সুতোর টানে


প্রকাশিত: ০৫:৪৪ এএম, ২৪ মার্চ ২০১৬

সুলতান সাহেবকে আজ সন্ধ্যেবেলা নিজের কবর নিজেকেই খুঁড়তে হচ্ছে। তাঁর সাথে আরও বেশ ক’জন যোগ হয়েছে। ক্যান্টনমেন্টে বন্দী শিবিরে নিয়মিত অমানবিক অত্যাচারের পাশাপাশি কবর খোঁড়া ছিল আরও একটি কাজ। দিনটি ছিল ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১। তাঁর বয়স তখন ১৭ বছর। তিনি ভাবেননি একদিন নিজের কবর নিজেকেই খুঁড়তে হবে।

কবর খোঁড়ানোর পর সেখানে তাঁদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান হোল। যখন ব্রাশ ফায়ার শুরু করবে পাকিস্তানী মিলিটারিরা, অমনি মুষলধারে বৃষ্টি নেমে এলো। প্রবল বৃষ্টি। অন্ধকার আকাশে বৃষ্টির ঝাঁপটা আর ভয়ে সুলতান সাহেব নিজেই নিজের খোঁড়া কবরে পড়ে গেলেন। ব্রাশ ফায়ার শুরু হোল। বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ল। মিলিটারিরা কবরে উকি না মেরেই চলে গেলো ব্যারাকে।

সুলতান সাহেব মাটির সোঁদা গন্ধ পাচ্ছেন। বৃষ্টির বড় বড় ফোটাগুলো তাঁকে বাস্তব আর অবাস্তবের ঘোরে নিয়ে যাচ্ছে। নিজের খোঁড়া কবরে শুয়ে অসার অবস্থাতে সব পুরনো স্মৃতি গুলো তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

তাঁর জন্ম ৭ জুন, ১৯৫৩ তে। চট্টগ্রামে। পাহাড়তলির রেল ষ্টেশনের পাশে একটি পাহাড়ের উপরের সেই বাংলো বাড়ির স্মৃতিটা মনে এসেও যেন মুছে গেলো তাঁর। বাবা বদরুদ্দিন আহমেদ ছিলেন ভেড়ামারাতে  একজন সরকারী কর্মকর্তা। সেখানের স্মৃতি কেবল মার্বেল আর ডাংগুলি খেলার। তাঁর মনে পড়ে গেলো ঢাকার মোহাম্মাদপুরের বাসার কথা, লালমাটিয়া স্কুল হয়ে ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হবার স্মৃতি, ঢাকা কলেজের প্রিয় শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সাইদ সারের ক্লাসগুলোর মধুর স্মৃতি।

সব স্মৃতিগুলো জটিল হয়ে এলো ১৯৭১ সালে। তখন তিনি ঢাকা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। পড়াশুনাতে বেশ ব্যস্ত। তারি মাঝে তিনি উপলব্ধি করলেন, দেশের সাধারণ মানুষরা কিভাবে তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে দেশের জন্য। তাঁর বড় দু`ভাই তখন ভারতে চলে গিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে। তিনিও যেতে চাইলেন। মনটা বাধ সাধল। তিনি চলে গেলে তাঁর বাবা-মাকে দেখবে কে? সে সময় মুক্তিযুদ্ধের নয় নাম্বার সেক্টরের কমান্ডার মনোয়ার আলি সাহেবের সাথে পরিচয় হোল তাঁর। প্রায়ই কথাবার্তা হতো তাঁদের। মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ সঠিকভাবে চালানোর জন্য প্রচার প্রসারের দরকার ছিল। তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হোল এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার। এজন্য দরকার ছিল একটা ছাপার প্রেসের। অতো বড় একটা মেশিন তো দিন দুপুরে দখল করার সুযোগ ছিল না।  তিনি সময় নিয়ে মেশিনটি দেখলেন। বিকল্প হিসেবে চমৎকার একটি পরিকল্পনা করে ফেললেন । যুতসই প্রযুক্তিতে বানিয়ে ফেললেন একটি চমৎকার ছাপানোর যন্ত্র, ‘সাইক্লোস্টাইল মেশিন’। (এ মেশিন পরবর্তী সময়ে তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। গবেষক ও আবিষ্কারক হিসেবে দেশে বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। ) প্রতিদিন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন পরিকল্পনাগুলো সেই ছাপানোর যন্ত্রে ছাপিয়ে বিতরণ করতেন সব মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

ধীরে ধীরে তিনি শিখে গেলেন কিভাবে গ্রেনেড হামলা করতে হয়। তাঁর প্রথম অপারেশন ছিল ‘ধানমণ্ডির পাওয়ার স্টেশনে’ সফল হামলা। তাঁর এসব কাজের কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল তাঁর এক প্রতিবেশী যে ছিল শান্তি বাহিনীর সদস্য। ২৩ শে জুলাই  রাতে পাকিস্তানী আর্মি তাঁদের বাড়ি ঘিরে ফেললো। তাঁকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হোল। শুরু হোল আন্তহীন আমানবিক নির্যাতন। ছাদের রডে ঝুলিয়ে তাঁকে পেটানো হতো, চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো। তাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হতো। তিনি অস্বীকার করতেন। জানতেন স্বীকার করলে সেটিই হবে সবকিছুর শেষ। মাঝে মধ্যে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো আর্মি অফিসারদের বাসা পরিষ্কার করার জন্য।

গত রাত থেকে চলেছে তাঁর প্রতি লাগাতার নির্মমতা। অন্ধকার বাড়ার সাথেই বৃষ্টি বাড়ছিল। সব ঝুঁকি নিয়ে কবর থেকে বের হলেন তিনি। সারা রাত কাটালেন বনের মাঝে। ভয় বা অন্য কিছু কাজ করেনি মাথাতে সে সময়। এক সহৃদয় স্কুটার চালক তাঁকে বাসার ধারে নামিয়ে দিল। ঢাকা ছেড়ে চলে আসলেন রাজশাহীতে তিনি। দেশ স্বাধীন হোল। রাজশাহীর প্রথম বিজয় মিছিলে ছিলেন তিনি।

DR.-SULTANসুলতান ভাই আমার খুব কাছে থেকে দেখা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার অনুভূতির কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “ যুদ্ধের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা বড় কঠিন। আমি নিজের কবর থেকে উঠে এসেছি। যুদ্ধের সময় মানুষের মৃত্যু আমার কোলে হয়েছে। আমি মৃত্যুর আগে আমার সহযোদ্ধার মুখে পানি তুলে দিয়েছি। তাঁদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করে ভাসে।” এসব বলতে বলতে অস্থির হয়ে যান তিনি। চোখ তাঁর পানিতে ভরে ওঠে।

যুদ্ধ শেষে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেন তিনি। লাশ কাটা ঘরে গেলেই মনটা অস্থির হয়ে যেত তাঁর। অনেক স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু ওখানে গেলেই অনেক স্মৃতি ফিরে আসতো তাঁর। একটা অস্থিরতা তাঁকে তাড়া করে বেড়ায় সব সময়। মেডিক্যাল কলেজ শেষ করে অনেক কিছু করতে চাইলেন দেশে। বালির বাঁধের মতো একে একে ভেঙ্গে গেলো সব। একটি বিশাল হতাশার মাঝে দেশ ছাড়লেন তিনি। চলে গেলেন মধ্য প্রাচ্যে। ছ’মাস পরেই চলে এলেন আমেরিকাতে। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনে ইতিহাস কষ্ট-দুঃখ- আনন্দে ভরা। জীবনের দুঃসময়ে ভেঙ্গে না পড়ে, তা কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় তাঁর জীবন্ত সাক্ষী ডাঃ সুলতান সালাহ্ উদ্দিন আহমেদ।

ফ্লোরিডার মায়ামিতে একমাত্র মেয়ে জেসমিন আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন তিনি। নোভা সাউথ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটি আর মায়ামি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন তিনি। মানব সেবার ব্রত নিয়ে দেশে বিদেশে ছুটে বেড়ান। কখনও ছুটে যান হাইতিতে, কখনও বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়। `হোপ ফাউন্ডেশন ` নামের এক মহৎ প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে দেশের জন্য অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

সুলতান সাহেব মনে প্রানে বিশ্বাস করেন, যে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি, যে জন্য ফিরে এসেছেন তিনি কবর থেকে, সে স্বাধীনতা আসবে যখন মানুষ মুক্তি পাবে ক্ষুধা- রোগ- জরা-অনাচার- অত্যাচার থেকে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “ জীবন সুতোর টানে কোথায় যাবেন তিনি?”

ধীরে ধীরে তিনি বললেন:
‘সবই পেয়েছি ছোট্ট এ জীবনে। তারপরেও সব কিছু ছাপিয়ে চোখের সামনে ভাসে আমার প্রিয় দেশ। আমার বাংলাদেশ। আমি ভাবি, কোন এক সুতোর টানে আমি ছুটে চলেছি। কিন্তু তারপরও পেছন থেকে কে যেন আমাকে ডাকে। মনের গহীনে কে যেন গেয়ে ওঠেঃ
কোন দিন আসিবে বন্ধু
কয়া যাও, কয়া যাও রে!”

লেখক : ডা. বিএম আতিকুজ্জামান, পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিভাগীয় প্রধান, ফ্লোরিডা হাসপাতাল, ফ্যাকাল্টি, কলেজ অব মেডিসিন, সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি

এইচআর/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।