জাস্টিন ট্রুডোর এবারের চ্যালেঞ্জ

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৪৮ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

আব্দুল্লা রফিক

কানাডার দি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের নিম্ন কক্ষ ‘হাউস অব কমন্স’ এর নির্বাচন হয়ে গেলো ২০ সেপ্টেম্বর। প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে, ফলাফলে গত নির্বাচনের চেয়ে তেমন কোনো তারতম্য হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর দল লিবারেল পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রায় ১৫৮টি আসন পেয়েছে, প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ১২৩টি আসন পেয়েছে।

ফলাফলে কিছুটা তারতম্য হতে পারে ডাকযোগে পাঠানো ভোট এখনো গণনা চলছে এখানে উল্লেখ্য প্রায় দশ লাখের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে ডাকযোগে যার মধ্যে ২০০০০ ভোট দেশের বাইরে থেকে এসেছে। মেজরিটি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন (১৭০টি) থেকে কিছুটা পিছিয়ে আছে তবে একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে মাইনোরিটি সরকার গঠন করবে।

এক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) তাদের পাওয়া ২৬টি আসন নিয়ে সরকারকে সমর্থন করবে অর্থাৎ পলিসি মেকিং হয়তো সরকারকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে আবার তাদের (এনডিপি) কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নে সরকার সাহায্য করবে।

কানাডার ইতিহাসে খুব একটা কোয়ালিশন সরকারের (সরকারের অংশ হয়ে থাকা দল) প্রচলন দেখা যায় না। তৃতীয় যে দল দলটি (এন ডিপি) সরকারকে সমর্থন করছে - তারা যদিও সরকারে যোগদান করছে না কিন্তু কোনো কারণে যদি সমর্থন উঠিয়ে নেয় তাইলে সরকার আর টিকতে পারবে না।

লিবারেল পার্টি প্রধান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো মাত্র দুই বছরের মাথায় সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান ব্রিটিশ রানী কুইন এলিজাবেথ এর নিযুক্ত গভর্নর জেনারেলের মাধ্যমে আবার ভোট দিয়েছেন কারণ তার ধারণা ছিল এখন নির্বাচন হলে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে এত বড় একটি নির্বাচন হয়ে গেলো, নির্বাচনে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ষাট কোটি কানাডিয়ান ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪২০০ কোটি টাকা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুই বছরের মাথায় এত ব্যয়বহুল নির্বাচন দরকার ছিলো কিনা? সংসদ যখন বসবে তখন বিরোধী দলেরর প্রশ্ন উঠবে? প্রধানমন্ত্রীর কাছে হয়তো এ প্রশ্নের উত্তর আছে। তবে কানাডা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির সাতটি দেশের একটি, কাজেই এ রকম নির্বাচনী ব্যয় বহন করার মতো ক্ষমতা আছে বৈকি!

কিছুটা অন্যভাবে ভাবলেই হয়- কানাডার নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচন উপলক্ষে কয়েক হাজার মানুষকে পার্ট-টাইমভাবে নিয়োগ দেয় এবং তাদের বেতন হিসাবে একটি বড় অংশ খরচ করতে হয়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে কয়েক হাজার মানুষের কিছু আয়ের সংস্থান হয়, কাজেই নির্বাচনের এই ব্যয় একদম যে অযৌক্তিক তা বলা যাবে না!

করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে! অনেক বড় বড় অর্থনীতির জিডিপি সংকুচিত হয়েছে এবং আগামীতেও কিছুটা সময় এটা বহমান থাকবে। কানাডাতে করোনার চতুর্থ ওয়েভ চলছে। ভ্যাকসিন কিছুটা স্বস্তির স্রোতধারা সৃষ্টি করেছে যদিও অনেক মানুষ এখনো ভ্যাকসিনের আওতায় আসতে পারেনি আবার পৃথিবীর জনসংখার একটি বড় অংশ ভ্যাকসিন নেওয়ার বিপক্ষে।

কানাডা পৃথিবীর বৃহৎ সাতটি অর্থনীতির একটি দেশ হলেও বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সামনে অনেক অনেক চ্যালেঞ্জ - অর্থনীতি, মানুষের আবাসন সমস্যা নাগালের নিয়ে আসা, পরিবেশ বান্ধব বা গ্রিন অর্থনীতি, আদিবাসীদের সমস্যা ইত্যাদি।

তবে প্রধান সমস্যা হচ্ছে কিভাবে কানাডিয়ান অর্থনীতিকে ডুবন্ত অবস্থা থেকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া যাবে? শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় আবদ্ধ দেশটি সিনিয়র সিটিজেন, শিশু, এবং প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মজবুত কাঠামো তৈরী করেছে ফান্ড/ অর্থ প্রবাহের মাধ্যমে। আরো বেশ কিছুদিন হয়তো ব্যবসা/বাণিজ্যের জন্য ফেডারেল সাহায্য চালু রাখতে হবে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান করতে হবে, ডুবু ডুবু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে টিকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

নতুন অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কানাডিয়ান অর্থনীতি বা জি ডি পি ১.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, এবছরে এই সংকোচন গিয়ে ২ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে। এত বড় অর্থনীতির জন্য এই সংকোচন হয়তো এখনো সহনশীল পর্যায়ে আছে, তদুপরি প্রতি বছর বাইরের দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ ইনভেস্ট আসে হাউজিং ব্যাবসায়, বিনিয়োগকারীদের কাছে এখনো কানাডা একটি সুরক্ষিত জায়গা। সুতরাং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের রিয়েল এস্টেটে ইনভেস্টমেন্ট উপর নতুন কর আরোপ আসন্ন।

চলতি অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট ধরা হয়েছে ১৩৯০০ (তেরো হাজার নয় শ) কোটি ডলার। এই ঘাটতি পূরণের একটি বড় অংশ আসতে হবে নতুন করারোপের মাধ্যমে এবং কিছুটা আনতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের ঋণ থেকে।

ধারণা করা হচ্ছে ব্যক্তিগত উচ্চ ইনকাম ট্যাক্স ব্রাকেটে নতুন করে করারোপ হবে, এছাড়া মাল্টি-ন্যাশনাল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, ব্যাঙ্ক সহ যারা প্রচুর লাভ করেছে তাদের উচ্চ মুনাফার উপর বড় অংকের করারোপ হতে পারে। বর্তমান লিবারেল পার্টির সরকার পরিবেশ রক্ষায় বেশ সতর্কক। কার্বন ট্যাক্স অলরেডি চালু আছে- নতুন নাম কোনো ট্যাক্স আরোপ হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না I

লেখক: প্রকৌশলী আব্দুল্লা রফিক, কলামিস্ট, ক্যালগেরি, কানাডা

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]