নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৩:৪১ পিএম, ২৩ মার্চ ২০২৬

কুয়ালালামপুরের হৃদয়ে, ঐতিহাসিক দাতারান মেরদেকার পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী বাঙ্গুনান সুলতান আবদুল সামাদ ভবন। তামার গম্বুজ, সুউচ্চ ঘড়িঘর আর মনোমুগ্ধকর স্থাপত্যশৈলীর কারণে এটি বহুদিন ধরেই মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রতীকী নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

একটা সময় এই ভবনটিকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ সীমাবদ্ধ ছিল বাইরের সৌন্দর্যেই। কিন্তু এখন সেই দৃশ্যপট বদলেছে। ‘ওয়ারিসান কেএল’ উদ্যোগের আওতায় ব্যাপক সংস্কারের পর ভবনটির দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে সবার জন্য। ফলে পর্যটকরা এখন শুধু দেখেই নয়, ভেতরে ঢুকে ইতিহাসকে অনুভব করার সুযোগ পাচ্ছেন।

নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া যায়। কুয়ালালামপুরের জন্মলগ্ন থেকে আধুনিক নগরীতে রূপান্তরের গল্প তুলে ধরা হয়েছে নানা ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লে, শহরের মডেল এবং পরিকল্পিত প্রদর্শনীর মাধ্যমে। শুধু তথ্য নয় প্রতিটি গ্যালারিই যেন একেকটি জীবন্ত গল্প।

ঢাকাগামী এক পর্যটক নাসির উদ্দিন বলেন, বাইরে থেকে ভবনটা অনেকবার দেখেছি, কিন্তু ভেতরে ঢুকে যে এত সুন্দরভাবে ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে তা সত্যিই অবাক করেছে। মনে হচ্ছিল, আমি যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।

নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

ভারত থেকে আসা পর্যটক প্রিয়া শর্মার অনুভূতি আরও ভিন্ন এখানে প্রযুক্তি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধন দারুণ। বিশেষ করে ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লেগুলো শিশুদের জন্যও খুব শিক্ষণীয়।

সংস্কারের পর ভবনটিতে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক গ্যালারি, ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনী, ক্যাফে এবং বিশ্রামস্থল। ফলে এটি এখন শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয় বরং পরিবার, বন্ধু কিংবা পর্যটকদের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার কেন্দ্র।

নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে খাজানাহ নাসিওনাল বেরহাদ, সঙ্গে ছিল কুয়ালালামপুর সিটি হলের সহায়তা।

১৮৯৭ সালে নির্মিত এই ভবনটি একসময় ব্রিটিশ মালয়ার প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে এটি আদালত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে। আর ঠিক পাশের দাতারান মেরদেকাতেই ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের মতো মালয়ান পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সূচনা ঘটে যা এই এলাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী হান্না ইয়েও মুসলিমদের পরিবারসহ এই ভবন পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, সময় বের করে পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরে আসা এবং ছবি তোলা এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে।

নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

ঈদের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবং তার স্ত্রী সিতি হাসমাহ মোহাম্মদ আলী-ও নবসংস্কার করা ভবনটি ঘুরে দেখেন। তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং হাস্যরসাত্মক কথোপকথন সফরটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

শুধু এই ভবনই নয় কুয়ালালামপুরের আশপাশের আরও কিছু ঐতিহাসিক এলাকা যেমন মসজিদ জামেক এলাকা, পেতালিং স্ট্রিট-এর পুরোনো দোকানঘর কিংবা ব্রিকফিল্ডস লিটল ইন্ডিয়া-সবই শহরের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

নতুন রূপে সুলতান আবদুল সামাদ ভবন

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বাঙ্গুনান সুলতান আবদুল সামাদ ভবন শুধু একটি স্থাপনা নয় এটি মালয়েশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রতীক।

সফল এই সংস্কার প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো আধুনিক শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনভাবে বেঁচে উঠতে পারে। আর সেই সঙ্গে হয়ে উঠতে পারে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনস্থলের এক অনন্য কেন্দ্র।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]