প্রিয় দেশ ও ভর্তি যুদ্ধ

শাহানা পারভীন
শাহানা পারভীন শাহানা পারভীন
প্রকাশিত: ০৩:০৩ পিএম, ০৪ জুলাই ২০২২

‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’- সত্যি আমি আমার দেশকে খুব ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই এখানে পড়তে চাই, এখানে থাকতে চাই। আমাদের সন্তানদেরও এখানে পড়াতে চাই। দেশে রাখতে চাই। কিন্তু এই দেশে অনেক কিছুই আছে যা অনেক দেশেই নাই। আবার এই দেশে অতি প্রয়োজনীয় এবং দরকারী অনেক কিছু নাই যার জন্য দেশ থেকে চলে যাচ্ছে মেধাবীরা।

বাহ্যিকভাবে আমাদের দেশের সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রথমে চোখে পড়বে যানজট, দুর্নীতির মত বিষয়গুলো। যানজট, দুর্নীতি কোথায় নাই কেউ বলতে পারবেন? আছে কিন্তু সেসব দেশে এগুলোকে সবাই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয় কারণ তা সিস্টেমেটিকভাবে চলছে।

যাই হোক, এর চাইতে বড় সমস্যা কিন্তু অন্য জায়গায়। সেটা হচ্ছে আমাদের কর্মসংস্থানের অভাব। আর এই কর্মসংস্থানের অভাব কেন? কারণ আমাদের পড়ালেখার সিস্টেম। আমাদের বাচ্চারা তাদের মেধা বা কর্মশক্তি অনুযায়ী পড়ালেখা করতে পারে না বলেই তাদের কর্মের অভাব হয়।

উন্নত দেশগুলোতে কী হয়? বাচ্চারা যে যার মেধা অনুযায়ী পড়ালেখা করে সে অনুযায়ী চাকুরিতে ঢুকে। আর আমাদের দেশে? গতবারের বিসিএস রেজাল্ট দেখে জানলাম ৮০% বুয়েটের পাস করা ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন প্রশাসনিক ক্যাডারে ঢুকেছে। এমনকি এমবিবিএস পাস করা এমন অনেকেই আছেন যারা বিসিএসে প্রশাসনিক ক্যাডার হিসেবে আছেন।

কারণ জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে তাদের ক্যাডারে নাকি তেমন সুযোগ ও পদোন্নতি নাই। স্থাপত্য বিদ্যা পড়েও অনেকেই বিসিএসে জয়েন করতে চায় না কারণ তাদের নাকি চাকুরিতে নাকি তেমন ভবিষ্যত নাই এমনকি চাকুরির সংখ্যাও নগণ্য। এছাড়াও বিসিএসের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও তাদের অনেক অনীহা।

আমাদের এই বাচ্চা গুলো তাদের দীর্ঘ বারো বছরেরর পড়ালেখা শেষ করে নেমে পড়ে জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম পড়ালেখার সংগ্রামে। এই সংগ্রাম হলো কোথায় পরবর্তী পড়ালেখা শুরু করবে তা নিয়ে। এই সময় জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের পরিবারের জন্য। যে তিন চার মাস সময় পায় ভর্তি পরীক্ষার জন্য সে সময়টা যায় পরিশ্রম আর দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে।

উন্নত দেশগুলোতে দ্বাদশ ক্লাস পাস করার পর কে কোথায় পড়বে, কী পড়বে তা নিয়ে এমন সময় পার করতে হয় না। অনেক আগে থেকে কে কোথায়, কী নিয়ে পড়বে সে ভাবেই এগিয়ে যায়। এ বিষয়গুলো নিয়ে জটিলতা বাইরের দেশগুলোতে নেই।

আমাদের দেশের ভর্তি পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র দেখলেই মনে হবে কত ছাঁটাই করা যায় সে উদ্দেশ্য ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া। জটিল থেকে জটিলতর ভর্তি পরীক্ষা। প্রশ্নপত্রে ক্লাস নাইন থেকে শুরু করে এমন প্রশ্ন করে যা কিনা আমাদের বাচ্চারা এসব কবে পড়ছে মনে করতে কষ্ট হয়।

আমি যদি এইচএসসির পরে ভার্সিটির পরীক্ষার জন্য বসি তাহলে কেনো নাইন টেনের বইয়ের পরীক্ষা দিবো? এ কেমন ভর্তি পরীক্ষা? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো এখানে এতো জটিল প্রশ্ন করার কি আছে? বারোটা বছর পড়া শেষ করে এখন আবার এ যুদ্ধের কি দরকার?

সহজভাবে পরীক্ষা দিয়ে যদি ভালো জায়গায় সুযোগ পায় কার এতো মাথা ব্যথা? এতো জ্বালা? এরা তো আমাদের দেশের সন্তান ,সম্পদ। তাহলে কেনো আমাদের দেশের সরকার ,শিক্ষামন্ত্রী এ সামান্য বিষয়ে নজর দিচ্ছে না? এরা ভালো জায়গায় না টিকলে বারোটা বছর পর কোথায় যাবে?

তাই মানবতার মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি, উন্নত দেশ হওয়ার ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা, ভর্তি পরীক্ষা এসবের আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আমরা জানি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কিন্তু এই ভর্তি যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত। বারো বছরের পড়ালেখা মূল্যহীন হয়ে যায় যখন একটা বাচ্চা তার মনমতো জায়গায় ভর্তি হতে পারে না।

বারো বছর পর এইচএসসি পাসের কোন সুখ থাকে না। একটা বাচ্চার জীবন নির্ধারণ হয় তার এই কয় মাসের পড়ালেখা আর কোথাও চান্স পাওয়ার উপর। কত জীবন যে কত ভাবে নষ্ট হয়ে যায় শুধু নিজের স্বপ্নের বা পরিবারের স্বপ্নের বিষয়ে পড়তে না পারার কারণে।

যারা তাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় তারা প্রথম ধাপে নিজেদেরকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে। পরের ধাপে অর্থাৎ চাকুরি ক্ষেত্রে এসে আরেকবার পড়তে হয় চরম হতাশায়। তাইতো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে হয়ে যায় ব্যাংকার বা বিসিএস পুলিশ অথবা প্রশাসনিক বিসিএস ক্যাডার, ডাক্তারি পড়ে হয়ে যায় পুলিশ অথবা প্রশাসনিক বিসিএস ক্যাডার, ল নিয়ে পড়ে হচ্ছেন স্কুল শিক্ষক। এই রকম দেখা যাচ্ছে পড়ালেখার সাথে কর্মক্ষেত্রে কোন মিল নেই। তাহলে আমাদের দেশ এগুবে কিভাবে?

জানি না আমাদের কোন প্রজন্ম রক্ষা পাবে এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে। বাংলাদেশের প্রতিটা বাবা মায়ের দুশ্চিন্তা আর নির্ঘুম রাত কাটে বাচ্চার কোথাও ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত। এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার হয়েছেন আমাদের বাবা-মা, আমরা, এবং আমি নিশ্চিত আমাদের পরের প্রজন্মও এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে।

এখন যাদের একটু সামর্থ্য আছে তারা ছেলেমেয়েদের বিদেশ থেকে তাদের কাঙিক্ষত বিষয়ে পড়িয়ে আনছে। এত প্যারা কেউ নিতে চায় না। এরপর তারা তাদের মনমতো চাকুরিও পেয়ে যাচ্ছে। যেখানে পড়তে যাচ্ছে সেই দেশেই তার পড়া শেষ করার সাথে সাথে চাকুরি পেয়ে যাচ্ছে।

তাহলে তারা কেন দেশে ফিরবে? আমাদের দেশে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া শেষ করে ভালো একটা চাকুরিতে না প্রবেশ করা পর্যন্ত বাবা মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শুধু এসব কারণেই এখন বিদেশে প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়তে যাছে এবং আর ফিরছে না। এই জন্য কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী আমাদের দেশের সিস্টেম। দেশ থেকে মেধাবীদেরকে নিয়ে অন্যদেশ তাদের কাজে লাগাচ্ছে আর আমরা অবহেলা করে তাদের ঠেলে দিচ্ছি। এজন্য আমরাই দায়ী, দায়ী আমাদের সিস্টেম।

সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে!

লেখক: আইনজীবী। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সহকারী এটর্নি জেনারেল।

এইচআর/জিকেএস

আমাদের দেশে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া শেষ করে ভালো একটা চাকুরিতে না প্রবেশ করা পর্যন্ত বাবা মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শুধু এসব কারণেই এখন বিদেশে প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়তে যাছে এবং আর ফিরছে না। এই জন্য কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী আমাদের দেশের সিস্টেম। দেশ থেকে মেধাবীদেরকে নিয়ে অন্যদেশ তাদের কাজে লাগাচ্ছে আর আমরা অবহেলা করে তাদের ঠেলে দিচ্ছি। এজন্য আমরাই দায়ী, দায়ী আমাদের সিস্টেম।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]