আবেগ রয়ে যায়, তবুও বের করে দেয়
চোখ ছলছল করছে। বুকে চাপা কান্না। দোতলায় দাঁড়িয়ে এক পর্যায়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই কাঁদতে থাকলেন। অতি আপনজনকে হারিয়েই মানুষ অমন আবেগের কান্না প্রকাশ করে থাকে।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের দোতলার সিঁড়ির নিচের দিকে তাকিয়েই আর আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার প্রশান্ত। এর আগেও ঢাকা এসে এই স্মৃতিঘর দেখে গেছেন। এবারে ৮ ও ১০ বছরের দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। এসেছেন স্থানীয় এমপির কাছে বিশেষ দরকারে। উঠেছেন মিরপুরে বোনের বাসায়।
২৬ মার্চ সারাদেশে যখন স্বাধীনতা দিবসের নানা আয়োজন চলছে, তখন তিনি মেয়েদের নিয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে। কিন্তু যানজটের শহর মিরপুর থেকে ধানমন্ডি আসতেই বেলা পার। টিকিট কেটে সবে জাদুঘরের দোতলায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে চোখ রাখতেই আবেগের ঘনঘটা।
দেয়ালে ঘাতকের গুলির দাগ আর শিল্পী শাহাবুদ্দিনের আঁকা বঙ্গবন্ধুর সেই গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত ছবি দেখেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারছিলেন না প্রশান্ত। বাবার কান্না দেখে দুই মেয়েও বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশের। প্রশান্তের আবেগের কান্না উপস্থিত অন্যান্য দর্শনার্থীর চোখেও জলে এনে দেয়।
প্রশান্তের আবেগ না ফুরালেও মুহূর্তেই ফুরিয়ে যায় স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের সময়সীমা। দর্শনার্থীদের বের করে দিতে চলে দারোয়ান, নিরাপত্তারক্ষীদের মুহুর্মুহু বাঁশি ফুঁকানো। এক প্রকার জোর করেই বের করে দেয়া হয় প্রশান্তকে। মেয়েদের আর ঘুরে দেখানোর সুযোগ পান না বঙ্গবন্ধুর এই অন্ধ ভক্ত। মেয়েদের হাত ধরে যখন গেট দিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন পিছন ফিরে বার বার জাদুঘরের দিকে তাকাচ্ছিলেন মধ্যবয়সী প্রশান্ত।
এখানে এসে দর্শনার্থীরা প্রশান্তের অকৃত্রিম আবেগ প্রকাশ করলেও সেই আবেগ যেন দাগ কাটে না জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা মানুষদের। আবেগ নয়, ঘঁড়ির কাটা দেখেই রক্ষীদের তাদের দায়িত্ব পালন। বিকেল ৫টা মানেই দ্বার বন্ধ হওয়া। এক মিনিট এদিক ওদিক হওয়া মানেই মহাভারত অশুদ্ধ।
জাদুঘরের ভবন দুটি সময় নিয়ে পরিদর্শন করতে গিয়ে অনেককেই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেককেই দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয় এখানকার নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয়, নিরাপত্তাকর্মী মোবারক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের ডিউটি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এই সময়ে দর্শনার্থীদের সঙ্গে সহযোগিতা করা হয়। বিকেল ৫টার মধ্যেই সবাইকে জাদুঘর থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশনা আছে। মূলত নিরাপত্তার কারণেই দর্শনার্থীদের ৫টার পরে আর সময় দেয়ার সুযোগ নেই।
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি বিশেষ জাদুঘর, যা বাঙালি জাতির অন্যতম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণার্থে স্থাপন করা হয়েছে।
ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাপূর্ব কাল থেকেই বসবাস করতেন। তিনি যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তখন এই ভবনেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট তিনি ও তার পরিবারের কিছু সামগ্রীর সংগ্রহ নিয়ে এ ভবনে জাদুঘর স্থাপন করা হয়।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বুধবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে।
এএসএস/জেএইচ/এএইচ/এআরএস/পিআর