেন বাড়তি উপার্জনের আশায়। কলেজে পড়া মেয়েটি যমুনা ফিউচার পার্কে একটি পোশাকের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে পার্টটাইম চাকরি করতেন। বিভিন্ন দোকান, পার্লার, রেস্টুরেন্টে কর্মী হিসেবে আদিবাসী মেয়েদের চাহিদা অনেক। তারা পরিশ্রমী, তারা বিশ্বস্ত, তারা সৎ, তারা আন্তরিক। এ কারণেই ব্যবসায়ীদের পছন্দের তালিকায় শুরুতেই থাকে আদিবাসী তরুণীরা। নির্যাতিত বোনটি পুলিশকে জানিয়েছে, ধর্ষকদের একজন কয়েকদিন আগে দু’জন বিদেশি নিয়ে তাদের দোকানে এসেছিল কেনাকাটা করতে। সেদিন সেই তরুণ, আদিবাসী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেছে। তার খোঁজখবর নিয়েছে। তার মানে পুরো বিষয়টি ঘটেছে পরিকল্পিতভাবে।

নির্যাতিত মেয়েটিকে উদ্ধৃত করে পুলিশ জানিয়েছে, পাঁচ তরুণই শিক্ষিত, আধুনিক পোশাক পড়া, শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা। তাদের ধারণা গুলশান-বনানী এলাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের বখে যাওয়া তরুণরা মিলেই এই কুকর্মটি করেছে। হায়রে শিক্ষা! হায়রে পোশাক! মনুষ্যত্ব শিক্ষায়, পোশাকে বা কথায় নয়।

পহেলা বৈশাখ থেকেই আমাদের এই লজ্জার নবযাত্রা। বর্ষবরণের আয়োজনে পুলিশের তিন স্তর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সংঘবদ্ধ চক্রের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেক নারী। একই দিনে নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছেন জগন্নাথ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। টিএসসি এলাকায় নির্যাতনের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও পুলিশ এখনো কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি। পুলিশের আইজিপি বলেছেন, সেদিন নাকি কয়েকটি ছেলে দুষ্টুমি করেছে। বর্ষবরণে নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজপথে পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের নারী কর্মীরা। মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে এক কন্যা শিশু নির্যাতিত হয়েছেন স্কুলেরই এক কর্মচারির হাতে। রাজধানীর কদমতলীতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্র নির্যাতিত হয়েছে আরেক ছেলের হাতে। একের পর ঘটনা ঘটছে, কিন্তু পুলিশ যেন নির্বিকার। অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। তাহলে এই ঢাকা কি নির্যাতক আর ধর্ষকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়ে যাচ্ছে? তাহলে কি ধর্ষক পশুরাই মাইক্রোবাস নিয়ে টহল দিয়ে বেড়াবে এই ঢাকায়, আর মা-বোনেরা ঘরে বসে থাকবে? বেডরুমে নিরাপত্তা দিতে না পারলেও রাজপথেও কি নারীরা নিরাপদ থাকবে না।

আদিবাসী গারো মেয়েটির ধর্ষণের চেয়েও কম আতঙ্কের নয় পরবর্তী সময়ে পুলিশের আচরণ, সুশীল সমাজের নিষ্ক্রিয়তা। ২০১২ সালে নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে ধর্ষিত হয়েছিলেন নির্ভয়া নামের এক মেডিকেল ছাত্রী। তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় ভারতজুড়ে। সেই অপরাধীরা ধরা পড়েছে। তাদের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সবার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি। মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে পাঁচজন মিলে গণধর্ষণ যেন আর দশটা অপরাধের মতোই একটা ঘটনা। ভারতকে আমরা অনেক বিষয়ে গালাগালি করি। কিন্তু তাদের কাছ থেকেও তো আমরা কিছুই শিখিনি। প্রতিবাদ করতেও আমরা ভুলে গেছি। কথায় কথায় উন্নত বিশ্বের সমাজ ব্যবস্থাকে গালি দেই আমরা।

কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক শহরে মাঝরাতেও নিরাপদে মেয়েদের হাঁটতে দেখেছি। এমনকি ব্যাংকক-পাতায়ার মতো শহরেও মাঝরাতে মেয়েদের নিশ্চিন্তে হাঁটতে দেখেছি। আর আমাদের এই শহরে রাত সাড়ে ৯টাতেই মেয়েদের তুলে নিয়ে যাবে দুর্বৃত্তরা- এটা ভাবা যায় না, এটা মেনে নেয়া যায় না। এরপর নিরাপদ ঢাকা, নারীবান্ধব ঢাকা, মানবিক ঢাকার স্লোাগান বড় বেশি হাস্যকর শোনায়, বড় বেশি অর্থহীন লাগে। ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হককে ধন্যবাদ, তিনি ভাটারা থানায় গিয়ে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেছেন। তার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু শুধু এই আশ্বাসই যথেষ্ট নয়। আমরা চাই মেয়র তার পাশে থাকবেন। অপরাধীদের ধরতে অব্যাহত চাপ দিয়ে যাবেন পুলিশের ওপর।

নির্যাতিত ওই মেয়েটি দুই দিক দিয়েই সংখ্যালঘু। একে তো নারী, তার ওপর আদিবাসী। ময়মনসিংহের প্রকৃতির সন্তান সেই মেয়েটির কথা ভেবে বেদনায় আমি নীল হয়ে যাই। এই শহরের একজন বাসিন্দা হিসেবে, একজন পুরুষ হিসেবে, সভ্য দাবিদার একজন মানুষ হিসেবে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়। সত্যি সত্যি মনে হয়, ধরণী দ্বিধা হও। একজন কর্মজীবী নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার দায় আমাদের সবার। সেই আদিবাসী বোনটির কাছে আমি ক্ষমা চাই। বোনটি আমার গ্রামে গিয়ে প্রকৃতির কাছে বিচার দেবে আমাদের প্রিয় এই শহরের নামে। পাহাড়কে বলে দেবে আমাদের নিষ্ঠুরতার কথা। কী লজ্জা, কী লজ্জা! একটি ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড থেকে মাইক্রোবাসে করে একজন তরুণীকে দুর্বৃত্তরা তুলে নিয়ে যাবে, তারপর পাঁচজন মিলে তাকে ধর্ষণ করবে, এটা ভাবা যায় না, মানা যায় না। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, এ শহর আমার নয়।


এইচআর/বিএ/এমএস/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।