নজরুল জীবনে নারী ও প্রেম


প্রকাশিত: ০৭:০৫ এএম, ২৫ মে ২০১৫

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলার বিদ্রোহী কবি। প্রেম ও প্রকৃতির কবি। বাংলাদেশের জাতীয় কবিও। যদিও জাতীয় কবির অভিধাটি নজরুল ইসলামের জন্য খুব বড় মাপের কোনো গৌরবজনক অলংকার নয়। বিশ্বসাহিত্যের বড় মাপের অনেক মহৎ কবি-সাহিত্যিকই কোনো দেশের জাতীয় কবি বা সাহিত্যিক ছিলেন না। এ জন্য তাদের গৌরব কোনো অংশেই কমে যায়নি। প্রতিভাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের অর্থ তার মৌলিক বিকাশের পথকে রুদ্ধ করা। কালের অভিরুচি শিল্পীসত্তাকে বরাবরই বিকশিত করে প্রকৃতির নির্যাসে। মানবের হৃদয় মথিত রূপ-রস-কল্পনা কাল থেকে কালান্তরিত হয়ে সৃষ্টি করে মেধা ও মননের নতুন দিগন্ত। শিল্পীর স্বাধীনতার সার্থকতা সেখানেই।

নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে জাতীয় কবি অভিধার চেয়েও বড় যা কিছু গৌরবের তা হচ্ছে, বিশ্বের দেশে দেশে শোষিত নির্যাতিত মানুষের মধ্যে শোষণ-নিপীড়ন-বঞ্চনা আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে আত্মজাগরণ এবং অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা। এটিই হয়েছে বিশ্বময় নজরুল ইসলামের বড় কীর্তি ও পরিচয়। এই কবিই কি বিস্ময়করভাবেই না নিজেকে সমর্পণ করলেন প্রকৃতির কাছে। লিখলেন অজস্র প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা-গান। জীবনের শেষ অভিভাষণে বললেনও, ‘... আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম।’
    
বৈচিত্র্যময় এক বিরল প্রতিভা নজরুল ইসলাম। বীর রস, করুণ রস, হাস্যরস কি ছিলো না তাঁর সৃষ্টির ভাণ্ডার ? বেদনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত কবি জগৎ ব্রহ্মাণ্ডের জন্য রেখে গেলেন এক মহৎ উত্তরাধিকার। পরাধীন মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য একাধারে ছিলেন বিদ্রোহী, অসহায় নিরন্ন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী-রাজনীতিক, সঙ্গীতজ্ঞ, চলচ্চিত্রকার এবং প্রেম ও প্রকৃতির কবি ছিলেন তিনি। এমন বিচিত্র প্রতিভার, বড় মাপের মানুষটির অন্তরের নিভৃত কোনটি কেমন ছিলো, কোন সে মহীয়সীর পদভারে স্পন্দিত-মথিত হয়েছিল তাঁর হৃদয় মন্দির- এ যাবৎ এ সম্পর্কে খুব একটা খোঁজ-খবর আমরা করিনি। অথচ লক্ষ-কোটি মানুষের প্রিয় কবি এই কাজী নজরুল ইসলাম।
    
যে কালে নজরুল ইসলামের জন্ম, সেটি ছিলো স্বদেশী-খেলাফৎ ও স্বরাজ আন্দোলনের যুগ। সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসক ব্রিটিশের হাত থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে দেশময় চলছে আন্দোলন সংগ্রাম। তার মধ্যে প্রবল ধারাটি ছিলো গান্ধীজীর অহিংস-অসহযোগ কর্মসূচি। কবি প্রথম দিকে এই ধারাকে সমর্থন করলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রকাশ্যেই সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের চরম ধারাকে সমর্থন করেন। এক পর্যায়ে এই আন্দোলনকে সর্বাত্মক সফল করতে আপামর দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গণ-আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। এই আন্দোলনে পিছিয়ে থাকা স্বধর্মের মুসলমান সম্প্রদায়কে জাগাতে ইসলামী চেতনার গান রচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে কবি বলেছেনও, বাংলার তিন কোটি মুসলমান-যারা লিখতে-পড়তে জানে না-অশিক্ষিত, কিন্তু গান বোঝে। তাঁদের জাগাতেই তাঁর এই প্রয়াস।

আপাদমস্তক প্রতিবাদী এই মানুষটির জীবনেও প্রেম ছিলো, ছিলো ভালোবাসা। অন্তরের নিভৃত কোণে এই কবিও গেঁথেছেন বিনি সুতার মালা। মানব ধর্মে মহীয়ান এই কবিও হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে আপন করে পেতে চেয়েছেন প্রিয়তমাকে। অপ্রাপ্তির দংশন তাঁকে জর্জরিত করেছে ঠিকই, কিন্তু ধ্বংস করতে পারেনি। খাঁটি সোনা বানিয়েছে। কালের ঝঞ্ঝায় কবি হয়তো বিদ্রোহী হয়েছেন, প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এই অভিধায়। কিন্তু প্রেমিক স্বত্বাটিও তাঁর বিস্মৃত হবার নয়।
    
জগতের সব বড় মাপের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর জীবনেই প্রেম-ভালোবাসার বিচিত্র উপাখ্যান লক্ষ্য করা যায়। কেউ দয়িতাকে পেয়ে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসার মহাকাব্য। কেউবা হারিয়ে লিখেছেন করুণ রাগের অমর উপাখ্যান। এঁদের জীবনের মহৎ সব শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির প্রেরণার উৎসই হয়ে আছেন তাদের দয়িতারা। বিশ্বসাহিত্যের দিকপালদের দিকে তাকালে এর পর্যাপ্ত নজির লক্ষ্য করা যায়। ফ্যানি ব্রাউনের গভীর প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে ছিলেন কিট্স। এমিলিয়াকে আপন করে পেতে কবি শেলী আমৃত্যু প্রতীক্ষায় থাকেন। বিয়েত্রেয়ীচের জন্য দান্তের অপেক্ষার পালাটিও ছিলো দীর্ঘ। Arrette Vallon এর সঙ্গে ওয়ার্ডসওয়ার্থের ছিলো দীর্ঘ প্রণয়। কোলরিচ আজীবন বিভোর ছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থের বোন সারাহর প্রেমে। কিন্তু কোনদিনই তাঁর সে প্রণয় পরিণতির মুখ দেখেনি। কবি বায়রনকে সৎবোন Astart এর সঙ্গে প্রেম করার কারণে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। লরাকে ঘিরে বেড়ে উঠেছিল পেত্রাকের প্রেমিক জীবন। জনাথন সুইফটের Stella এবং ইয়েটস-এর মডগান তাদের সাহিত্যিক জীবনে অপরিসীম প্রভাবের সৃষ্টি করেছিলেন। জগৎ বিখ্যাত এমনতর আরো অনেক রথি কবি-সাহিত্যিকের নামোল্লেখ করা যায়- এডমন্ড স্পেন্সার, স্যার ফিলিপ সিডনি, জনডান, ব্রাউনিং এরা সকলেই ছিলেন প্রেমের পূজারী, দয়িতা আরাধ্য পুরুষ।
    
আমাদের চন্ডীদাসের রামী, মাইকেল মধুসূদন দত্তের হেনরিয়েটা এবং রবি ঠাকুরের কাদম্বরীকেইবা এ প্রসেঙ্গ স্মরণ না করা কোনো? তেমনিভাবে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনেও লক্ষ্য করি নার্গিস-প্রমীলার উপস্থিতি, ফজিলাতুন্নেসার জন্য অপরিসীম একাগ্রতা। রানু সোম, উমা মৈত্রদের কণ্ঠদানের ভেতরে আপন সত্তা বিকাশের এক দুর্বিনীত ঝড় আর জাহানারার ভক্তি আকুলতার কাছে আত্মসমর্পণ।
    
সেই সঙ্গে লক্ষণীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কবির বাস্তব জীবনের প্রতিপার্শ্বের অনেক প্রিয়তম চরিত্ররাও তাঁর সাহিত্য-সঙ্গীতে ঠাঁই করে নিয়েছে। বর্তমান প্রবন্ধে কবির অন্তর জীবনের বিস্মৃতপ্রায় এই অধ্যায়টি অনুসন্ধানের প্রয়াস নেয়া হয়েছে।
    
নজরুলের জীবনে প্রণয়ের প্রথম ইঙ্গিতটি লক্ষ করা যায় ১৯২২ সালে। এ বছর ১মার্চ/১৩২৮ বঙ্গাব্দের ফালগুনে কলকাতার মোসলেম পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ব্যথার দান’ গল্পগ্রন্থটি। এটি কবির প্রথম প্রকাশিত বই। এতে মোট ৬টি গল্প স্থান পেয়েছে। এগুলো হচ্ছে ব্যথার দান, ‘হেনা’, ‘বাদল-বরিষণে’, ‘ঘুমের ঘোরে’, ‘অতৃপ্ত কামনা’ ও ‘রাজবন্দীর চিঠি’। এই বইটির উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেন, ‘মানসী আমার!/মাথার কাঁটা নিয়েছিলুম ব’লে/ক্ষমা করনি,/তাই বুকের কাঁটা দিয়ে/প্রায়শ্চিত্ত ক’রলুম।’

কে এই মানসী কবির? স্বর্ণলতা গঙ্গোপাধ্যায়? আসানসোলের দারোগার মেয়ে এই স্বর্ণলতাদের আদি নিবাস বাংলাদেশের খুলনায়। এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু জানা যায় না।

এই নিবন্ধটি প্রধানত কবির প্রেমিকা বা যাদের কবি প্রেম নিবেদন করেছিলেন এবং যাদের নিয়ে কবি রচনা করেছেন অজস্র প্রেমের কবিতা- গান, তাঁদের কেন্দ্র করে রচিত হলেও মাতৃসমা কিছু নারীর অপরিসীম প্রভাব ছিলো কবির ওপর এবং কবিও এঁদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। এঁদের স্নেহ, আপত্য শাসন আর বুকে আগলে রাখার মমত্ববোধই কবিকে জীবনের অনেক কঠিন সঙ্কট মোকাবিলায় পথের নির্দেশ দিয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায় এবং তা তাঁর জন্মদাত্রী মা জাহেদা খাতুনকে নিয়ে। কিশোর বয়সে সেই যে গৃহত্যাগ করলেন কবি, তারপর মায়ের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর পল্টন থেকে ফিরে ১৯২০ সালে একবার চুরুলিয়া গেলে। এরপর আর কোনোদিন কবির মায়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। মাতা-পুত্রের সম্পর্কে কেন এই টানাপোড়েন তার বিস্তারিত জানা যায়নি। বাড়ির কিছু পরিবেশ এক্ষেত্রে কবিকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। কিন্তু তারও বিশদ তথ্য কোথাও নেই। পরিণত বয়সেও কবি মায়ের সঙ্গে এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের ক্ষতকে অতিক্রম করতে পারেন নি।

১৯২৩ সালে কারাগারে পুত্রের অনশনের সংবাদ পেয়ে মা জাহেদা খাতুন চুরুলিয়া থেকে ছুটে গিয়ে ছিলেন হুগলি জেল গেটে অনশন ভাঙিয়ে পুত্রের জীবন রক্ষা করতে। কিন্তু কবি মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করেন নি। কেউ কেউ এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, মায়ের অনুরোধ কবি ফেলতে পারবেন না বলেই সাক্ষাৎ করেন নি। কিন্তু যখন দেখা যায় প্রমীলার কাকীমা বিরজাসুন্দরী দেবী এসে নজরুলকে অনশন ভাঙাতে বাধ্য করেন, তখন এই যুক্তি আর কাজ করে না। উপরন্তু ১৯২৮ সালের ৩০ মে চুরুলিয়ায় মৃত্যুবরণের আগে মা জাহেদা খাতুন পুত্র নজরুলকে এক নজর দেখার জন্য অন্তিম বাসনা প্রকাশ করেন। এই খবর নজরুলের কাছে পৌঁছা স্বত্তে¡ও অভিমানী কবি মৃত্যুপথযাত্রী মাকে দেখতে যাননি। জীবদ্দশায় কবি কখনোই এ সম্পর্কে মুখ খোলেন নি। ফলে নজরুল জীবনে এটি আজো অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে। 

এরপর আসে বিরজাসুন্দরী দেবীর কথা। ইনি নজরুলের বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের মা এবং প্রমীলার কাকীমা। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯২১ সালে আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দৌলতপুর যাবার পথে খান সাহেবের পূর্ব পরিচিত এই বীরেনদের বাড়িতে উঠে ছিলেন নজরুল। প্রথম যাত্রায় এ বাড়িতে ছিলেন ৪/৫ দিন। দৌলতপুরে ৩/৪ মাস কাটানোর পর নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে গেলে নজরুল ‘মা’ সম্বোধন করে তাঁর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সপরিবারে বিরজাসুন্দরী দেবীকে দৌলতপুরে নিয়ে গিয়ে ছিলেন। বিয়ে নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হলে নজরুল যখন রাতের শেষ প্রহরে একা ফিরতে উদ্যত হন, বিরাজ দেবী তখন পুত্র বীরেনকে নজরুলের সঙ্গে দিয়ে পাঠান।

কুমিল্লায় এসে নজরুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বিরজা দেবী তাঁর এই পথে কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানকে আন্তরিক সেবা শুশ্রুষা ও মমতা দিয়ে দ্রুত সারিয়ে তোলেন। যদিও প্রমীলার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বিরজা দেবী ঘোর আপত্তি করে ছিলেন, কলকাতা পর্যন্ত ছুটে এসেছিলেন প্রমীলা এবং তার মা গিরিবালা দেবীকে ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু সে যে সামাজিক চাপে, সংস্কারের ভয়ে, নিজের দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে- তা উপলব্ধি করতে কোনো অসুবিধা হয় না।

নজরুল-প্রমীলার বিয়ে হয়ে যাবার কিছু দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয় কবির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সর্বহারা’। কবি এই গ্রন্থটি বিরজা দেবীকে উৎসর্গ করে ‘উৎসর্গ’ কবিতাটিতে লিখেছেন, মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)র / শ্রীচরণারবিন্দে/ সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার।/ তুমি কোনদিন কারো করনি বিচার,/ কারও দাওনি দোষ। ব্যথা-বারিধির/ কুলে ব’সে কাঁদো মৌনা কন্যা ধরনীর/ ... .../ হয়ত ভুলেছ মাগো, কোন একদিন,/ এমনি চলিতে পথে মরু-বেদুইন-/ শিশু এক এসেছিল। শ্রান্ত কণ্ঠে তাঁর/ ব’লেছিল গলা ধ’রে- ‘মা হবে আমার?’/ ... .../ সর্বসহা কন্যা মোর। সর্বহারা মাতা।/ শূন্য নাহি রহে কভু মাতা ও বিধাতা।/ হারা-বুকে আজ তব ফিরিয়াছে যারা-/ হয়ত তাদেরি স্মৃতি এই ‘সর্বহারা’।

বিরজা দেবী সপরিবারে কলকাতা চলে আসার পর কবি নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় এই মহীয়সী নারী দেহত্যাগ করেন। নজরুল এ সময় তাঁর শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন।

এরপর আসে প্রমীলার মা কবির শাশুড়ি গিরিবালা দেবীর কথা। এই মহীয়সী নারীর আন্তরিক প্রয়াস ও কঠিন মনোভাবের কারণেই শত প্রতিক‚লতার ভেতরও নজরুল-প্রমীলার বিবাহ সম্ভব হয়েছিল। স্বীয় সিদ্ধান্ত থেকে তাঁকে কেউ টলাতে পারেনি। সমাজ, সংস্কার, রক্তের সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন সব পেছনে ফেলে রেখে মেয়েকে নিয়ে তিনি একা কুমিল্লা থেকে কলকাতা চলে এসে ছিলেন এবং নিরুদ্দেশ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মেয়ের সংসারকে আগলে রেখেছিলেন। নজরুলের ঘনিষ্ঠজনরাই মন্তব্য করেছেন, মাতৃসমা এই দেবী শুরুতে কবির সংসারের হাল না ধরলে কোথায় ভেসে যেতো কবির সংসার। আর কবিও বুঝি সংসারে একজন সার্বক্ষণিক অভিভাবক পেয়ে দেশময় চষে বেড়িয়েছেন। যখন যেখানে খুশি ছুটে গেছেন। মাসের পর মাস কাটিয়েছেন এখানে সেখানে দেশের কাজে, স্বজাতির কল্যাণে- যুব স¤প্রদায়ের মধ্যে আত্মজাগরণের চেতনা সৃষ্টি করতে। সংসার জীবনে কবির এই বহির্মুখী দিনগুলোতে গিরিবালা দেবীই সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অনেক প্রকাশকের কাছে কবির পাওনা আদায়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন।

এই মহীয়সী নারী সম্পর্কেও অপবাদ রটাতে বাঁধেনি নজরুলেরই কিছু ঘনিষ্ঠ জনের। দুর্নামের বিষয় ছিলো গিরিবালা দেবীর স্বেচ্ছাচার ও বেহিসেবীপনা। এই অপবাদ রটনাকারীদের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য হলেও গিরিবালা দেবী প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে ছিলেন। ১৯৪২ সালে কবি নির্বাক হয়ে যাওয়ায় তাঁর পক্ষেও শাশুড়ির জন্য কিছু করা বা অপবাদ রটনাকারীদের দমন করা সম্ভব ছিলো না। প্রমীলা দেবীও এ সময় পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী। ফলে লোকের কুৎসায় যন্ত্রণাবিদ্ধ গিরিবালা দেবী শেষ পর্যন্ত নিরুদ্দেশ হয়ে ছিলেন।

আরো এক মহীয়সী নারী মিসেস এম. রহমান এর কাছ থেকে নজরুল অপরিসীম মাতৃস্নেহ অর্জন করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মুসাম্মৎ মাসুদা খাতুন (জন্ম ১৮৮৪ সালে, মৃত্যু ১৯২৬ সালের ২০ ডিসেম্বর)। সমকালে যে দু’চারজন মুসলিম বাঙালি রমণী পর্দার অন্তরাল থেকে বেরিয়ে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মুসলমান নারী সম্প্রদায়ের মধ্যে জাগরণের সূচনা করেন- মিসেস এম. রহমান ছিলেন তাদের অন্যতম।

নজরুল ইসলাম এই মহীয়সী নারীকে কি পরিমাণ শ্রদ্ধা করতেন, তার একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে কবির ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থে। কবি এই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেন মিসেস এম রহমানকে। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন, ‘বাঙালার অগ্নি-নাগিনী মেয়ে মুসলিম-মহিলা-কুল-গৌরব/আমার জগজ্জননী-স্বরূপা মা/ মিসেস এম রহমান সাহেবার/ পবিত্র চরণারবিন্দে’ ‘উৎসর্গ’ কবিতার শেষপাদে কবি উল্লেখ করেন, ‘তোমার মমতা-মানিক আলোকে চিনিনু তোমার মাতা,/ তুমি লাঞ্ছিতা বিশ্ব-জননী! তোমার আঁচল পাতা/ নিখিল দুঃখী নিপীড়িত তরে; বিষ শুধু তোমা দহে,/ ফণা তব মাগো পীড়িত নিখিল ধরণীর ভার বহে!-/ আমারে যে তুমি বাসিয়াছ ভালো ধরেছ অভয়-ক্রোড়ে/ সপ্ত রাজার রাজৈশ্বর্য মানিক দিয়াছ মোরে,/ নহে তার তরে, - সব সন্তানে তুমি যে বেসেছে ভালো/ তোমার মানিক সকলের মুখে দেয় যে সমান আলো,/ শুধু মাতা নহ, জগন্মাতার আসনে বসেছ তুমি, -/ সেই গৌরবে জননী আমার, তোমার চরণ চুমি।’

১৩৩১ এর ১৬ শ্রাবণ হুগলিতে রচিত এই কবিতার নিচে কবি লিখেছেন, ‘তোমার নাগ-শিশু-/ নজরুল ইসলাম।’ এই বইটি নজরুল ইসলামের বিপ্লবাত্মক বিদ্রোহ চেতনার সবিশেষ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

১৯২৬ সালের ২০ ডিসেম্বর মিসেস এম. রহমান মৃত্যুবরণ করেন। এই মর্মান্তিক সংবাদ পেয়ে ১৩৩৩ এর ১৫ পৌষ কৃষ্ণনগরে বসেই কবি স্বল্পায়ু এই মহীয়সী নারীর স্মরণে রচনা করেন ‘মিসেস এম. রহমান’ শীর্ষক দীর্ঘ শোকবন্দনা। এর শেষ স্তবকে নজরুল তাঁর হৃদয়ের সমস্ত আবেগ-বেদনা-শ্রদ্ধা তুলে ধরে লেখেন, ‘যাহাদের তরে অকালে, আম্মা, জান্ দিলে কোরবান/ তাদের জাগায় সার্থক হোক তোমার আত্মদান।/ মধ্যপথে মা তোমার প্রাণের নিবিল যে দীপ-শিখা,/ জ্বলুক নিখিল- নারী- সীমন্তে হয়ে তাই জয়টিকা!/ বন্দিনীদের বেদনার মাঝে বাঁচিয়া আছ মা তুমি,/ চিরজীবী মেয়ে, তবু যাই ঐ কবরের ধুলি চুমি!/ মৃত্যুর পানে চলিতে আছিলে জীবনের পথ দিয়া,/ জীবনের পানে চলিছ কি আজ মৃত্যুরে পারাইয়া।’
    
মিসেস এম. রহমান স্নেহ-মমতা ও মায়ার বন্ধন দ্বারা কত গভীরভাবে আগলে রেখে ছিলেন নজরুল ইসলামকে, নজরুল কর্তৃক তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘বিষের বাঁশী’ উৎসর্গ করাসহ মৃত্যুর পর রচিত কবিতা থেকেই তা প্রতীয়মান হয়। বস্তুত এইসব মহীয়সী নারীদের স্নেহ-ভালোবাসাই কবিকে তাঁর উদ্দেশ্যে অটুট রাখতে প্রেরণা যুগিয়েছে বরাবর।  (চলবে...)


এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।