বিয়ে করে সম্মান না দিলে একসঙ্গে বসবাস করা যায় না : অলি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫৯ এএম, ০৪ এপ্রিল ২০১৮
বিয়ে করে সম্মান না দিলে একসঙ্গে বসবাস করা যায় না : অলি

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম বলেছেন, ‘এখনও সময় আছে, সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে, শুধু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করলে হবে না। মানুষ যদি বিয়ে করে বউকে ৫০ ভরি স্বর্ণও দেয়, কিন্তু তার যদি ইজ্জত না দেয় তাহলে আর তার স্ত্রী ওই ঘর করতে পারে না। তেমনি একজন পুরুষকেও যদি সেভাবে সম্মান করা না হয় সেও কিন্তু একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘প্রত্যেককে আমাদের নিয়মনীতির মধ্যে থাকতে হবে, শুধু সেতু করলাম, রাস্তা করলাম। বাংলাদেশ জয় হয়ে গেছে। এটা ঠিক না। মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য মানুষের কাছে যেতে হবে।’

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দলের ঢাকা মহানগর সম্মেলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবির আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়েছে মন্তব্য করে বিএনপির এই সাবেক নেতা বলেন, ‘বিএনপি হঠাৎ করে ঝিমিয়ে গেছে কেন বুঝতে পারছি না। আমরা আশা করছি তারা ২০ দলীয় জোটের নেতাদের নিয়ে বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য কাজ করবেন। আমরাও প্রস্তুত আছি। বেগম জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’

অলি আহমেদ বলেন, ‘এগিয়ে যেতে হবে, সবাই সত্যকে ধারণ করেন, দেশকে সাহায্য করেন। জনগণকে সঠিক নির্দেশনা দেন।’

তিনি বলেন, ‘সত্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, ভুলভ্রান্তি আমরা করেছি, সেগুলো টানাটানি করে লাভ নাই। জনগণ উপকৃত হবে না। জনগণ যেভাবে উপকৃত হয়, সেভাবে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। কেউ কারও দোষারোপ দিয়ে লাভ নাই। যা হয়েছে সেটা ভুলে যান। আগামীকাল থেকে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে। দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো। ন্যায়বিচার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। গুম, খুনের রাজনীতি থেকে আমরা কীভাবে বের হবো। জনগণ নির্বিঘ্নে চলাচল করবে সামাজিক নিরাপত্তা থাকবে। প্রত্যেকটা জায়গা নাজুক অবস্থা। সব জায়গায় নৈরাজ্য চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেন, অন্য বাংক বলেন, এ হলো লুটেরাদের জন্য করা হয়েছে। সেমিনার করে বক্তব্য দিয়ে দেশের দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। এটা যদি হতো তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে দিয়ে প্রত্যেক দিন আমরা সেমিনার করলে বাংলাদেশের কোনো দুর্নীতিবাজ হতো, রেপ কেস হতো না।’

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘আজকে কোনো অফিসে যান টাকা ছাড়া কাজ হয় না। এটা আজকে থেকে না, বহুদিন আগে থেকে। ২০ বছর আগে থেকে এই অবস্থা বিরাজমান। এটা প্রধানমন্ত্রী বা সরকারে যারা আছেন কারো জন্য মঙ্গলজনক নয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অপমানিত বোধ করি, কার জন্য যুদ্ধ করলাম, কীসের জন্য যুদ্ধ করলাম। এই দুর্নীতিযুক্ত দেশের জন্য, যেখানে ন্যায়বিচার নাই। মানুষ পদে পদে অত্যাচারিত হচ্ছে এই জন্য তো যুদ্ধ করি নাই। আমরা আজকে যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছি রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে ওইভাবে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান নির্যাতন করেছে। তুলনামুলকভাবে মাথা ঠাণ্ডা রেখে চিন্তা করেন, তখন কিন্তু সমাজে এভাবে দুর্নীতি ছিল না। এত অস্থিরতা ছিল না। আজ মানুষ কেউ শান্তি পাচ্ছে না। যে দুর্নীতি করছে সেও শান্তিতে নেই, যে অভাবগ্রস্ত সেও শান্তিতে নেই। বাংলাদেশে কেউ শান্তিতে নেই। ’

সরকারবিরোধী জোটের এই নেতা বলেন, ‘এই সরকার আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি তারা অনেকগুলো উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। ভালো ভালো কাজ করেছে। কিন্তু জনগণের হৃদয় কি তারা জয় করতে পেরেছে? জনগণের হৃদয় তারা জয় করতে পারে নাই। তারা জানে যে এখানে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে ৫০টির ওপরে তারা আসন পাবে না।’

তিনি বলেন, ‘এটা সরকার জানে। এই যদি সরকারের অবস্থা হয়। আগামী পাঁচ বছর আরও ক্ষমতায় থাকবেন। তারপর কোথায় যাবেন? বয়স তো আর থেমে থাকবে না। গায়ের জোরও এখন যেমন আছে, সে রকম থাকবে না। দেশটাকে কি ধ্বংস করা আমদের লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু কি এটাই চেয়েছিলেন দেশটা ধ্বংসস করার জন্য। তিনিও তো চেয়েছিলেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সামাজিক সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কিন্তু আমরা এ লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে।’

অলি আহমেদ বলেন, ‘যে সমস্ত লোক গত ১৭/১৮/১৯ বছরে বাংলাদেশের টাকা লুণ্ঠন করে দুবাইতে সম্পদ করেছে, ব্যাংককে সম্পদ করেছে, ইন্দোনেশিয়ায় করেছে, আমেরিকায় করেছে, কানাডায় করেছে, এখন সিটিজেনশিপ নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কি সরকার এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন কি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে?’

তিনি বলেন, ‘এই সরকার তো চিরস্থায়ী নয়, আমরা কেউ চিরস্থায়ী নয়, কেন আমরা আল্লাহকে ভয় করি না, ধর্মকে ভয় করি না। নিজের ধর্ম কি বলেছে মানুষের অত্যাচার করো। সম্পদ লুণ্ঠন করো, গুম করো, হত্যা করো। অবিচার করো এটাতো কোনো ধর্মে নাই। আমরা কি কাফের? আমরা কি মানুষ নাকি আমরা জানোয়ার? আমরা এখন জানোয়ারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।’

অলি আহমেদ বলেন, ‘আজ যে যেখানে আছে তার দেশের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তরুণ ক্যাপ্টেন হিসেবে। কারো বাপের জন্য, মায়ের জন্য যাইনি, এই দেশের মানুষের জন্য যুদ্ধ করেছি। সেই দরদটা কোথায় আজকে? আমাদের সকলের মধ্যে এ দরদটা কেন আসছে না? ’

তিনি বলেন, ‘আমরা অনুরোধ করবো সরকারকে, আপনারাও সেটা উপলব্ধি করেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। বেগম খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করেন। তাকে যে মামলায় আবদ্ধ করা হয়েছে, এই মামলায় তাকে কখনও আবদ্ধ করা যায় না। আজকে বিচার বিভাগ বলেন দলীয় করণ। সরকার ভুলে গেছে, আমরাও ভুলে গিয়েছিলাম, আমরাও যখন সরকারে ছিলাম তখন আমরাও দলের অনেককে চাকরি দিয়েছিলাম। চাকরির পর তারা আর দলের থাকে না, তারা সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে। যেমন মহীউদ্দিন খান আলমগীরকে বিএনপি সরকার সচিব বানিয়েছিল, তিনিই কিন্তু বিএনপির বিরুদ্ধে মঞ্চ তৈরি করেছিলেন। সুতরাং এই সরকারের বিরুদ্ধেও যে আগামীতে মঞ্চ হবে না এটা কেউ নিশ্চিত বলতে পারবে না।’

এলডিপির এই নেতা বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, নির্বাচনের পথ সুগম করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। আওয়ামী লীগ শুধু প্রত্যেকটা জায়গায় গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট চাইছে। কালকে আমি যখন এয়ারপোর্ট থেকে আসছিলাম রাত্রে বেলা দেখলাম সমস্ত বিদ্যুতের খাম্বার সাথে সরকারি পয়সা খরচ করে নৌকা টাঙানো হয়েছে। এটারও বিচার হতে হবে। সরকারি পয়সা দিয়ে কীভাবে করলো?’

অাসন বণ্টন সংক্রান্ত এক চিরকুট প্রশ্নের জবাবে অলি বলেন, ‘ এখনও বিয়ে হয় নাই, ছেলে কখনও হবে সেটা বলে লাভ আছে? সময় আসুক, সময়মতো বলবো।’

সম্মেলনে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক বলেন, ‘দেশ, জাতি, গণতন্ত্র ও ২০ দলের জন্য ক্রান্তিকাল চলছে। এই ক্রান্তিকালে জোটের অবিভাবককে দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে। এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ ২০১৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।’

সম্মেলনে মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ইব্রা মিয়া সভাপতিত্ব করলেও তাকে বক্তব্য দিতে দেয়া হয়নি।

অন্যদের মধ্যে এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভূইয়া, এনডিপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা, এলডিপির আবদুল করিম আব্বাসী, আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান, আবদুল গনি, ইঞ্জিনিয়ার কামাল মোস্তফা, যুগ্ম মহাসচিব তমিজউদ্দিন টিটু, উপদেষ্টা অধ্যাপিকা করিমা খাতুন, ড. আবু জাফর সিদ্দিকী, সৈয়দ ইবরাহিম রনক, এমএ বাশার, অধ্যাপক আবদুস সালাম, অবাক হোসেন রনি প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

কেএইচ/বিএ