জ্ঞানচর্চার অনন্য প্রতীক

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮৬ বছর উদযাপন

আফছার হোসাইন
আফছার হোসাইন আফছার হোসাইন মিশর
প্রকাশিত: ০৪:২৭ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১০৮৬ বছরে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়

ইসলামি জ্ঞানচর্চা, ইবাদত ও সভ্যতার এক মহিমান্বিত প্রতীক আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় উদযাপন করছে ১০৮৬ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্য। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি মসজিদ বা শিক্ষাকেন্দ্র নয়, বরং বিশ্ব মুসলিমের ধর্মীয় ঐক্যের এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ১০৮৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রধান মসজিদ প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি অধ্যাপক ড. নাজির আইয়াদ বলেন, আল-আজহার কোনো শাসকের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি কেবল জ্ঞানের শক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর খেয়াল-খুশির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮৬ বছর উদযাপন

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. সালামা জুমা দাউদ তার বক্তব্যে বলেন, আল-আজহারের পণ্ডিতরা ছিলেন জ্ঞানের এক সুবিশাল মহাসমুদ্র, যেখান থেকে সাধারণ মানুষ তাদের বিস্তৃত চিন্তা ও জ্ঞানভান্ডার থেকে তৃষ্ণা মেটাতো। তাদের অনেকেই ছিলেন বহুমাত্রিক ও বিশ্বকোষীয় (এনসাইক্লোপেডিক) জ্ঞানের অধিকারী।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, কায়রো নগরী প্রতিষ্ঠার পরপরই শুরু হয় আল-আজহারের নির্মাণকাজ। ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ লি দ্বিনিল্লাহর উদ্যোগে ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মাত্র ২৭ মাসে নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং ৩৬১ হিজরির ৭ রমজান (২১ জুন ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ), শুক্রবার—প্রথমবারের মতো এখানে জামাতে সালাত আদায় করা হয়। সেদিন থেকেই সূচনা ঘটে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এক অবিচ্ছিন্ন যাত্রার।

পরবর্তীসময়ে ১১৭২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সালাউদ্দিন আল আইয়ুবী আল-আজহারকে চার মাযহাবের আদলে সুন্নি ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় মারকাজে রূপান্তর করেন। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন ধারায় প্রবেশ করে এবং সুন্নি জ্ঞানচর্চার বিশ্বজনীন কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে থাকে।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮৬ বছর উদযাপন

ইতিহাসে বিভিন্ন জাতীয় সংকট ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনেও আল-আজহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বিদেশি আগ্রাসন ও ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে মিশর-এর জনমানসে সচেতনতা সৃষ্টিতে আল-আজহারের আলেম ও শিক্ষার্থীদের অবদান সুপরিচিত।

যুগে যুগে বিভিন্ন শাসনামলে আল-আজহারের সম্প্রসারণ ও সংস্কার হয়েছে। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সংস্কার সম্পন্ন হয় ১৪৩৯ হিজরি/২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে, যা এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে নতুন মাত্রায় উজ্জ্বল করেছে।

বর্তমানে এই ঐতিহাসিক মসজিদ কমপ্লেক্সে রয়েছে ছয়টি মিহরাব, একটি মিম্বর, ৮টি প্রবেশদ্বার, ৫টি মিনার এবং ৩৮০-এরও বেশি মার্বেল স্তম্ভ। প্রায় ১২,০০০ বর্গমিটার বিস্তৃত এই স্থাপত্য নিদর্শন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি সভ্যতার জ্ঞানভান্ডার ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক হিসেবে সমুজ্জ্বল।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮৬ বছর উদযাপন

আল-আজহার আজও বিশ্ব মুসলিমের কাছে আলোর দিশারী—এক জীবন্ত ইতিহাস, এক অমলিন ঐতিহ্য।

এসএইচএস/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]