কেমন আছে বুড়িগঙ্গার সঙ্গী ব্রহ্মপুত্র-শীতলক্ষ্যা

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৬:৪৬ পিএম, ০২ আগস্ট ২০২১

টেমস নদীর তীরে গড়ে উঠেছে লন্ডন শহর। হাডসন নদীর তীরে নিউইয়র্ক। মারে ডার্লিং নদীর তীরে সিডনির অপেরা হাউস। সিন নদীর তীরে প্যারিস, যমুনা নদীর তীরে তাজমহলের শহর আগ্রা। সুইডেনের ম্যালারেন এবং বাল্টিক সাগরের তীরে গড়ে উঠেছে স্টকহোম।

নবগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আমার গ্রাম নহাটা। চিত্রা নদীর তীরে আমার নানাবাড়ি। আর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে আজ থেকে ৪০০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল বাংলার মোঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট জাহাঙ্গীরের শহর ঢাকা। ঢাকা মহানগরের চারপাশে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা এ চারটি নদ।

ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল যা ধলেশ্বরী হয়ে সোজা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মিশেছিল কোনো একদিন।

বুড়িগঙ্গা কোনো এক সময় জোয়ার ভাটা প্রভাবিত একটি নদী ছিল। নদীটির নামকরণ বুড়িগঙ্গা করার পেছনে একটি কাহিনিও রয়েছে। প্রাচীনকালে গঙ্গা নদীর একটি প্রবাহ ধলেশ্বরীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হত। ধীরে ধীরে এ প্রবাহটি তার গতিপথ পরিবর্তন করার ফলে একটা সময় গঙ্গার সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরবর্তীতে এ বিচ্ছিন্ন প্রবাহটি বুড়িগঙ্গা নামে অভিহিত হয়। বুড়িগঙ্গা তুমি কি সেই আগের মতোই আছো? নাকি একেবারেই বুড়ি হয়ে গেছো? নাকি মরে বেঁচে আছ? তুমি কি মাঝে মধ্যে বেড়াতে যাও সেই বঙ্গোপসাগরে? ধলেশ্বরীর সঙ্গে কি তোমার দেখা হয়? তোমার সেই ছোটবেলার সাথীরা ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যা কেমন আছে?

তুমি কি সত্যিই অচল হয়ে পড়েছ? তোমার ১৭ কোটি সন্তানের মধ্যে কেউ কি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে না? কারো কি সাধ হয় না সেই মোঘলদের মতো তোমার জোয়ারভাটার রূপ দেখে বিস্ময়াভিভূত হতে?

আমি দেখেছি পৃথিবীর বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে বড় বড় নদীর পাড়ে। তারা কিন্তু ভালোই আছে। তারা সত্যি গর্বিত তাদের শহর নিয়ে। তুমি তো আবার বুড়ি সেজেছো সেই অনেক আগে, তা তোমার ঢাকা শহরের খবর কী? তোমার শহরবাসীদের কি মন চায় না হাঁটতে তোমার পাশ দিয়ে? সঙ্গিনীর হাত ধরে তোমার পাশ দিয়ে সুন্দর বিকেলে একটু হাঁটাহাঁটি কি হতে পারে না?

আমি তো হাঁটি প্রতিদিন সুইডেনের বাল্টিক সাগরের তীর দিয়ে। কোনো সময় একা, কোনো সময় প্রিয়জনকে নিয়ে, স্ত্রী, ভাই বা বন্ধুকে নিয়ে। মাঝে মধ্যে ছবিতে দেখি আমার সেই ছোটবেলার নদীগুলোকে। তারাও তেমন ভালো নেই। তাদের পুরো শরীরে কচুরিপানাতে ঢাকা, ময়লা আবর্জনায় ভরা।

শুনেছি তোমার অবস্থা আরো খারাপ। সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করা তোমার ঠিক হয়নি। বন্ধ করার বা যোগাযোগ রাখার পেছনে তোমার দোষ দেয়া ঠিক হবে না। ভাবছি নতুন প্রজন্মদের বলবো তারা যদি কিছু করতে পারে তোমার জন্য।

কোনো এক সময় কবি গুরু রবি ঠাকুরকে বলা হলো বাংলার মানুষের জন্য কিছু কর? তিনি হুড়হুড় করে নতুন প্রজন্মকে কবিতার ছন্দে লিখে দিলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ আমি তো আবার কবি নই কিভাবে যে ওদেরকে বলি!

তবে আমি উপরের যেসব শহরের কথা তুলে ধরেছি তারা যেমন প্রযুক্তির দিকে উন্নতি করছে, পরিষ্কার-পরিছন্নতার দিক দিয়েও তারা সুন্দরভাবে সেজেগুজে মাথা উঁচু করে আছে, যা আমি নিজের চোখে দেখেছি। কিন্তু তোমার তীরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরটি তেমন সুন্দর করে সাজতে পারেনি। কারণ কি জানো?

কারণ বিশ্বের সব ভালো ভালো শহর তাদের নদীকে বাদ দিয়ে কিছুই ভাবতে পারে না। তাদের কথা নদীর সৌন্দর্য না থাকলে তাদের শহরের চেহারা মূল্যহীন। ঢাকার অবস্থা হয়েছে দেবদাসের পারুর মতো। রূপ আর অহংকার যতই থাকুক তোমাকে নোংরা করে রেখে পৃথিবীতে মুখ দেখাতে চেষ্টা করলেও তা বাস্তবে সম্ভব হবে না, পারুর চেহারার মতো দাগ লেগে আছে। ঢাকার চেহারা তো তোমার প্রতিচ্ছবি মাত্র। তোমাকে বাদ দিয়ে ঢাকা কিভাবে ভালো থাকতে পারে? প্রকৃতির নির্মম পরিহাস। কিছুই কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না?

সারা বিশ্বের গড়ে ওঠা শহর-বন্দর, নদী-নালার পরিবেশ যেমন সুন্দর, বাংলাদেশের শহর-বন্দর, নদী-নালার পরিবেশ তেমন সুন্দর নয় কেন? কারণ সেখানকার মানুষ তাদের শহরের এবং নদীকে সমানভাবে ভালোবাসে। তারা তাদের নদীকে নর্দমায় পরিণত করেনি।

মনে হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনের বেশ মিল রয়েছে। বুড়িগঙ্গাকে উপেক্ষা করে ঢাকাকে সুন্দর করা সম্ভব হবে কি? হবে না। সন্তানের যেমন মঙ্গল হবে না তার বাব-মাকে কষ্টে রেখে তেমন করে ঢাকা কখনও সুন্দর শহর হতে পারবে না বুড়িগঙ্গাকে নর্দমায় পরিপূর্ণ করে রেখে।

১৭ কোটি মানুষের রাজধানী ঢাকা। সেই ঢাকার পাশে যদি নদী থাকতেও তা প্রবাহিত না হয় তাহলে কি হবে সেই রাজধানী দিয়ে? যে নদী ৪০০ বছর আগে ধাইছে সাগর পানে আজ তাকে তিলে তিলে ধ্বংস করা হচ্ছে এবং আমরা ১৭ কোটি মানুষ তা দেখছি অথচ তার জন্য কিছুই করছি না।

সে দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। প্রযুক্তির যুগে বুড়িগঙ্গাকে আবার নতুন জীবন দেয়ার জন্য দেশের সকলকে অনুরোধ করছি। অনুরোধ করছি বাংলাদেশ সরকারকে। বুড়িগঙ্গাকে খনন করে তার সৌন্দর্যকে ফিরিয়ে এনে নদীর দুইধারে ইট পাথর দিয়ে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে। তার পাশে সুন্দর সুন্দর গাছপালা লাগিয়ে বসার ব্যবস্থা করে তাকে ভালোবাসার ছোঁয়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

তবেই হবে ঢাকার আত্মতৃপ্তি এবং বাংলাদেশের রাজধানীর স্বার্থকথা। বুড়িগঙ্গার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে তাকে গণভবনের লেকের মতো করে গড়ে তোলা হোক। বাংলাদেশের বয়স এখন ৫০ বছর হয়েছে, জানি না বুড়িগঙ্গা তোমার বয়স কত? বড় জানতে ইচ্ছে করে।

আজ ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস নজরে পড়লো। সেটি মোমেন মনি লস্কারের। আমি তাকে ফেসবুকের মাধ্যমে চিনি, সেও সুইডেনে থাকে। সে সব সময় দেশের কল্যাণে যখনই ভালো কিছু দেখে সেটা তার পেজে দেয়। ভালোই লেখে।

লিখেছে ‘বুড়িগঙ্গা না হয় বাদ, ঢাকার একটি খালই সংরক্ষণ করতে পারি না, আমরা ও আমাদের মেয়রদ্বয়, কত বড় দূর্ভাগ্য! দেশে আছে সরকার। খালের দুইপাশের বহুতল বিশিষ্ট বাড়ির মালিকদের আমরা কি ধনী (অবৈধ আয়ে), শিক্ষিত ও সুনাগরিক বলব?’ সেখানে কিছু কমেন্টস দেখলাম যেমন ‘চট্টগ্রাম শহরে নালা গুলি এমন ভাবে ভরেছে দুনিয়ার কোনো যন্ত্রই তা সাফ করার ক্ষমতা রাখে না। অধিকাংশ নালার উপর ঘর উঠেছে।’

উত্তরে লিখেছে ‘আপনার সঙ্গে সহমত নই বড়। আমাদের আগ্রহ নেই উদ্ধারে।’ আরেক জন লিখেছে ‘কেমনে করিবে, আপনি দেখেন এটা হাতের কাজ নয়, মেশিনের কাজ। আর খাল নালার দুই পাশে সেই সব যন্ত্রযান দূরের কথা আমি আপনি চলার জন্যই রাস্তা নাই।’

অন্যজন লিখেছেন ‘বড় তাহলে কেয়ামত পর্যন্ত এমনই থাকবে? আইন বা নিয়ম-কানুন বলে কিছুই নেই? সভ্য সমাজ এটা মানবে?’

আলোচনা চলছে ‘ভাই এর থেকে খারাপ হবে শিউর।’

‘ময়লা এখানে ফেলে বাড়িঘর পরিষ্কার করছে।’

‘শুধু টুপি জোব্বায় আতর লাগাইয়া পাক পবিত্র হয়’

‘শুধু চট্টগ্রাম কেন সারা বাংলাদেশের খাল একই অবস্থা বিরাজমান’

‘তারা কথায় পাগলা কাজে না’

‘নদী দখল মুক্ত করতে গিয়ে দেখা গেলো সরকারি দলের এমপি নদীর এক বিশাল জায়গা দখল করে আছে। দেশের উন্নয়নে প্রথম বাধা সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রীসহ বিভিন্ন স্তরের নেতারা।’

jagonews24

উত্তরে বলছে, ‘এ কারণেই নদী ও খাল উদ্ধার হয় না। আইন নাকি সবার জন্য যথার্ত সর্বদা বলে শুনি।’
আমি ছবিটি তুলে ধরেছি এখানে। ছবিটির সম্পর্কে মন্তব্য করেছে। ‘ছবিটি পুরানো এটা দেখার পর একবার সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়েছিল কিন্তু এখনকার অবস্থা আগের থেকে শোচনীয়।’

বদলেছে যুগ, বদলেছে মানুষের প্রয়োজন। বহু গুণে বেড়েছে জনসংখ্যা। বেড়েছে সব কিছুর চাহিদাও। এ কথা সবারই জানা যে মানুষের সব প্রয়োজন মেটানোর উৎস প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রকৃতি। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের কারণে মানুষের চাহিদার আমূল বদল হয়েছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর।

কারখানায় প্রস্তুত হয় মানুষের নিত্যদিনের সামগ্রী। সেই কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন না করে সর্বত্রই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে মাটি এবং সাগরে। আবার সেই বর্জ্য পুড়িয়ে ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসেও ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন সুবিধার জন্য যে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে তা মাটির ক্ষতি করছে। এভাবে পরিবেশের প্রত্যেকটি উপাদান দূষিত হচ্ছে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে।

এমতাবস্থায় গোটা বিশ্বের মানুষ কম বেশি বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। সুইডেন অন্যান্য দেশের চেয়ে একটু বেশি সচেতন বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, তার প্রমাণ গ্রেটা তুনবার্গ। কয়েক মাস ধরে সুইডেনের সব দোকানে প্লাস্টিক ব্যাগের দাম দুই ক্রোনার থেকে সাত ক্রোনার হয়েছে। কাগজের ব্যাগের দাম পলিথিনের তুলনায় কিছুটা কম।

বাসা থেকে ব্যাগ না নিয়ে দোকানে গেলেই একটি ব্যাগের জন্য ৭ ক্রোনার দিতে হয়। আজ ব্যাগ নিতে ভুলে গেছি। একটি ব্যাগ কিনতেই অল্প বয়সী ক্যাশিয়ার বললো, ‘পরিবেশের কথা ভাব, আর কতদিন পৃথিবীর পরিবেশ ধ্বংস করবে?’

বললাম আজ ব্যাগ আনতে ভুলে গেছি, সরি। সে বকবক করে এক গাদা শক্ত কথা শুনিয়ে দিল। এমনকি কোনো এক সময় বলে ফেললো, তোমরা যারা অন্যদেশ থেকে এসেছ পরিবেশের ওপর তোমাদের কোনো রকম রেসপেক্ট নাই। এতক্ষণ মেজাজটা ঠিক ছিল তবে শেষের কথাগুলো বলতেই একটু চোটে গেলাম। দোকানে ভিড় কম মেয়েটিকে একেক করে বলতে শুরু করলাম।

এই মেয়ে শোন, আমাদের বাড়িতে মা কাঠ দিয়ে রান্না করতেন ছোট বেলায়। সেই রান্না করতে যে কাঠ ব্যবহৃত হতো তার অবশিষ্ট যে কয়লা বা ছাই থাকত তা দিয়ে বাড়িতে কাজের লোক থালা বাসুন পরিষ্কার করেছে। কাঠের কয়লা, গাছের ডাল এসব দিয়ে দাঁত ব্রাশ করছি। কাপড় পরিষ্কার করতে ছাই ব্যবহার করতাম। হেঁটে হেঁটে স্কুলে গিয়েছি, গাড়ি বা মোটর চালিয়ে না।

টিভি, কম্পিউটার, কেমিক্যাল জিনিসের ব্যবহার খুব কম করেছি। মাঠে গরু দিয়ে চাষ করেছি, কখনও মেশিন ব্যবহার করিনি। ভেবে দেখো আমি যেভাবে আমার জীবনের কুড়িটি বছর কাটিয়েছি আর তোমার জীবনের কুড়িটি বছর কীভাবে কেটেছে? যেমন তোমার জন্মের শুরুতে তুমি ডায়াপার ব্যবহার করা থেকে শুরু করে সকল ধরনের বিলাসিতায় বড় হয়েছ। যার পেছনে জান কী পরিমাণ কেমিক্যাল ব্যবহার হয়েছে? এখন বলো কে পরিবেশ নষ্ট করেছে, আমি না তুমি?

আমার কথা চলাকালীন বেশ কিছু লোক জড় হয়ে শুনছে। পরে আমাকে অনুরোধ করেছে আমি যেন সুইডিশ নিউজ পেপারে ঘটনাটি তুলে ধরি। তাদের অনুরোধ রাখতে সবে সুইডিশ ভাষায় লেখাটি শেষ করেছি। ভাবলাম বাংলাতেও বিষয়টি তুলে ধরি, তাই এ লেখা। উপরের ঘটনাটির পেছনে যে বিষয়টি জড়িত তা হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ।

সে আবার কী এবং উপরের ঘটনার সঙ্গে পৃথিবীর পরিবেশেরই বা কী সম্পর্ক? আসুন তাহলে জেনে নেই এ বিষয়ের ওপর কিছু তথ্য। পরিবেশের প্রতিটা উপাদানের সু-সমন্বিত রূপই হলো সুস্থ পরিবেশ। এই সু-সমন্বিত রূপের ব্যত্যয়ই পরিবেশের দূষণ ঘটায়। যার কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক মাত্রার অবক্ষয় দেখা দেয়। পরিবেশ বিভিন্ন কারণে দূষিত হতে পারে।

প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও এর জন্য দায়ী। পরিবেশ দূষণের জন্য বিশেষভাবে দায়ী কিছু মারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্য যেগুলোকে আমরা ‘ডার্টি ডজন’ বলি।

এই ১২টি রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে ৮টি কীটনাশক যেমন অলড্রিন (aldrin), ডায়েলড্রিন (dieldrin), ক্লোরডেন (chlordane), এনড্রিন (endrin), হেপ্টাক্লোর (heptachlor), ডিডিটি (DDT), মিরেক্স (mirex), এবং টক্সাফেন (toxaphene)।

দুটি শিল্পজাত রাসায়নিক দ্রব্য যেমন পিসিবি (PCBs), হেক্সাক্লোরোবেনজিন (hexachlorobenzene)। আর অন্য দুটো হলো কারখানায় উৎপাদিত অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত যেমন ডাইওক্সিন (dioxin) এবং ফিউরান (furan)।
খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে পৃথিবীব্যাপী সব পরিবেশের সব ধরনের জীবজন্তুর ওপর তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটায় এই বিষাক্ত পদার্থগুলো। ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম, ক্যান্সার উৎপাদন, ভ্রূণ বিকাশের নানাবিধ সমস্যার মূলেই দায়ী থাকে এই ডার্টি ডজন।

পরিবেশের ভালো মন্দ মানুষের কৃতকর্মের ফল। দিন দিন পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। মানুষ নিষ্ঠুরভাবে প্রকৃতি পরিবেশকে বিনাশ করছে। প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এই যে নির্বিচারে আমরা সৃষ্টিকর্তার সাজানো প্রকৃতির বিনাশ করছি, এতে চূড়ান্ত ভুক্তভোগী কে হচ্ছে?

বিভিন্ন প্রাণীসহ মানুষ প্রকৃতির রোষানলে পড়ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে। আমরা পরিবেশ দূষণ করছি হরদম। পানি দূষণ, বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ, শব্দ দূষণ, চারদিকে দূষণ আর দূষণ।

শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হচ্ছে, পরিবেশ দূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের চরিত্রও দূষিত হয়ে যাচ্ছে। সংখ্যায় মানুষ যেভাবে বাড়ছে, ভালো মানুষ সেভাবে বাড়ছে কি? মানুষ মানুষের ক্ষতি করছে। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি, ঘুষ, অপসংস্কৃতি, মারামারি ইত্যাদি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মানুষ যেন অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যতসব অকল্যাণ, অন্যায় কর্ম সৃষ্টি হচ্ছে সবগুলোর জন্য দায়ী মানুষ।

পরিবেশের দূষিত উপাদান আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। সাগরের পানি দূষিত হওয়ায় বিপন্ন অনেক জলজ জীবন। সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, মৌমাছির সংখ্যা কমছে আশঙ্কাজনক হারে। পরাগায়ণের মাধ্যমে আমাদের বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনে মৌমাছির বিকল্প নেই। তাদের এই দুরবস্থা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

আমরা যদি আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতন না হই, তাহলে আমরা বেশি দিন পৃথিবীতে টিকতে পারব না। আমাদের কু-কর্মের কারণে আমাদের ধ্বংস হবে। পরিবেশ বাঁচানোর প্রথম পদক্ষেপ আমাদেরকেই নিতে হবে। জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণের মাত্রা আরও কমবে।

যেমন প্লাস্টিকের উৎপাদন বন্ধ করতে হবে এবং সেইসঙ্গে তার ব্যবহারও। নতুন প্রজন্ম বেশ ভাবতে শিখেছে যদিও তারাই কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবেশ নষ্টের জন্য দায়ী যা তারা সরাসরি বুঝতে পারছে না।

পৃথিবীকে সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখতে সবাইকে যার যার জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের অস্তিত্ব আরও অনেক বছরের জন্য নিশ্চিত করতে পারব। এখানে আমরা বলতে শুধু সুইডেনকে বুঝলে হবে কি? বাংলাদেশের মানুষ এবং সরকারের কি করণীয় রয়েছে এবং কী প্লান হাতে নেয়া হয়েছে সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে?

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামাজিক পরিবেশ আজ মানুষের দিকে তাকিয়ে আছে। দুই পরিবেশকেই সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে সচেতন ভালো মানুষের কোনো বিকল্প নেই। নিজেদের ভালো রাখার জন্য চলুন প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করি, পরিবেশ সুরক্ষা করি।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]